সোমবার, ৭ মে, ২০১২

কোথায় যাও পথিক



আল মাহমুদ
সম্ভবত একবার লিখেছিলাম, কাদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে বেশি তাগাদা পেয়ে হয়রান হতে হয় না। আমি বলেছিলাম, নারীদের কাছ থেকে ঋণ নিলে অপেক্ষাকৃত কম হয়রানি পোহাতে হয়। হয়ত আমার জীবনে যা সত্য তা অন্যের জীবনে ততটা সত্য নাও হতে পারে। তবে ঋণের ওপর ঋণ করতে হলে বুদ্ধিমান ঋণগ্রহীতাদের মেয়েদের কাছে হাত পাতাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি মেয়েদের কাছে ঋণ নিতে উত্সাহ দেয়ার জন্য একথা বলিনি। বলেছি ঋণ গ্রহীতাদের সুবিধা কোথায় সহজে পাওয়া যাবে সেটার একটু আলোচনার জন্য। আমি অবশ্য যখনই আর্থিক সঙ্কটে পড়েছি তখনই আমার স্ত্রীর কাছে হাত পাততে সঙ্কোচ করিনি। আর এটা হলো সবচেয়ে নিরাপদ এবং হয়রানি না পোহাবার প্রসঙ্গ। অবশ্য অনেক দিন হলো আমার স্ত্রী গত হয়েছেন। তার কথা মনে হলে খুবই বিব্রত এবং বিষণ্ন হয়ে থাকি। কিছু কিছু ব্যাপার আছে যা একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় যা বলা সঙ্গত নয় এবং বিব্রত বোধ করার
মতো বিষয়।
আজকাল আমার বয়সের মতোই আমি বিষণ্ন ও বিব্রত অবস্থার মধ্যে কাল কাটিয়ে চলেছি। মনে হয় লেখক হিসেবে, কবি হিসেবে আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। অথচ স্মৃতির পেছনে ধাওয়া করার অভ্যেস এবং আচরণ এখনও আমাকে একেবারে পরিত্যাগ করেনি। ভালোবাসারও একটা ঋণ আছে, যা প্রেম দিয়ে শোধ করতে হয়। পেছনে ফিরে তাকালে অশ্রুজলে চোখ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। বেশিদূর অতীতের দিকে তাকানো যায় না। আর অতীতকে দেখার সাহস আমারও তেমন অটুট নেই। আমার শৈশবকালের একটা অভ্যেস ছিল, আমি কাঁদতে পারতাম না। কাঁদার অভ্যেস আমার অপেক্ষাকৃত কম। তবে দুঃখ ও যাতনায় আমার চোখ দিয়ে অশ্রু উপরে পড়ে। দুই গণ্ডদেশ ভিজে পানির নদী বইতে থাকে। আমি সইতে জানি বলেই কাহিনী কইতেও জানি। এ পর্যন্ত কত কথাই তো লিখে গেলাম। মনে হয় কাহিনী অফুরন্ত অনন্তকালের দিকে বয়ে চলেছে। কিন্তু আমি অদৃঢ় মানুষ হলেও চুপ করে তাকিয়ে বসে থাকি। চোখ ভাসে, কিন্তু হৃদয়ের এক স্পর্শকাতর স্থান হাসতে থাকে। তবু লিখে থাকি এবং অক্ষরের মালা বুকের জ্বালা হয়ে নিজেরই মুখের ওপর ঝরতে থাকে, নড়তে থাকে। আমি বেদনার গল্প লিখতে খানিকটা অভ্যস্ত বলেই জানি। যত রচনা আমার প্রকাশিত হয়েছে সে সব হৃদয়বিদারক না হলেও মানুষের অন্তরে বিহ্বলতার সৃষ্টি করে। এর মানে এই নয় যে, আমি আনন্দের কথা লিখতে পারি না। আনন্দের বিষয় হলে তা নিরানন্দ ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। তবে আমার কাছে কবির প্রেমের বিষয়টি একটু অন্যরকম। আমি ইচ্ছে করলে ডালপালা মেলে দিতে পারি। কিন্তু এই ডালপালা মেলে দেয়ার সব বিষয়ই একটি বৃক্ষে পরিণত হয়। আমি কবি হিসেবে গাছের সঙ্গে বায়ুর মর্মর তুলে পাতার খসখস শব্দে কথা বলতে জানি। এজন্যই তো আমি কবি। কবি মানে হলো স্বপ্ন কল্পনার কথক, আমার বিবৃতি ছন্দে প্রকাশিত হয়, গন্ধে পরিবেশকে আকুল করে। প্রাণীদের মধ্যে সঞ্চার করে বেদনার। আমরা এর নাম দিয়েছি বিরহ। এই বিরহের কাহিনী লিখেই কত মানুষ, কবি-পুরুষ অমর হয়েছেন। আমি যদিও অমরতায় অতটা আস্থাবান নই, তবে কবির কর্মক্ষমতায় খুবই ভরসা রাখি। মানুষের কাহিনী বর্ণনায়, প্রেমের গল্পকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। আমি অবশ্য প্রেমের কাহিনী একাধিকবার বললেও বিরহের বেদনার বিমর্ষতার গল্পই অধিক বলেছি। কারণ আমি যদিও অনন্তকালের যাত্রী। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে মাঝে মধ্যে পার হয়ে আসা প্রান্তর, তেপান্তর ইত্যাদিও পর্যবেক্ষণ করি। আমি দেখি, লিখি এবং একই সঙ্গে পেছন ফিরে পার হওয়া প্রান্তর নদী, গাছপালা সব কিছুই প্রত্যক্ষ করি। আজ তো বহু দূরে এক অজ্ঞাত অসাধারণ বাঁশির সুরে চলে এসেছি। টানে, গানে, আহ্বানে সাড়া দিতে দিতে নিজের পাড়া-প্রান্তর ছাড়িয়ে কোথায় এসে পড়েছি তা আর জানি না, চিনি না। স্থান কাল মানলেও এক জাদুকরী মায়াবী আহ্বান আমাকে প্রায় ৮০ বছর ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে অফুরন্ত এক প্রান্তরের মধ্যে। শুধু মুখে বলছি চলে যাচ্ছি। কিন্তু মন বলছে কোথায় যাও পথিক!
লেখক : কবি

শেষের কবিতার আঁতুড়ঘর


  • কবিগুরুর স্মৃতিবাহী সেই শেষের কবিতার আঁতুড়ঘর
    কবিগুরুর স্মৃতিবাহী সেই শেষের কবিতার আঁতুড়ঘর


আজ পঁচিশে বৈশাখ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫১তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে সারা দেশেই হবে রবীন্দ্র-উৎসব। আমরা কথা বলার জন্য বেছে নিয়েছি ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কর্ণাটককে। কেন, সেটা পরে বলছি।
কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরু। অধিকাংশ কন্নড় ভাষাভাষীদের বাস এখানেই। ভারতের গার্ডেন সিটি হিসেবেও পরিচিত বেঙ্গালুরু। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া। শীতের আধিক্য নেই। গরমের প্রকোপ কম। এখনো এখানে মানুষ আসে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য। আগে অবশ্য কর্ণাটক মহীশূর রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯৫৫ সালে মহীশূর থেকে হয় কর্ণাটক রাজ্য। 
এই রাজ্যের রাজধানীতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকবার এসেছেন। থেকেছেন। লিখেছেন। সবচেয়ে গর্বের কথা, এই বেঙ্গালুরু শহরেই কবিগুরু লিখেছিলেন তাঁর কালজয়ী উপন্যাস শেষের কবিতা। ১৯২৮ সালে। আজ কবিগুরু নেই, কিন্তু বেঙ্গালুরু শহরে এখনো ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে কবিগুরুর স্মৃতিবাহী সেই শেষের কবিতার আঁতুড়ঘর। তবে নেই আঁতুড়ঘরের যে বাগানে বসে কবিগুরু শেষের কবিতার পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন, সেই বাগানে কবিগুরুর নামে থাকা ঐতিহাসিক প্রস্তর স্মারকটি। বেঙ্গালুরু শহরের প্যালেস রোডে ছিল সেই ঐতিহাসিক বেলাব্রুয়ি ভবন। এখানেই এসেছিলেন কবিগুরু। রচনা করেছিলেন শেষের কবিতা। আজও সেই ভবনটি আছে। আছে কবিগুরু যে ঘরটিতে থেকেছেন সেই ঘরটিও। কিন্তু নেই কবিগুরুর স্মৃতিচিহ্ন। এখন সেই ভবনটি হয়ে গেছে সরকারি অতিথিশালা। কবিগুরুর সেই ঐতিহাসিক শয়নকক্ষটি হয়ে গেছে অতিথিদের শয়নকক্ষ। আর বেলাব্রুয়ির ভবনটি হয়ে গেছে বেলাব্রুয়ি স্টেট হসপিটালিটি অরগানাইজেশন। সরকারি উদ্যোগে হয়েছে এই ভবনের আধুনিকীকরণ। এখন এটি বিধায়ক আর মন্ত্রীদের ক্লাব।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৯১৯ সালে কবিগুরু মহীশূর নাট্য সংস্থার আমন্ত্রণে এসেছিলেন এই বেঙ্গালুরুতে। উঠেওছিলেন এখানে। সেই উৎসবে কবিগুরু পাঠ করেছিলেন ‘দ্য ম্যাসেজ অব দ্য ফরেস্ট’ প্রবন্ধটি। আজও অবশ্য বেলাব্রুয়ির সেই অতিথি ভবনে কবিগুরুর প্রথম পদার্পণের কথাটি দেয়ালের এক ফলকে লেখা রয়েছে। তবে কবি এই অতিথি ভবনের যে বাগানে বসে শেষের কবিতার পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন, সেই স্মৃতি রক্ষার্থে বাগানে রাখা প্রস্তর ফলকটি আর আজ নেই। ওই ফলকে লেখা ছিল ‘এই জায়গায় বসে কবিগুরু শেষের কবিতা রচনা করেছিলেন।’
১৯২৮ সালের জুন মাস নাগাদ কবিগুরু ফের বেঙ্গালুরুতে আসেন। ওঠেন এই অতিথি ভবনেই। সেবার তিনি এসেছিলেন সুপণ্ডিত বন্ধুবর মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের আমন্ত্রণে। কবিগুরু সেবার ছিলেন সপ্তাহ তিনেক। ওই সময়ই রচনা করেন শেষের কবিতা। আর সেই পাণ্ডুলিপি পড়েও শোনান ব্রজেন্দ্রনাথ শীলসহ অন্যদের। রবীন্দ্র রচনাবলির শেষের কবিতার শেষে রচনা কালের সময়সূচিতে লেখা আছে ব্যালাব্রুয়ি বাঙ্গালোর/২৫ জুলাই, ১৯২৮। সত্যিকথা কি বেঙ্গালুরুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের প্রাকৃতিক শোভাই কবিগুরুকে অনুপ্রাণিত করেছিল শেষের কবিতা লিখতে। যদিও শেষের কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে শিলংই। 
সত্তরের দশকে কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন দেবরাজ আর্শ। তাঁর আমলে বেলাব্রুয়ির বাগানবাড়ি নতুনরূপে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। আর তখনই বাগানে থাকা শেষের কবিতা লেখার স্মৃতিবাহী স্মারকটি তুলে নেওয়া হয়। তখন অবশ্য কবিগুরু যে কক্ষে ছিলেন সেই কক্ষটিকে নতুন রূপে সাজানো হয়। কবির শয়নকক্ষটি হয়ে যায় অতিথিদের বিশ্রামঘর।
১৯৮২ সাল নাগাদ কর্ণাটকের রাজ্যপাল ছিলেন অশোকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই সময় অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহধর্মিণী সুব্রতা বন্দ্যোপাধ্যায় খোঁজ পান কবিগুরুর শেষের কবিতা লেখার সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিফলকের। তিনি উদ্যোগ নেন এটি বেলাব্রুয়ির সেই বাগানে স্থাপনের। কিন্তু সুব্রতা মুখোপাধ্যায়ের আকস্মিক প্রয়াণ এবং অশোক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবসর গ্রহণে থেমে যায় সেই প্রস্তর ফলক স্থাপনের প্রক্রিয়া। কালক্রমে সেই ফলকটিও উধাও হয়ে যায়। 
ইতিমধ্যে বেঙ্গালুরু ও কলকাতার রবীন্দ্রভক্তরা কর্ণাটক সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, কবিগুরুর শেষের কবিতার আঁতুড়ঘরকে রক্ষা করার। আবেদনে বলা হয়েছে, কবিগুরুর স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক কক্ষটিকে সংরক্ষিত করা হোক। আর বাগানের যেখানে বসে কবিগুরু শেষের কবিতার পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন সেই স্থানে বসানো হোক একটি স্মৃতিফলক। কবিগুরুর সার্ধশত জন্মবর্ষে এই দাবি ওঠে কলকাতার রবীন্দ্রভক্তদের। কর্ণাটক সরকার বিশ্ববরেণ্য কবির স্মৃতিরক্ষার্থে এই দাবি না মানলে হয়তো ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে যাবে কবিগুরুর শেষের কবিতা লেখার আঁতুড়ঘরের ইতিহাস। 
অমর সাহা
কলকাতা

রবিবার, ৬ মে, ২০১২

রমনার সবুজ উঠোন



স র দা র  আ ব দু স  সা ত্তা র 
আকাশচুম্বী অট্টালিকার দাপটে ঢাকার প্রসারিত আকাশ ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। চলে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে। একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নতুন নতুন বহুতল ভবন ক্রমাগত আকাশ ছোঁয়ার অভিলাষী হয়ে উঠছে। পত্রপত্রিকায় এবং টেলিভিশনে তারা মাঝেমধ্যেই বিজ্ঞাপন দেয় ‘আকাশটা ছোঁবেন নাকি?’ আমরা বুঝতে পারি না এটা বিজ্ঞাপন নাকি সরকারের বিভিন্ন ‘সেকটর’ দু’হাতে লুটপাট করে হঠাত্ বিপুল বিত্তের অধিকারী হওয়া নব্য ধনিক শ্রেণীর বিদ্রূপ! আকাশকে ছোঁয়ার আগ্রহে উল্লসিত হয়ে ওঠা এসব মানুষের বিলাসী ও উদ্ধত ভবনগুলো আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিষ্ঠুরভাবে আকাশ কেড়ে নিচ্ছে। এই শহরের যেখানে ইচ্ছা সেখানে দাঁড়িয়ে এখন আমরা আর আকাশ দেখতে পাই না। অটল পাহাড় কিংবা বাধার বিন্ধাচল হয়ে একেকটি বহুতল ভবন এমনভাবে আমাদের দৃষ্টিকে থমকে দেয় যে, সেখান থেকে অন্য আকাশকে কিছুতেই আর স্বমহিমায় খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষের হাতে তৈরি এই কংক্রিটের ভবনগুলো দিনরাত এমনভাবে তাদের নির্মাতার জয়গান গেয়ে চলেছে যে তার দম্ভের কাছে মহাশক্তিধর প্রকৃতিকে নেহাতই একটা গোবেচারা বলে মনে হয়। আর অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠা এই ঢাকা শহরে এই দীর্ঘদেহী ভবনগুলো যেভাবে জ্যামিতিক হারে বংশবিস্তার করে চলেছে, তাতে মনে হয় ভবিষ্যত্ প্রজন্ম ভবনের ছাদে না উঠে কিংবা মাটিতে দাঁড়িয়ে আর কোনো দিন আকাশের উদারতা, ঐশ্বর্য আর অসীমতার সম্যক রূপ উপলব্ধি করতে পারবে না। হয়তোবা বার তলা ভবনে বসে পূর্ণিমার চাঁদ বা জোছনাভেজা আকাশ দেখতে পাবে না। কেননা তার পাশেই পূর্বদিকের ভবনটি বিশ তলা। হয়তোবা তখন এই শহরের এক বা একাধিক অতি দুর্লভ কিছুটা খোলা জায়গা নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে ফেলে তার প্রবেশমুখে একটা চমত্কার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হবে, যাতে লেখা থাকবে, ‘এখানে উপযুক্ত সম্মানীর বিনিময়ে উন্মুক্ত আকাশ দেখার সুযোগ রয়েছে’। শহরের আকাশপ্রেমী মানুষেরা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কেটে সার বেঁধে সেখানে ঢুকবে, যেমন ঢুকি এখন আমরা চিড়িয়াখানায়। আর যে আতঙ্কঘেরা ভূমিকম্প মাঝেমধ্যেই আমাদেরকে তার অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে, বারংবার মৃদু স্পর্শে সচকিত করে তুলছে। একবার তা যদি তীব্র মাত্রায় তার প্রলয়নাচন শুরু করে দেয়, তখন কী অবস্থা হবে আকাশচুম্বী অট্টালিকাশোভিত এই শহরের? ভাবতেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। তাই সে প্রসঙ্গ এখন থাক।
ইট-সিমেন্টের এই শহরে সান্ত্বনা-স্বস্তি ও আনন্দের অন্তত একটি জায়গা এখনও টিকে আছে। যেদিকে তাকালে খর-বৈশাখের রৌদ্রদগ্ধ দিনে হঠাত্ নামা একপশলা বৃষ্টির মতোই স্নিগ্ধ শান্তি আমাদের তাপিত দৃষ্টিকে শীতল এবং কোমল করে দিয়ে যায়। সে আমাদের রমনা। হ্যাঁ, জোর দিয়েই বলছি ‘আমাদের রমনা’। কেননা কোনো প্রতাপশালী ভূমিদস্যুর অথবা ব্যক্তিমালিকানার পরোয়ানা জারি করা কোনো ধ্বজা আজও সেখানে উড়তে দেওয়া হয়নি। নির্বাসনে পাঠানো হয়নি ঘাসে-ঢাকা বিস্তীর্ণ সবুজ চত্বরকে। হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি লতাপাতা ও গাছগাছালির অপরূপ শ্যামলিমাকে। প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়নি অঢেল বিত্তের প্রদর্শনীকেন্দ্র হিসেবে বেড়ে ওঠা কোনো বেঢপ ইমারতকে। যতদিন অক্ষুণ্ন রাখা হবে প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধনে গড়ে তোলা এই সৌন্দর্যময়তাকে, ততদিন রমনা আমাদের-শ্যামল রংয়ের প্রেমে পড়া এ দেশের সকল মানুষের।
‘দিনান্তের সূর্য পশ্চিম আকাশ থেকে/ মুঠি মুঠি সোনার রং ছড়িয়ে দেয়/ রমনার ফুল পাখি প্রজাপতি আর/ সবুজ ঘাসের মখমলে মোড়া উঠোনে বৃক্ষলতা/ বুড়িগঙ্গা থেকে ভেসে আসা বাতাসে চুল এলিয়ে/ রমণী সেজে ওঠে সাঁঝের অলৌকিক সাজে...’ অনেক আগে পড়া এই প্রিয় কবিতার পঙিক্তগুলো কখনও কখনও আমি আপন মনে আবৃত্তি করি। আর ঠিক তখনই শেষ সূর্যাস্তের সোনালি রং আপন শরীরে মেখে নিয়ে রমনার রূপবতী হয়ে ওঠার দৃশ্যটা আমার দৃষ্টির সীমানায় দ্যুতিময় হয়ে ওঠে। অনেকটা অভিভূতের মতোই আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকি। মনে মনে দেখি রমনাকে।
একসময় আমি ঢাকার বখশিবাজারস্থ সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতাম। থাকতাম ইস্কাটন গার্ডেনের নিউ সার্কিট হাউসের পাঁচতলায় ৭৬ নয় স্যুটে। যাওয়া-আসা করতে হতো রমনার প্রাণকেন্দ্র রমনা পার্ক আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশ ঘেঁষে। সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে যাত্রা। আর পড়ন্ত বেলার রোদ বৃষ্টি বাতাস গায়ে মেখে ঘরে ফেরা। কোনো কোনোদিন সন্ধ্যা হয়ে যেত। আর তা ছিল আমার জন্য প্রত্যাশিত আনন্দের সচল মুহূর্ত দিয়ে ঘেরা। প্রকৃতির আধো-আলো আর আধো-অন্ধকার দিয়ে ঘেরা বর্ণালি সন্ধ্যার মহামুহূর্তে আমার রিকশা যখন সোহরাওয়ার্দী ও রমনা উদ্যানের পাশ দিয়ে মন্থর গতিতে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলত, অবধারিতভাবেই তখন রমনাকে নিয়ে লেখা আমার অতিপ্রিয় ২/৩টি কবিতার কথা মনে পড়ে যেত। আমি তা আবৃত্তি করতাম। কখনও মনে মনে নীরবে আবার কখনও সরবে। রিকশাওয়ালা থেকে পথচারীরা কে কী মনে করল অথবা করতে পারে তা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাতাম না। কেননা তখন আমার বুকে থৈ থৈ আনন্দ। আমার ভেতরের আমিটি আনন্দে পরিপ্লুত। আর সেটিই তখন আমার কাছে একমাত্র সত্য। জীবন ও জগতের বাকি সবকিছু অর্থহীন। অতএব তাতা থৈ, তাতা থৈ।
রমনা বলতে যদিও ঢাকা শহরের বেশ একটা বড় এলাকা বোঝায়, (পূর্বে এর আয়তন আরও বড় ছিল) তবুও আমরা প্রধানত রমনা পার্ক থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মনোরম সবুজ এবং অনেকটাই আয়তাকার পরিমণ্ডলটি বুঝে থাকি। আর এই সবুজ চত্বরের চারপাশ ঘিরে গড়ে ওঠা চমত্কার কিছু জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতে জ্ঞান, কোনোটিতে গবেষণা আবার কোনোটিতে সৃজনশীলতার চর্চা চলছে। চলছে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা ও সাহিত্য সংরক্ষণের কার্যক্রমও। একটি জাতি এ পর্যন্ত যা অর্জন করেছে তার স্বীকৃতি এবং সংরক্ষণ এবং তারই পাশাপশি আগামীতে সে যা অর্জন করবে অথবা করা উচিত দিনরাত তারই দীক্ষা চলেছে রমনা-পারের এই কর্মচঞ্চল প্রতিষ্ঠানগুলোয়। একদিকে সোহরাওয়ার্দী এবং রমনা উদ্যানের কোমল ঘাসে ঢাকা মায়াবী চত্বর, অপরদিকে সৃজনের, জ্ঞানের, গবেষণার এবং সংরক্ষণের সমুদ্র মন্থনের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এ দু’য়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া মসৃণ ও প্রশন্ত পথ ধরে যতবার আমি যাতায়াত করি, ততবারই আনন্দ ও গর্বে আমার বুক ভরে ওঠে। বিশাল কলকাতা শহরের বহুবিধ আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থানকে পিছে ফেলে ভিক্টোরিয়ার বিপরীতে একাডেমি, নন্দন ও রবীন্দ্রসদন সন্নিহিত এলাকায় পা রাখলেই অনুভব করা যায় যে কলকাতার হূদয় এখানেই বাস করে। এখান থেকেই সে তার উত্তাপ ও ঐশ্বর্যের ছটা ছড়িয়ে দেয় গোটা শহরে-সমগ্র বাংলায়। রমনার সবুজ চত্বর ছুঁয়ে চলা পথ দিয়ে চলাচলের সময় একইভাবে মনে হয় ঢাকা শহরের আত্মাকে পুরনো লালবাগে অথবা নতুন ধানমণ্ডি, গুলশান-বনানীতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ চার শতাব্দীর পুরনো এই শহরের আত্মাটি ঠিক এখানেই বাস করে এবং এই আত্মার একটা অদ্ভুত সম্প্রসারণ ক্ষমতা রয়েছে। জাতির বিশেষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তগুলোতে তাই সে অনায়াসেই ঢাকা শহরকে ছাপিয়ে সমগ্র দেশের আত্মা হয়ে গর্জে উঠতে অথবা স্বস্তির সুবাতাস ছড়াতে কোনো কুণ্ঠাবোধ করে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বরে গোটা পৃথিবী তা জেনেছে। ’৯০-এর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এই চত্বরকেই আমরা দেখেছি বারংবার রণক্ষেত্র হয়ে উঠতে এবং পরিণামে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই বিজয়ী হয়ে উঠতে দেখতাম আমরা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে পরিচিত রমনার এই অংশটির পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করার সময় অথবা তার ভেতরে ঘোরাফেরা করতে গিয়ে কখনও কখনও মনে হয়েছে, দীর্ঘকাল ধরে ঘোড়দৌড়ের মাঠ হিসেবে পরিচিত এই বিশাল মাঠটিকে শুধু সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ হিসেবে রেখে দিলেই ভালো হতো। আগামী দিনের কোনো ঐতিহাসিক মুহূর্তে লাখো মানুষের দৃপ্ত উপস্থিতি ও পদভারে তাহলে তার জেগে ওঠার পথটি সুগম থাকত। ইতোমধ্যে পরিবেশবাদীদের একটি দলকে কয়েক দফা দাবি সমেত লিফলেট বিলি করতে দেখেছি। ওদের দাবিগুলোকে তখন বেশ জোরালোই মনে হয়েছিল।
কিন্তু রমনার ওই সবুজ উঠোনোর প্রতিটি মৃত্তিকাকণা আর ঘাসের ডগার মধ্যে জাগরণের একটা অসাধারণ শক্তি আছে। আর সে জাগরণের রূপ ও আমাদের বৈচিত্র্যময় ঋতুগুলোর মতোই একটি থেকে আরেকটি আলাদা। না, শুধু রূপ নয়, তার সত্তাটিকেও মনে হয় স্বতন্ত্র। কখনও প্রফুল্ল, কখনও সজল, আবার কখনও রুদ্র। পরিস্থিতি-পরিবেশ এবং প্রয়োজনের দিকে লক্ষ রেখেই সে তার এই রূপবৈচিত্র্যের প্রকাশ ঘটায় এবং তা ঘটাতে শুরু করে বাংলা নতুন বছরের একেবারে প্রথম দিন থেকে। রমনা এখন অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য উত্সব নববর্ষ উদযাপনের প্রধান পীঠস্থান। সেদিন এক আশ্চর্য সুন্দর, সজীব ও প্রফুল্ল রূপের ঐশ্বর্য ছড়ানো থাকে রমনার পথে পথে, ঘাসে ঘাসে, ফুলে ফুলে এবং পাতায় পাতায়। গলা খুলে সেদিন তো আমরা ‘ এসো হে বৈশাখ। এসো এসো’ গানটি গেয়েই থাকি। কিন্তু সেই সঙ্গে আমার সেদিন গাইতে ইচ্ছা করে-‘রমনা আমার, আমার রমনা। তোমার এই প্রফুল্ল রূপটিই আমাদের অনেক গানের আর অনেক সৃষ্টির প্রেরণা...’ 
‘রমনা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ রম্য বা রমণীয় স্থান। বর্তমানে ঢাকা শহরের অধিকাংশ স্থানের নামগুলোই তার অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ নিয়ে মজার মজার গল্প-কৌতুক ও গানের কথাও আমরা জানি। কিন্তু রমনা এদিক থেকে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম। চার শতাধিক বছরের পুরনো এই রাজধানী শহরের অনেক কিছুর বদল ঘটলেও অনড় অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে রমনা-তার নামের অর্থ ও তাত্পর্যগত অক্ষুণ্নতা নিয়ে। এবং অনুমান করি এমনি করে সে অনায়াসেই পার করে দেবে আরও কয়েকশ’ বছর।
বহু মানুষের বহু দিবসের স্বপ্ন, কল্পনা, শ্রম, দূরদৃষ্টি ও ভালোবাসার ফসল এই রমনা। তাদের সবার কাছেই আমাদের ঋণ ও কৃতজ্ঞতা জমা হয়ে আছে। তাদের সবাই আমাদের কাছে স্মরণীয়। তবে তাদের মধ্যে সবার আগে যে মানুষটি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান, তিনি সুবেদার ইসলাম খান চিশতি।
মধ্যযুগের পাঠান-শাসিত বাংলায় ১৫৭৬ সালে সম্রাট আকবর যুদ্ধজয়ী মোগল বাহিনী প্রেরণ করে বাংলাকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তবে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত হলেও পাঠান ও বারভূঁইয়ারা তাত্ক্ষণিকভাবে মোগল আনুগত্য স্বীকার করে নেয়নি। জলাজঙ্গলময় বাংলার বিভিন্ন প্রান্তরে পদে পদে তারা মোগলদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলছিল। অনেকটা গেরিলা যুদ্ধের মতোই ছিল তাদের সেই রণকৌশল। ফলে বাংলা দখল করতে অনেক দিন পর্যন্ত মোগলরা স্বস্তিতে থাকতে পারেনি। এরকম অবস্থায় ১৬০৫ সালে সম্রাট আকবরের মৃত্যু হয়। জাহাঙ্গীর ক্ষমতায় এসেই তার দুধভাই কুতুবউদ্দীনকে বাংলার সুবেদার করে পাঠান। কিন্তু কুতুবউদ্দীনের মধ্যে সুশাসকের কোনো গুণাবলিই ছিল না। অত্যন্ত কাপুরুষোচিতভাবে শের আফগানকে হত্যা করতে গিয়ে নিজের পৈতৃক প্রাণটিই খুইয়ে বসেন। তার শূন্য জায়গায় নতুন সুবেদারের দায়িত্ব নিয়ে আসেন ইসলাম খান চিশতি। তিনি ছিলেন ফতেপুর সিক্রির সেলিম চিশতির নাতি। উন্নত এবং দৃঢ় চারিত্রিক গুণাবলির অধিকারী ছিলেন তিনি। সুবেদারের দায়িত্ব নিয়ে রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তারই ভালোবাসা ও দূরদৃষ্টির কারণে ঢাকা পায় রাজধানী হওয়ার গৌরব। এটা ১৬০৮ সালের (মতান্তরে ১৬১০) ঘটনা। ঢাকা তখন ছিল বহু মানুষের এক অপরিকল্পিত শহর। অধিকাংশ বাড়িই ছিল খড়ের। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা, প্রশস্ত রাস্তাঘাট, চাকচিক্যময় বাড়িঘর-এসব কোনো কিছুর সঙ্গেই ঢাকাবাসীর তখন পরিচয় ছিল না। ইসলাম খান ঢাকায় পা রাখার পরই ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। প্রথমেই তিনি লুটেরা মগ-ফিরিঙ্গিদের দমন করেন। তারপর বিদ্রোহী বারভূঁইয়া ও পাঠানদের দিকে নজর দেন। প্রতিটি যুদ্ধেই তিনি অসামান্য সাফল্য অর্জন করে বাংলায় মোগল শাসনের ভিত সুদৃঢ় করে গড়ে তোলেন। এসব রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি ঢাকা শহরকে একটি সুন্দর ও সুসজ্জিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জলাজঙ্গলে পরিপূর্ণ ‘রমনা’ হয়ে ওঠে ‘রমণীয় রমনা’। যেখানে এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হয় এক রাজকীয় মোগল উদ্যান ‘বাদশাহী বাগ’। আর উদ্যান সন্নিহিত এলাকায় গড়ে তোলা হয় মোগল স্থাপত্যের শৈল্পিক সুষমামণ্ডিত গম্বুজ, মিনার, আবাসগৃহ, মসজিদ ইত্যাদি। ঢাকা যতদিন মোগল রাজধানী ছিল, ততদিন রমনার পরিচর্যা এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির কোনো ব্যত্যয় হয়নি। কিন্তু মোগল যুগের অবসানের পর রমণীয় রমনা আবার ঝোপজঙ্গলে ঢেকে যাওয়া এক পরিত্যক্ত অঞ্চলে পরিণত হয়। যত্নের অভাবে দৃষ্টিনন্দন মোগল স্থাপনাগুলো জীর্ণ হতে হতে ধ্বংসের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পুরো এক শতাব্দী ধরে চলে সেখানে পেঁচা আর ইঁদুরের লুকোচুরি। অতঃপর ১৮২৫ সালে ঢাকার কালেক্টর গত্. উড়বিং-এর হাতে শুরু হয় নতুন করে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার কাজ। আর ১৯৪৯ সালে ৭১ প্রজাতির বৃক্ষ এবং ৮৮.৫০ একর জায়গায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় রমণী পার্কের। বর্তমানে এর আয়তন কিছুটা কমেছে, তবে বেড়েছে বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিকাড়া উদ্ভিদের সংখ্যা-ছয়টি ঋতুর রূপবৈচিত্র্য নিবিড়ভাবে পরখ করার জন্য, যা নিসর্গপ্রেমী মানুষদের কেবলই হাত বাড়িয়ে কাছে টানে।
পঞ্চাশের দশকের কিছু সাহিত্যে অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে ১৯৫০-এ সংঘটিত হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার কিছু মর্মন্তুদ বর্ণনা পড়েছিলাম। পড়তে পড়তে চোখের জলে বুক ভিজেছিল। তবুও পড়েছিলাম। তারই একটা বর্ণনা আমার মনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছিল। সেই ভয়ঙ্কর দাঙ্গায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বাড়িঘর, সম্পদ, স্বজন-সবকিছু হারিয়ে রমনার কালীমন্দির ও তার আশপাশে আশ্রয় নিয়েছিল। রাতে তারা সবাই একত্রিত হলেও দিনের বেলা বিভিন্ন কাজে শহরের নানা জায়গায় ছড়িয়ে থাকত। কিন্তু দিনশেষে আবার ফিরে আসত রমনায়। যেসব নবাগত পথ ভুলে যেতেন তারা রমনার কালীমন্দিরের উঁচু চূড়া লক্ষ করে হারানো ঠিকানা খুঁজে পেতেন। আজকের ঢাকার গগনচুম্বী অট্টালিকা এবং ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে কথা শুরু করেছিলাম। আবার ফিরে যাই সেখানেই। সত্যি সত্যি যদি কোনো দিন এখানে শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আছড়ে পড়ে, তবে সেদিনও এই রমনার খোলা উদ্যান আর সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তরই হয়তো আবার হয়ে উঠবে নতুনভাবে বিপন্ন, দুর্গত ও আশ্রয়চ্যুত মানুষের সাময়িক আশ্রয়স্থল, পা রাখার জায়গা।
লেখক : শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

শনিবার, ৫ মে, ২০১২

বুদ্ধপূর্ণিমা ২০১২ঃ বুদ্ধের বাণী একুশ শতকে আরও প্রাসঙ্গিক


  • বুদ্ধের মূর্তির সামনে ভক্তরা

  • বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমা উদ্যাপন
    বাংলাদেশে বুদ্ধপূর্ণিমা উদ্যাপন
সুকোমল বড়ুয়া | তারিখ: ০৬-০৫-২০১২

আজ থেকে আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে, ৫৬৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এমনি এক শুভ তিথিতে গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বুদ্ধত্ব লাভ করেন ৫২৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে ৪৮৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। তাঁর জন্ম ও বুদ্ধত্ব লাভের মধ্য দিয়েই পৃথিবীর বুকে এমন একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার বাণী সম্পূর্ণ অহিংস ও মানবতাবাদী। বৌদ্ধধর্ম একটি বিশ্বজনীন অহিংস, মানবতাবাদী ধর্ম। এ ধর্মের বাণীগুলো মানবিক আবেদনে পরিপূর্ণ। মানবতা এবং মানবিক গুণাবলির বহিঃপ্রকাশই এই ধর্মের বিশেষত্ব।
শুরু থেকেই মানবকল্যাণে মহামতি বুদ্ধের কণ্ঠে মহাপ্রেমের মহাবাণী উৎসারিত হয়েছিল। বুদ্ধত্ব লাভের পর পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের তিনি বলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখ ও মঙ্গলের জন্য এমন ধর্ম প্রচার করো, যেই ধর্মের আদি, মধ্য এবং অন্তে কল্যাণ; সেই অর্থযুক্ত, ব্যঞ্জনযুক্ত পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত করো।’
‘সকল প্রাণী সুখী হোক। ভয়হীন ও নিরুপদ্রব হোক।’ এই বাণী প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল বুদ্ধের কণ্ঠে। সূত্রনিপাত গ্রন্থের মৈত্রীসূত্রে বলা হয়েছে: ‘সভয় বা নির্ভয়, হ্রস্ব বা দীর্ঘ, বৃহৎ বা মধ্যম, ক্ষুদ্র বা স্থূল, দৃশ্য অথবা অদৃশ্য, দূরে অথবা নিকটে যে সকল জীব জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণ করবে, সে সকল প্রাণী সুখী হোক।’
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বুদ্ধের দুটি বাণী বিশ্ববাসীকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করেছিল: মুক্তির জন্য ঈশ্বর বা পরনির্ভরশীল না হওয়া, এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলতেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা মুক্তির জন্য পরনির্ভরশীল হয়ো না, অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থেকো না, নিজেই নিজের প্রদীপ হও, নিজে নিজের শরণ গ্রহণ করো।’ এ বাণীর মধ্যেই রয়েছে সর্বজীবের মুক্তি ও কর্মস্বাধীনতার পূর্ণ আশ্বাস।
বুদ্ধের শিক্ষায় অধ্যাত্ম জীবনে মানুষের মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্বাচ্ছন্দ্যবোধের কথাও গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষার গুরুত্বকে তিনি খাটো করে দেখেননি। তিনি জানতেন, প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের মনকে বড় করে, ভালো-মন্দ বিচার করার শক্তি দেয়। তিনি মনে করতেন, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা বা অতিরিক্ত ভোগলিপ্সা নির্বাণ লাভের অন্তরায়; তা থেকে দুঃখমুক্তি আসে না।
মহামানব বুদ্ধের বিশ্বজনীন মুক্তির ব্যাকুলতা এবং মানবতাবাদী ঐতিহ্য বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আজ পৃথিবীব্যাপী ক্রোধ, সহিংসতা, জিঘাংসা, দুঃখ দেখলে মনে হয়, বুদ্ধের অহিংস বাণীর কত প্রয়োজন। বুদ্ধ চেয়েছিলেন মানবসমাজকে সর্ববিধ দুঃখের হাত থেকে উদ্ধার করতে। তিনি আন্তর্জাতিক, দেশ ও জাতির গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বের মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা ভেবেছিলেন। বুদ্ধের চিন্তাধারাকে প্রাচীনকালে ভারতীয় ও গ্রিক দার্শনিকেরা এবং পরবর্তীকালে রুশো, গান্ধী ও মাও জেদং স্বাগত জানিয়েছিলেন।
বুদ্ধ অধ্যাত্ম বা বৈরাগ্য জীবনের মুক্তির পাশাপাশি সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং বিশ্বজনীন মুক্তি ও নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। বস্তুত বুদ্ধের এই মুক্তিদর্শন আধ্যাত্মিক জগৎ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পূর্ণতাসহ জাগতিক সব প্রকার সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যকে পূর্ণ করে। তাই বিশ্বের সাম্যবাদীরা বুদ্ধের সমাজ ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই চেতনাকে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বুদ্ধ ধনবাদী তথা পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে যেমন উৎসাহিত করেননি, তেমনি বর্ণ ও বৈষম্যবাদী সমাজকেও কখনো স্বাগত জানাননি। কারণ, বুদ্ধ জানতেন, ধনবাদ কিংবা পুঁজিবাদ কখনো মানুষের জীবনে সামগ্রিক সুখ আনতে পারে না। বুদ্ধ চেয়েছেন মধ্যম পন্থার মাধ্যমে ‘সকলের জন্য অধিক সুখ প্রতিষ্ঠা’।
বৌদ্ধসমাজ দর্শনে সাম্যবাদ, গণতন্ত্র এবং সব মানুষের ধর্মীয় অধিকারলাভ প্রভৃতি বিষয় বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। তাঁর জীবনদর্শনে চিন্তা ও মননের স্বাধীনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও মূল্যবোধ বিকাশের সব বিষয় অমিত প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি সমাজের বহু আক্রান্ত মূল্যবোধকে বল্গাহীনভাবে দেখেননি। বুদ্ধ তাঁর জীবনদর্শনে ও শিক্ষামূলক আদর্শে অতিমানবিক বা অতিপ্রাকৃতিক জীবনকে গ্রহণ করেননি। তাঁর উন্নততর জীবনে অনাড়ম্বর ও বৈচিত্র্যহীন সংযত আচরণ, আদর্শ ব্যক্তিত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও সংবেদনশীল বিনয়নীতি সামগ্রিক জীবনে বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
প্রকৃত জীবন গঠনের মানসে শীলের গুরুত্ব বৌদ্ধধর্মে সর্বত্র বা সংযত আচরণকে তিনি বিশেষভাবে প্রাধান্য দিয়েছেন। এ জন্য বৌদ্ধধর্মে পঞ্চশীলে আছে প্রাণীবধ বা হিংসা না করা, চৌর্যবৃত্তি না করা, মিথ্যা কথা না বলা, ব্যভিচার বা যৌনাচার না করা, কোনো প্রকার মাদকদ্রব্য সেবন না করা প্রভৃতি। এগুলো হলো সুন্দর আচরণবিধি, যা সৌজন্য, ভদ্রতা, মানবতা, সহিষ্ণুতা, পরোপকার, মার্জিত রুচি, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধসহ সৃজনশীল কর্ম, সাম্য, মৈত্রী প্রভৃতি আদেশ-উপদেশের নির্দেশনা। এসব মানবিক গুণের অনুশীলনকে বুদ্ধ উৎসাহিত করেছেন। এসব গুণের সমাবেশেই একটি মানুষের জীবন যেমন সুন্দর ও পরিপূর্ণ হয়, তেমনি সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনও জননীতি, জন-আদর্শে পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী হয়। অতএব, বুদ্ধের বহুমাত্রিক কল্যাণময়তা এভাবে মানবগোষ্ঠীকে মঙ্গলের পথে আসতে আহ্বান জানায়। বিশ্বশান্তি ও বিশ্বমানবতা গঠনে প্রেরণা জোগায়।
বৌদ্ধধর্ম বলছে, বিজ্ঞানের আবিষ্কার আপাতদৃষ্টিতে সুখ-সমৃদ্ধময় মনে হলেও মানব কিংবা জীবকুলকে জরা, ব্যাধি, মৃত্যু থেকে মুক্তি দিতে পারেনি। তাই বুদ্ধ বলেন, ‘আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের মতো আর কোনো মার্গ নেই; চতুরার্য্যের সমান আর কোনো সত্য নেই।’ কিন্তু বিজ্ঞানের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের কোনো বিরোধ নেই। বরং বৌদ্ধধর্ম সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম। তবে ভোগবাদী বিজ্ঞান ও লোকোত্তর বিজ্ঞানের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। ভোগবাদী বিজ্ঞান মানুষকে অমঙ্গলের পথে নিয়ে যায়। ভোগবাদী বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ফলে আজ বিশ্বে যুদ্ধ, আণবিক বোমা ও মারণাস্ত্র ব্যবহূত হচ্ছে। এগুলো বিশ্বশান্তির হাতিয়ার হতে পারে না। 
মহামতি বুদ্ধের মতো আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও বলছেন, মানুষের দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা, হিংসা-বিদ্বেষ থেকেই মারাত্মক ব্যাধির সৃষ্টি হয়। এ জন্য বুদ্ধ লোভ-লালসাহীন ভাবনার কথা বলেছেন; উদগ্র কামনা-বাসনাপূর্ণ ভাবনা ত্যাগ করতে বলেছেন। এতেই মানুষের প্রকৃত মানসিক শান্তি আসতে পারে।
পৃথিবীর মানুষ আজ যুদ্ধ, হানাহানি, রক্তপাতের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাও কাজ করে, শঙ্কা হয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের। কেন? বৌদ্ধদর্শনে এর উত্তর পাওয়া যায় অতি সহজে। বুদ্ধ বলেন, ক্রোধ, লোভ, দ্বেষ, মোহ, কামনা-বাসনা থেকেই এসব অশান্তি এবং যুদ্ধবিগ্রহের উদ্ভব। লোভ, দ্বেষ ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে পরস্পরের প্রতি যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছি। একে অপরকে আক্রমণ করে চলেছি। একে অন্যকে ধ্বংস করার জন্য প্রবৃত্ত হচ্ছি। এটা ব্যক্তিজীবনকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত করে দেশ তথা গোটা বিশ্বকে। ক্ষোভ বা ক্রোধের বশবর্তী হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যায় সত্যি; কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতি যে গোটা বিশ্বের নিরীহ মানুষকে দিতে হয়, সেই বোধ যুদ্ধবাজ শাসকদের নেই। যারা এমন চরিত্রের, তাদের উদ্দেশে বুদ্ধের বাণী এ রকম: ‘যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার যোদ্ধাকে পরাস্ত করা বড় কথা নয়, যে নিজেকে অর্থাৎ নিজের রিপুসমূহকে দমন করতে পেরেছে, সেই প্রকৃত জয়ী।’
আমরা অন্যকে জয় করতে চাই বিভিন্ন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। অথচ আমাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে নিজেকে জয় করতে চাই না। এর চেয়ে অগৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে? যুদ্ধ মানবসভ্যতার এক অভিশাপ। মানুষের মেধার আবিষ্কার মানুষকে হত্যা করার জন্য নয়, মানবজাতিকে ধ্বংস করার জন্য নয়। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার আগে কলিঙ্গ যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর মনকে দারুণভাবে আহত করেছিল। বুদ্ধের অমৃতবাণী তাঁর অশান্ত হূদয়ে শান্তির বারতা এনেছিল। বুদ্ধের বাণীটি ছিল এ রকম: ‘অপ্রমাদ অমৃতের পথ, প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমাদীরা অমর, যাঁরা প্রমত্ত তাঁরা মৃতের ন্যায়।’ মহামতি বুদ্ধের এ রকম মানবতাবাদী মতবাদ ও অহিংসনীতি বিশ্বের সব মানবগোষ্ঠীকে এক অভিন্ন বিশ্বমৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে উজ্জীবিত করে।
হিংসা, হানাহানি, ষড়যন্ত্র, এমনকি পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কার অস্থির এই একুশ শতকে বুদ্ধের বাণী আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক।
‘সব্বে সত্তা সুখীতা ভবন্তু’—বিশ্বের সকল জীব সুখী হোক। সকলেই মঙ্গল লাভ করুক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। ‘নিব্বানং পরমং সুখং’—নির্বাণ পরম সুখ, নির্বাণ পরম শান্তি।
ড. সুকোমল বড়ুয়া: সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন, বাংলাদেশ চ্যাপ্টার।
sukomalbaruapalidu@gmail.com

বুদ্ধপূর্ণিমা ও বুদ্ধবাণীর তাৎপর্য
দিলীপ কুমার বড়ুয়া
আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা। জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ এবং মহাপরিনির্বাণ (মৃত্যু)—বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনে এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। তাই বৈশাখী পূর্ণিমাকে বুদ্ধপূর্ণিমাও বলা হয়। বিশ্ব বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর কাছে দিনটির আবেদন অনন্যসাধারণ। 
সিদ্ধার্থ গৌতম ছিলেন রাজপুত্র। সর্বজীবের মঙ্গল ও দুঃখ থেকে মুক্তির পথ অন্বেষণের জন্য পরিবার-পরিজন, রাজপ্রাসাদের বিলাসী জীবন, স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা ও রাজসিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে তিনি পথে নেমেছিলেন। সুদীর্ঘ ছয় বছর কঠোর সাধনায় লাভ করেন বোধি, খ্যাত হন বুদ্ধ নামে। আবিষ্কার করেন চার আর্য সত্য: জগতে দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখের নিরোধ আছে এবং দুঃখ নিরোধের উপায় আছে। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে তিনি নির্দেশ করেন আটটি অঙ্গসমন্বিত পথ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ: সৎ দৃষ্টি, সৎ সংকল্প, সৎ বাক্য, সৎ ব্যবহার, সৎ জীবিকা, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ চিন্তা এবং সাধু ধ্যানে চিত্তকে নিবিষ্ট করা। এ পথই শান্তির পথ। এ ছাড়া তিনি আবিষ্কার করেন জন্ম, মৃত্যু ও দুঃখের কারণ প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব। এ তত্ত্বের মূল নীতি হলো: ওটা থাকলে এটা হয়, ওটার উৎপত্তিতে এটার উৎপত্তি, ওটা না থাকলে এটা হয় না, ওটার নিরোধে এটার নিরোধ হয়।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীর সবকিছুই কার্যকারণ শৃঙ্খলে আবদ্ধ এবং শর্তসাপেক্ষ। জড়জগৎ ও মনোজগৎ—নীতির দ্বারা পরিশাসিত হয়। ১০টি কারণে জন্ম, মৃত্যু ও দুঃখের সৃষ্টি হয়। তাই প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্বকে দ্বাদশ নিদানও বলা হয়। এসব নিদান বা কারণ হচ্ছে: ১. অবিদ্যা ২. সংস্কার ৩. বিজ্ঞান ৪. নাম-রূপ ৫. ষড়ায়তন ৬. স্পর্শ ৭. বেদনা বা অনুভূতি ৮. তৃষ্ণা ৯. উপাদান ১০. ভব বা উৎপত্তি ১১. এবং ১২. জন্ম, জরা, ব্যাধি, দুঃখ ইত্যাদি। এই ১২টি কারণ শর্ত সাপেক্ষে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটির কারণে অপরটি উৎপন্ন হয়, একটির নিরোধে অপরটির নিরোধ হয়। এই তত্ত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, অবিদ্যার কারণে সংস্কার, সংস্কারের কারণে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের কারণে নাম-রূপ, নাম-রূপের কারণে ষড়ায়তন, ষড়ায়তনের কারণে স্পর্শ, স্পর্শের কারণে বেদনা, বেদনার কারণে তৃষ্ণা, তৃষ্ণার কারণে উপাদান, উপাদানের কারণে ভব, ভবের কারণে জন্ম এবং জন্মের কারণে মানুষ জরা, ব্যাধি, মৃত্যু, অপ্রিয়সংযোগ, প্রিয়বিচ্ছেদ, ঈপ্সিত বস্তুর অপ্রাপ্তিজনিত দুঃখ প্রভৃতি ভোগ করে। বর্ণিত কারণসমূহ একটির কারণে অপরটির ধ্বংস হয়। ফলে অবিদ্যা বিদূরিত হলে সংস্কার বিদূরিত হবে, এমনিভাবে জন্ম নিরোধ করা গেলে জরা, ব্যাধি এবং মৃত্যু-দুঃখ নিরোধ হবে। 
বুদ্ধ উপর্যুক্ত দর্শন এমন একসময় প্রচার করেছিলেন, যখন প্রাচীন ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী জাতিভেদ প্রথার নিগড়ে আবদ্ধ, অসাম্য-অনাচার সর্বস্বতার দ্বারা দারুণভাবে বিপর্যস্ত, ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং বিশ্বাসরূপী সংস্কারের বেড়াজালে শৃঙ্খলিত ছিল। তিনি মানুষকে কোনো প্রকার বন্ধনে আবদ্ধ করেননি, বিশ্বাসরূপী শৃঙ্খল দ্বারাও বাঁধেননি। অধিকন্তু দিয়েছিলেন বুদ্ধি ও বিবেকের স্বাধীনতা। তাই তিনি নিজেকে ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং উপস্থাপিত হয়েছেন পথপ্রদর্শক হিসেবে। তাঁর উপদেশ ছিল ‘নিজের দীপ প্রজ্বলিত করে নিজেই নিজের মুক্তির পথ পরিষ্কার করো, অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না।’
বুদ্ধ কখনো জন্মকে প্রাধান্য দেননি, প্রাধান্য দিয়েছেন কর্মকে। তাই তাঁকে বলতে দেখি, ‘জন্মের দ্বারা কেউ চণ্ডাল হয় না, কর্মের দ্বারাই চণ্ডাল হয়।’ তাঁর ধর্ম কর্মপ্রধান, আপনি আচরি ধর্ম, অনুশীলন ও মননের ধর্ম। এ ধর্মে অদৃষ্টবাদ ও বাহ্যিক আড়ম্বরতার কোনো স্থান নেই। যে যেরূপ কর্ম করবে, সে সেরূপ ফল ভোগ করবে। নৈতিকতা এ ধর্মের অন্যতম আদর্শ। সমগ্র ত্রিপিটক অধ্যয়ন করলেও বৌদ্ধ হওয়া যায় না, যদি না তার নৈতিক চরিত্রের দৃঢ়তা থাকে। বুদ্ধ বলেছেন, ‘তিনিই প্রকৃত বৌদ্ধ (ভিক্ষু), যাঁর চিত্ত বিশুদ্ধ, নৈতিকতায় প্রোজ্জ্বল, লোভ-দ্বেষ-মোহ হতে মুক্ত এবং সত্যদৃষ্টি বা প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ 
একজন বৌদ্ধকে অশুভ কর্ম থেকে বিরত থাকতে হবে, বিরত থাকতে অন্যকে উৎসাহিত বা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করতে হবে। অপর দিকে শুভ বা মঙ্গলজনক কর্ম করতে হবে এবং অপরকেও উৎসাহিত করতে হবে। অশুভ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য বৌদ্ধদের শীল পালন করতে হয়। তন্মধ্যে প্রধান পাঁচটি শীল পঞ্চশীল নামে পরিচিত। এই পাঁচটি শীল হচ্ছে: ১. প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা ২. অদত্ত বস্তু গ্রহণ না করা বা চুরি না করা ৩. ব্যভিচার থেকে বিরত থাকা ৪. মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকা এবং ৫. মাদকদ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা। পৃথিবীতে সব দুঃখ, অশান্তি, অন্যায় ও উপদ্রবের মূলে আছে এই পাঁচটি অপকর্ম। হত্যা, চুরি, ব্যভিচার ও মাদক সেবন—বর্তমান বিশ্বের বিরাট সমস্যা। এই সমস্যা মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে। সভ্যতাকে করছে বিপন্ন। অথচ বুদ্ধ নির্দেশিত পঞ্চশীল এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলন করলে সহজেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। বুদ্ধ ব্যক্তিজীবনের উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে সামাজিক উৎকর্ষ সাধন করতে চেয়েছিলেন। বুদ্ধের চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রে ছিল মানুষ। অধিবিদ্যাসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি নির্লিপ্ত থাকতেন। জগৎ শাশ্বত না অশাশ্বত, ধ্রুব না অধ্রুব এসব অধিবিদ্যাসংক্রান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন, ‘কোনো ব্যক্তি শরাহত হলে আগে সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলা উচিত, নাকি কে শরটি নিক্ষেপ করল, কোন্ দিক থেকে শরটি এল প্রভৃতি আগে অনুসন্ধান করা উচিত? জগৎ-সংসার দুঃখের ফণায় বিকীর্ণ, জরাতরঙ্গে উদ্বেল এবং মৃত্যুর উগ্রতায় ভয়ংকর। এসব প্রশ্নের চেয়ে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা ও উপায় অনুসন্ধান করাই উত্তম।’ মানুষের দুঃখমুক্তিই ছিল তাঁর অভীপ্সা। সমাজ যাদের পতিত হিসেবে উপেক্ষা করেছে, তিনি তাদের উপেক্ষা করেননি। তিনি পতিতকে টেনে তুলে, পথভ্রান্তকে পথ প্রদর্শন করে সমাজে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাইকে তাঁর ধর্মে স্থান দিয়ে তিনি মনুষ্যত্বের জয়গান করেছেন। তিনি নিজেকে এবং তাঁর ধর্মকে সামপ্রদায়িকতার গণ্ডি ও সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি। তাঁকে বলতে দেখি, ‘গঙ্গা, যমুনা... প্রভৃতি নদী যেমন সাগরে মিলিত হয়ে নাম হারিয়ে ফেলে, তেমনি ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র, ক্ষত্রিয়, চণ্ডাল প্রভৃতি আমার ধর্মে প্রবেশ করে নাম হারিয়ে ফেলে, এখানে সকল মানুষ এক।’ বুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত সংঘে বিভিন্ন শ্রেণী ও সমপ্রদায়ের লোক ছিল, যারা আপন মহিমা ও কৃতিত্বে সংঘের মধ্যে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। তাঁর সর্বজনীন বাণীর সুধারস বারাঙ্গনার জীবনকেও পঙ্কিলতামুক্ত করেছিল।
বিশ্বের সব প্রাণীর প্রতি মৈত্রী ও করুণা প্রদর্শন তাঁর প্রচারিত ধর্মের অনন্য দিক। তাঁর অমৃত বাণী বিশ্বের ক্ষুদ্রতম প্রাণী থেকে বৃহত্তম প্রাণীকে পর্যন্ত রক্ষার প্রেরণা জোগায়। তাঁর হাতে ছিল মানবপ্রেমের বাঁশরি, কণ্ঠে ছিল মৈত্রী ও করুণার অমৃত বাণী এবং লক্ষ্য ছিল সত্য ও ন্যায়ের ধর্ম বিতরণ। তাঁকে বলতে দেখি, ‘সাধক ভিক্ষু! মৈত্রীপূর্ণ চিত্তে সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে। মাতা যেমন তার একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে, সেরূপ সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী ও ভালোবাসা প্রদর্শন করবে। কাউকে আঘাত কোরো না। শত্রুকে ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নেবে।’ বিশ্বের সকল প্রাণীর প্রতি বুদ্ধের মমত্ববোধ সর্বকালের মানুষের মনে এক গভীর আবেদন সৃষ্টি করেছে। এই মহামন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সম্রাট অশোক সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ‘রাজ্য জয়, যুদ্ধ, নিপীড়ন, যাগযজ্ঞ-বলি সত্যিকারের ধর্ম হতে পারে না।’ তাই তিনি হিংসানীতি পরিহার করে মৈত্রী-ভালোবাসার নীতি গ্রহণের মাধ্যমে রাজ্যজয়ের পরিবর্তে ধর্মজয়ের পথ গ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের বিশেষত্ব হলো মৈত্রীভাবনা, যা বৌদ্ধমাত্রই অত্যাবশ্যকভাবে পালনীয়। মৈত্রীভাবনার মূল মন্ত্র হলো: ‘সকল প্রাণী সুখী হোক, শত্রুহীন হোক, অহিংসিত হোক, সুখে কাল যাপন করুক।’
মানুষ আজ ধ্বংসাত্মক খেলায় মত্ত। সমগ্র বিশ্বে আজ সংঘাত, সন্ত্রাস, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সমপ্রদায় ও জাতিগত ভেদাভেদ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। পারস্পরিক সমঝোতার অভাবে পাশাপাশি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি। ইতিপূর্বে অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তাতে জাতিগত লাভ হয়নি কিছুই। বরং সভ্যতা ও সংস্কৃতি হয়েছে বিপন্ন। শান্তিকামী মানুষ আর যুদ্ধ চায় না, সামপ্রদায়িক ও জাতিগত ভেদাভেদ চায় না। শান্তি চায়। শান্তি চায়। শান্তি চায়। 
আজকের এই শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—শান্তির জয়গানে ভরে উঠুক বিশ্ব। ‘সকল প্রাণী সুখী হোক’। 
ড. দিলীপ কুমার বড়ুয়া: অধ্যাপক, চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বুদ্ধের শিক্ষায় শান্ত হোক পৃথিবী
বিমান চন্দ্র বড়ুয়া
হাজার বছরের পবিত্রতা ও মানবমুক্তির বার্তা নিয়ে আবারও ফিরে এল পবিত্র বুদ্ধপূর্ণিমা। পৃথিবীতে নতুন অরুণোদয়ে আবারও যোগ হলো একটি বুদ্ধ নববর্ষ। পৃথিবীব্যাপী বুদ্ধের নীতি ও আদর্শ সামনে রেখে, বুদ্ধের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা উদ্যাপন করছেন পবিত্র বুদ্ধপূর্ণিমা। এটি সমগ্র পৃথিবীর বৌদ্ধদের কাছে সর্ববৃহৎ পবিত্র ও পুণ্যময় ধর্মীয় উৎসব। 
আড়াই হাজার বছরেরও বেশি আগে বুদ্ধ যে জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ফেলে গিয়েছিলেন, সেই তুচ্ছ জীবন আজ অনেক বড় হয়ে উঠেছে সুখপ্রত্যাশীদের কাছে। বুদ্ধের জীবনপ্রবাহে কোনো রকম উত্তেজনা ছিল না। কোনো রকম আরাম-আয়েশ ছিল না। কোনো রকম মোহ ছিল না। অলৌকিক ক্ষমতার বিকাশ ছিল না। তিনি অন্ধকারদর্শী ধর্মের জগৎ থেকে মানুষকে সৎ, ন্যায় ও বাস্তবতার পথ প্রদর্শন করছিলেন। মানুষের অধিকারের প্রতি বুদ্ধ সজাগ ছিলেন। এখন প্রশ্ন জাগে, প্রাচীন ভারত তাহলে কি ধর্মদর্শনে সমৃদ্ধ ছিল না? সমৃদ্ধ ছিল বটে। কিন্তু বর্ণবৈষম্য, জাত-পাতের ভেদাভেদ, ছুঁতমার্গের প্রাবল্যে ভেসে চলা ভারতকে একমাত্র জাগ্রত হওয়ার পথে নিয়ে এলেন বুদ্ধ নিজেই। বুদ্ধ বলেন, ‘গঙ্গা, যমুনা...প্রভৃতি বড় নদী বিভিন্ন দিক থেকে উৎপন্ন হয়েও যেমন সমুদ্রে মিলে গিয়ে তাদের স্বতন্ত্র সত্তা হারিয়ে ফেলে, তেমনি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র প্রভৃতি তাঁর ধর্মে এসে জাতি ও গোত্র হারিয়ে ফেলে।’ এখানে তদানীন্তন জাতিভেদ প্রথার মূলে তিনি কুঠারাঘাত করে প্রচলন করেছিলেন সাম্যনীতির। তিনি নারী-পুরুষ সবাইকে এক করে দেখছেন। নারীও যে সাধনার মাধ্যমে পুরুষের সমকক্ষ হতে পারেন, তা-ও তিনি বলেছিলেন। তাঁর ধর্মে অস্পৃশ্য পতিতা, নিপীড়িত নারী যেমন আছেন, তেমনি রয়েছে ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সবার সহাবস্থান।
বুদ্ধের ধর্ম মানবকল্যাণের ধর্ম। জীবনকে সুন্দর পথে, পরিশুদ্ধতার পথে, শান্তির পথে এবং মনকে পবিত্র করার জন্য রয়েছে বুদ্ধের নীতিমালা। এগুলো পরিপালনের মাধ্যমে মানুষ পারিবারিক জীবনে, সামাজিক জীবনে, সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় জীবনে সুখ ও শান্তির পরশ পাবে। বর্তমান বিশ্বে চলছে হিংসা, প্রতিহিংসা, ঘৃণা ও নিষ্ঠুর অমানবিক কার্যকলাপ। ফলে লোভ, দ্বেষ এবং মোহ আশ্রিত প্রদুষ্ট চিত্তের জগতে সৃষ্টি হচ্ছে নিন্দিত ও গর্হিত অমানবিক কার্যাবলি যুদ্ধ, সংঘাত মারামারি, সন্ত্রাস ইত্যাদি। আধুনিক সভ্যতার মধ্যে যে নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তাতে বুদ্ধবাণী মূল্যায়নের সময় এসেছে। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য যে সংঘাত হচ্ছে প্রতিনিয়ত, তাতে অশান্তি ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বুদ্ধ বলেন, ‘শত্রুতার দ্বারা কখনো শত্রুতার উপশম হয় না। মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়।’
বুদ্ধ সত্য ও সুন্দর জীবনযাপনের ক্ষেত্রে নিজেকেই সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে যে আত্মশক্তি রয়েছে, সেই শক্তির বিকাশ সাধনের কথা বলেছেন বুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘নিজেই নিজের উদ্ধার সাধন করো। নিজেই নিজেকে পরীক্ষা করো। মানুষ নিজেই নিজের প্রভু, নিজেই নিজের আশ্রয়। বণিক যেমন তার সুন্দর অশ্বকে বশে রাখে, তুমিও সেরূপ নিজেকে বশে রাখো।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্যের শরণ নিয়ে লাভ নেই। নিজের শরণ নাও, নিজেকে আত্মদীপ করে জ্বালিয়ে তোলো।’ একাকী পথচলার সময় পায়ে কাঁটা বিদ্ধ হলে তা পথিককেই তুলে নিতে হবে। এগুলো কালজয়ী বাণী।
সর্বকালকে অতিক্রম করতে সক্ষম এ বাণী। এগুলোই মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে। নব নব চেতনায় জাগ্রত করে তুলতে পারে সমাজের বিবেকবান প্রতিটি মানুষকে। সুতরাং মানুষকে লোভ, দ্বেষ ও মোহের আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নিজের প্রচেষ্টার প্রয়োজন। জীবনে সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আপন শক্তিকে কাজে লাগাতে হবে। মহান বুদ্ধ সেই আপন শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতির কোলে বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষমূলে গভীরভাবে ধ্যানস্থ হয়েছিলেন। এ সময় তিনি চরম সত্যকে আলিঙ্গন করেছিলেন। এখানে তিনি ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছেন। আর ভারতকে করেছেন মহিমামণ্ডিত। তিনি মহাসত্যের জন্য দুস্তর পথ পাড়ি দিলেন। নির্বাণ লাভের আনন্দে অবগাহন করলেন। 
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন ভাষায় অগণিত মানুষ বুদ্ধকে স্মরণ করেন। কিছুই না হোক, শৌর্য, বীর্য, প্রাজ্ঞতা এবং অন্ধকার থেকে সরে আসার জন্য তাঁর প্রার্থনা একান্তই অপরিহার্য। প্রতিনিয়ত মানুষ বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিবাদী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কথায় বিশ্বাসী। জ্ঞানীমাত্রই কোনো কিছু স্বীকার করতে হলে ভাবের আবেগ অপেক্ষা যুক্তির আশ্রয় নেন। বুদ্ধের শিক্ষার অন্যতম উপাদান যুক্তিবিচারের মাধ্যমে পথচলা। তিনি অন্ধভাবে কোনো কিছু গ্রহণ বা বিশ্বাস করতে বলেননি।
অনৈক্য পরাজয়ের কারণ। প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই গণতান্ত্রিক অধিকার যখনই বাধাগ্রস্ত হয়, সেখানেই দেখা দেয় অসন্তোষ। বুদ্ধ তাঁর প্রবর্তিত সংঘে গণতান্ত্রিক নিয়ম চালু করেছিলেন। বুদ্ধের সময়ে রাজা অজাতশত্রু প্রথম দিকে বৈশালীর লিচ্ছবীদেরকে পরাজিত করতে পারেননি। কারণ, তারা গণতন্ত্রের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা দেখাত আর ঐক্যবদ্ধভাবে তা পালন করত। বুদ্ধভাষিত সপ্ত অপরিহানীয় নীতির মধ্যে দুটি নীতিতেই গণতন্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। যেমন: ক. সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি নির্ধারণ করা এবং খ. নির্ধারিত কর্মসূচি সম্মিলিতভাবে সম্পাদন করা। সমাজ, সংগঠন, রাষ্ট্রে যত দিন গণতন্ত্র ও ঐক্য বজায় থাকবে, তত দিন তাদের কোনো রকম পরাজয় হবে না।
আজ পৃথিবীতে আবার খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বুদ্ধের মানবতার, বিনয় (নিয়মনীতি), সাম্য, মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা, ত্যাগ, উদারতার। বুদ্ধ যে পথ প্রদর্শন করেছিলেন—লোভান্ধ, দ্বেষান্ধ, মোহান্ধ ও ক্রোধান্ধ মানুষ আজ তা থেকে অনেক অনেক দূরে। মানুষ যদি নিজের আশ্রয় কোনো অন্ধকারের পরিবর্তে আলোকশিখায় দৃশ্যমান হয়, তবে তাকে সে মানবে না—এমন কথা কখনো বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। বুদ্ধের অনির্বাণ চেতনা অন্তরে জাগ্রত করার মাধ্যমে মানুষ পেতে পারে অমৃতের সন্ধান। অন্তরের ক্রোধ ও রিপুগুলোকে জয় করা সভ্যতার জন্য খুবই অপরিহার্য। এটা আমরা সবাই বুঝতে পারলেও জয় করতে পারি না কখনো। এ জন্য শান্ত পৃথিবীর স্বার্থে ও অহিংসাময় সমাজব্যবস্থার স্বার্থে বুদ্ধেরই প্রয়োজন; প্রয়োজন তাঁর শিক্ষার একান্ত অনুশীলন; প্রয়োজন তাঁর শান্তির অমৃত নিধির অন্বেষণ—প্রকৃতপক্ষে তাঁর যথার্থ অনুসরণ।
বিমান চন্দ্র বড়ুয়া: সহযোগী অধ্যাপক, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং একাডেমিক কাউন্সিলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বৈশাখী পূর্ণিমার আলোকে সবাই হোক উদ্ভাসিত



॥ শতদল বড়–য়া ॥

আজ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। বুদ্ধ পূর্ণিমা নামে পরিচিত এই পুণ্যতিথি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য এক অবিস্মরণীয় দিন। এ তিথিকে ঘিরে রয়েছে তথাগত বুদ্ধের তিনটি স্মরণীয় ঘটনা। ত্রিস্মৃতিবিজড়িত এ তিথির তাৎপর্য অত্যন্ত বিশাল।
সব পূর্ণিমা তিথি কোনো না কোনো কারণে গুরুত্ব বহন করে। আজকের তিথির সাথে রয়েছে অন্য তিথিগুলোর বিস্তর ফারাক। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বৈশাখী পূর্ণিমার ঘটনাবহুল দিক নিয়ে সারা দিন থাকবে উৎসবে মাতোয়ারা। আজ সরকারি ছুটির দিন। প্রতিটি বৌদ্ধ বিহার কমিটি যথাযোগ্য মর্যাদায় বৈশাখী পূর্ণিমা পালনের জন্য পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে প্রায় সপ্তাহখানেক আগে থেকে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
ত্রিস্মৃতিবিজড়িত বৈশাখী পূর্ণিমায় আজ আমরা নানাভাবে পুলকিত। জাতির ক্রান্তিকালে বুদ্ধ নির্দেশিত বাণীগুলো বড়ই অপরিহার্য বিষয়। জীবনসংগ্রামে আমরা নানাভাবে অত্যন্ত অসহায়। মানবসৃষ্ট প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসতে পারাই হলো একজন মানবের আসল বৈশিষ্ট্য।
গভীর রাত, পুণ্যবতী মায়াদেবী রাজপালঙ্কে অঘোর নিদ্রায় মগ্ন। ঘুমন্ত অবস্থায় তিনি স্বপ্ন দেখলেন, সে দিন ছিল কপিলাবস্তু নগরীতে আষাঢ়ী পূর্ণিমার উৎসব। রানী সারা দিন উৎসবে মেতে কান্ত শরীরে শেষ রাতে স্বপ্নে দেখলেনÑ চার দিক থেকে চার দিকপাল এসে তাকে শয্যাসহ তুলে নিলেন। চাঁদের জ্যোৎস্না ছড়ানো রমণীয় এক হ্রদে রানী দেখলেন সহস্রদল পদ্ম। লাবণ্য আর লালিমায় রক্তিম। এক সাদা হস্তী সেই হ্রদে জলকেলি করছে। হস্তীটি মায়াদেবীর আগমনে সামনে এগিয়ে এলো। একটি বর্ণময় পদ্ম মায়াদেবীর ডান কুক্ষিতে প্রবেশ করিয়ে দিলো হস্তীটি। এতে রানীর দেহমনে এক অপূর্ব শিহরণ জাগ্রত হলো। 
মায়াদেবীর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি পালঙ্কে উঠে বসলেন। শাক্যরাজ্যের প্রাণপুুরুষ রাজা শুদ্ধোধনের রাজমহিষী তিনি। একি আমি দেখলাম। কেন দেখলাম। পরদিন রানী রাজা শুদ্ধোধনের কাছে স্বপ্নের আদিবৃত্তান্ত শোনালেন। রাজা কালবিলম্ব না করে জ্যোতিষীদের ডেকে পাঠালেন এবং জ্যোতিষীদের কাছ থেকে রানীর স্বপ্নের বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইলেন।
জ্যোতিষীরা বললেনÑ মহারাজ, রানী মায়াদেবীর পুত্রসন্তান হবে। এই পুত্র মহাতেজস্বী ও যশস্বী মহাপুরুষ হবেন। শান্ত, গভীর, জগতে দুর্লভ, জীবের দুঃখহারী ও মহাজ্ঞানী পুত্রের জনক হবেন আপনি। তবে এখানে নৈরাশ্য এবং বেদনার সংবাদও জড়িয়ে রয়েছে। আছে কিছু বিয়োগ-বিচ্ছেদের অশনি সঙ্কেত।
রাজা শুদ্ধোধন অতলায়িত বিস্ময়ে তাকিয়ে জ্যোতিষীদের নির্দেশ করলেন ঘটনা খুলে বলার জন্য। তারা বললেন, পুত্রসন্তান লাভের সাত দিন পর মায়াদেবীর অকালমৃত্যু ঘটবে। এ মৃত্যু অমোঘ, অনিবার্য। এক দিকে রাজপ্রাসাদে মহাপুরুষের আগমন সংবাদ অন্য দিকে মায়াদেবীর আসন্ন মৃত্যু সংবাদে, রাজা শুদ্ধোধন বিচলিত। আসন্ন প্রসবা মায়াদেবীর রূপ যেন বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্য বারিধি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। ভূকৈলাসের রাজা আসবেন এ মর্ত্যভূমিতে। জ্যোতি রূপোজ্জ্বলা। প্রাণময়ী পরামার্থা। যুগে যুগে মহাপুরুষেরা এভাবেই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন।
যথাসময়ে মায়াদেবী পিত্রালয় দেবদহনগরে যাওয়ার জন্য রাজা শুদ্ধোধনের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। মায়াদেবী দেবদহ নগরের রাজা সুত্রবুদ্ধের জ্যেষ্ঠ কন্যা। এলো বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। ইতঃপূর্বে রাজা রানীর বাপের বাড়ি যাওয়ার সব ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে রেখেছিলেন।
নির্দিষ্ট দিনে সন্তানসম্ভাবা মায়াদেবী সখীদলসহ রথে চড়ে বাপের বাড়ির পথে যাত্রা শুরু করলেন। মুখে তার অপরূপ লাবণ্য, বেদনা, করুণা, ক্ষমা আর ধৃতির স্নিগ্ধতা। তিনি হবেন আলোকসুন্দর দিব্য পুরুষের জন্মদাত্রী। সৃষ্টির পূর্ণতা ও অনুপম সৌন্দর্যে সমুজ্জ্বল। বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে লুম্বিনী কাননে পৌঁছামাত্রই মায়াদেবীর প্রসববেদনা শুরু হলো। এক পদ্ম-পলাশ-লোচন ব্রহ্মযোগযুক্ত আত্মভোলা শিশু জগতের ভাবী বুদ্ধের জন্ম হলো। লুম্বিনী উদ্যান হয়ে উঠল সৃষ্টির উৎসারিত আলোকসমুদ্র। পূর্ণতার পরমতম আকর্ষণ। মায়াদেবী উদাসীন অথচ আনন্দময়ী, জগজ্জননী জ্যোতির্ময়ী। মহাসমারোহে শোভাযাত্রা সহকারে মাতা ও তেজস্বী নবজাতককে লুম্বিনী কানন থেকে কপিলাবস্তু নগরের রাজাপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনা হলো। এই দিনে গয়ার বোধিবৃক্ষ, রাহুলমাতা গোপাদেবী, চার নিধিকুম্ভ, চার মঙ্গল হস্তী, সারথি ছন্দক এবং অমাত্যপুত্র উদায়ীও জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষ গৌতমের সাথে তারা প্রত্যেকে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। সেই শুভদিনটি ছিল আজকের বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি।
দিব্যজ্ঞানস্বরূপ সাধনা সম্ভুত জ্যোতির্ময় পুরুষের জন্মদানের সাত দিন পর মায়াদেবীর 
অকালমৃত্যু ঘটে। মায়াদেবীর মৃত্যুতে রাজ্যময় শোক নেমে এলো। রাজপ্রাসাদের অঙ্গন-প্রাঙ্গণের সব বাতি নিভিয়ে রাখা হলো। কুমারী কন্যাদের বিঙ্কিনীর রোল আর বাজল না। কাদম্বিনীরূপী কবরী আর খোলা হলো না। মৃদু মলয়ে বসন্ত সখার সুরধ্বনি বন্ধ হয়ে গেল। শাক্যরাজ্যব্যাপী শোক পালনের মধ্য দিয়ে মায়াদেবীর মৃত্যুদিবস পালন করা হলো।
সেই প্রাচীনকালে রাজাদের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিল বিধায় রাজা শুদ্ধোধনেরও একাধিক মহীষী ছিলেন। তার মধ্যে মনোমাধুরী মায়াদেবীই ছিলেন রাজার প্রধান পতœী। রাজা তার অপর স্ত্রী গৌতমীকে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ জানালেন। গৌতমীও বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে সিদ্ধার্থের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। ফলে বিমাতা গৌতমীর অশেষ স্নেহপরশে সিদ্ধার্থের শৈশব কাটতে লাগল।
রাজকুমার সিদ্ধার্থ এখন পূর্ণ কিশোর, শান্ত মূর্তি। রাজা শুদ্ধোধন পুত্রের শিক্ষার কথা চিন্তা করতে লাগলেন। সর্বোচ্চ এবং সর্বপ্রকার শিক্ষার জন্য শাক্যরাজ্যের পণ্ডিত প্রধান বিশ্বামিত্রকে নিযুক্ত করলেন। পরে এক শুভ দিনে পণ্ডিতপ্রধান বিশ্বামিত্র রাজকুমারকে রাজা শুদ্ধোধনের কাছে এনে বললেনÑ রাজমহাশয়, রাজকুমারের শিক্ষা শেষ। আমার দেয়ার মতো আর কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। রাজকুমার দৈনিক শিক্ষায়তনেও মেধার বিকাশ ঘটালেন খুব অল্প সময়ে। তার আর কোনো শিক্ষা বাকি রইল না। সব বিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠলেন।
এত কিছু রপ্ত করার পরও রাজকুমার চিন্তিত, নিঃসঙ্গ; কিন্তু নিঃশঙ্ক। এ খবর খুব অল্প সময়ে চার দিকে প্রচার হয়ে গেল। রাজা শুদ্ধোধনও পুত্রের চিন্তায় বিভোর। তিনি জানতেন এমন কিছু একটা ঘটবে। এ তার ভবিতব্য, কপাল লিখন। রাজা দেখলেন সিদ্ধার্থের বয়স যতই বাড়ছে তার শরীর ততই হয়ে উঠছে তেজস্বান। কোনো একটা বিষয়ে বিশ্বাস আর ব্যাকুলতা তার বাড়ছে। কিসের বিশ্বাস, কিসের ব্যাকুলতা! রাজা শুদ্ধোধন কিছুই অনুমান করতে পারছেন না।
রাজপুত্রের উদাসীনতা কাটাতে নানা প্রচেষ্টা চালিয়েও রাজা সফলকাম হতে পারছেন না। একদিন মিনি রাজ্যে রথ প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন শুধু সিদ্ধার্থকে ফেরাতে। প্রতিযোগীরা হলেনÑ নন্দ, আনন্দ, দেবদত্ত ও রাজপুত্র সিদ্ধার্থ। ঘোষণা করা হলো, প্রতিযোগিতায় যে প্রথম হবে তাকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে।
যথারীতি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। রথে ঘোড়া যোজনা করল চার প্রতিযোগী। তারপর শুরু হলো যাত্রা। প্রথমে ধীর-মন্দ গতিতে, পরে জোরে, আরো জোরে, ক্ষিপ্রগতিতে এবং সর্বশেষ উল্কা গতিতে। পলকে পলকে দৃশ্য পাল্টে যেতে থাকল। রাজকুমার সিদ্ধার্থ পলকে শাক্যরাজ অতিক্রম করে চলে এলেন। পেছনে, অনেক পেছনে নন্দ, আনন্দ ও দেবদত্ত।
প্রতিযোগিতায় রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রথম হলেন। তাকে বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হলো রাজার ঘোষণা অনুযায়ী। এতে রাজার আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলো। রাজপ্রাসাদের কুললনারা ও সমবেত জনতা আনন্দ ধ্বনিতে সিদ্ধার্থকে জয়মাল্যে ভূষিত করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এলেন। সিদ্ধার্থ জয়ী, প্রতিযোগিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় তার কোনো আগ্রহ নেই, নেই কোনো আনন্দ। তবু এ কাজ কর্তব্যবোধেই তিনি করলেন; এ তার কর্তব্য, পিতৃ আজ্ঞা পালন।
কুমার সিদ্ধার্থ গৃহ ত্যাগ করে কঠোর সাধনা ও তপস্যার বলে যে দিন বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন, সে দিনও ছিল আজকের এ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। বুদ্ধত্ব লাভের পর বৌদ্ধধর্ম প্রচার করে যে দিন তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন তাও ছিল আজকের এ শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি।
বৈশাখী পূর্ণিমার এই শুভ তিথিতে সবাইকে জানাই মৈত্রীময় শুভেচ্ছা। সবার জীবন হোক পুণ্যময়। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক, সমৃদ্ধি লাভ করুক বাংলাদেশ। 
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

শুক্রবার, ৪ মে, ২০১২

পেঁচাকাহিনি


ডাংগুলি, লাটিম, গুলতি, সাতচারা আর গোল্লাছুট শুনলেই মনে পড়ে কিশোরবেলার কথা। আমগাছের ডাল ভেঙে গুলতি বানিয়ে বনবাদাড়ে পাখি শিকারের জন্য কাঁচা হলুদ রোদে ঘুরে বেড়ানোর মধুর স্মৃতি অনেকেরই আছে। মনে পড়ে চোখ বাঁধা ছোঁয়াছুঁয়ির খেলা। বাড়ির পাশে ছাত্তিচোরার বাড়ি ছিল। সে বাড়ির খোলা প্রান্তরে চলত আমাদের নেশার মতো সেসব খেলা। আমার বয়স তখন সাত কি আট হবে। সেসব আজ কেবলই স্মৃতি। কৈশোরের সেসব স্মৃতি একেবারে চোখের সামনে চলে এল একদিন সাভারের ভাকুর্তার কাছের চাইরা গ্রামে গিয়ে।
সেদিন বিরোধী দলের ডাকা হরতালের দ্বিতীয় দিন। মিরপুরে কিছু কাজ ছিল। কাজ সেরে ভাবলাম কাছেপিঠে ধান তোলার দৃশ্য পেলে ছবি তুলব। চলে গেলাম ভাকুর্তা হয়ে চাইরা। এখানেই চলতি পথে দেখা গেল শিশু-কিশোরের মাছ ধরার দৃশ্য। মজার সে দৃশ্য মনে সুখানুভূতি বইয়ে দিল। একটু এগিয়ে দেখলাম, একদল কিশোর গোল্লাছুট খেলছে, খেলছে ডাংগুলি। মনটা চাঙা হলো, মনে পড়ল সুন্দর আমার শৈশব। কিছুক্ষণ পর নাকে ধনেপাতার সুগন্ধ এসে লাগল। এলাকাজুড়ে ধনেপাতাসহ অনেক ধরনের শাকসবজির চাষ হচ্ছে। এগিয়ে চলেছি, কোথাও ধানের চিহ্ন নেই। সোজা পথ, দুই পাশে সবুজ আর সবুজ। এখানেই ভাকুর্তার কাছে জটলার মতো দেখে মোটরসাইকেল ব্রেক করি। এক দঙ্গল ছেলে কিছু একটা নিয়ে বচসা করছে দেখে এগিয়ে যাই। ১০-১২ জন কিশোর। তাদের একজনের হাতে দড়ি আর সুতোয় বাঁধা দুটি পেঁচা। একদল বলছে ছেড়ে দে। আরেক দলের গোঁ-ধরা জেদ, ছাড়মু ক্যান, বিক্রি করমু। বচসার সে পর্যায়ে আমাদের আবির্ভাব। প্রথমে কায়দা করে ওদের বলে পেঁচার ছবি তুলে নিলাম। তারপর আলাপ জমালাম। কেউ কেউ স্কুলে পড়ে, কেউ বেকার। বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। সঙ্গে পাশের নদীতে ছিপ ফেলে মাছ ধরা, কখনো পাখি শিকার। সঙ্গে এক-আধটু অন্যের বাড়ির ফল না বলে পেড়ে খাওয়া তাদের প্রতিদিনকার দুরন্তপনার তালিকা। বর্তমানের জনপ্রিয় ক্রিকেট খেলা তাদের তালিকায় নতুন সংযোজন। আজ ক্রিকেট খেলার কথা থাকলেও সঙ্গী তিনজন দল থেকে আলাদা হয়ে চলে যায় গোলাই নিয়ে পাখি শিকারে। অন্যদের এই নিয়ে খুব রাগ, কিন্তু কিছু করার নেই। ওরা আবার দলনেতা। রবিউল, ওয়াসকরনী, কাজিমরা যখন ফিরে এল, তখন তাদের হাতে দুটি পেঁচা। বচসা শুরু সেখানেই, কেন খেলার কথা বলে ওরা পাখি ধরতে গেল। তারপর শুরু হলো পেঁচা নিয়ে ঝগড়া। রবিউল, ওয়াসকরনী আর কাজিম বাদে সবাই পেঁচা ছেড়ে দেওয়ার দলে। কিন্তু রবিউলদের এক কথা—ছাড়ুম না, বিক্রি করমু। ওষুধ বিক্রেতারা দুইটা পেঁচা ২০০ ট্যাকা দেব। সে মুহূর্তে শিল্পী কালিদাস কর্মকারের কথা মনে পড়ে গেল। ২০০৪-এ নিঝুম দ্বীপে সূর্য উৎসবে গিয়েছিলাম। দ্বীপে নেমেই আমরা যে যার মতো ঘুরে বেড়াতে গিয়ে হরিণের শিংয়ের খবর পেলাম। তারপর ৩০ টাকা জোড়া সে শিং কেনা শুরু করলাম। তখন কালিদাস দা এসে আমাদের বাধা দিলেন। বলেন, ওদের টাকা চেনাবেন না। এখন শিং বিক্রি করছে। একদিন আস্ত হরিণ ধরে মারবে আর শিংসহ মাংস বিক্রি করবে। তখন আপনি-আমি শত চেষ্টা করেও তাদের আটকাতে পারব না। লোভ খুব খারাপ।
সত্যি লোভ খুব খারাপ। আগেই হয়তো রবিউল, ওয়াসকরনী আর কাজিমরা পাখি বা পেঁচা ধরে বিক্রি করে থাকবে। সুতরাং তাদের বোঝানো খুব কষ্টকর হলো যে তোমরা আজ পেঁচা ধরেছ বা প্রায় সময় পাখি ধরে এসব পাখি বা পেঁচা ধ্বংসের পাশাপাশি পরিবেশের ক্ষতি করে চলেছ, যা খুব অন্যায় ও গর্হিত কাজ। শেষে বললাম, পেঁচা আমাদের দাও, আমরা চিড়িয়াখানায় জমা দেব। তাতেও রাজি না হলে ১০০ টাকায় পেঁচা দুটি কিনে নিলাম। তারপর ভাকুর্তার কাছে এসে এক বিজন এলাকায় গাছগাছালি দেখে পেঁচা দুটিকে একটু সেবা আর পরিচর্যা করে সুতা ও দড়ি মুক্ত করে একটি গাছে চড়ে তার ডালে বসিয়ে দিলাম। একটি পেঁচা সঙ্গে সঙ্গে উড়াল দিল, অন্যটি গোলাই ছোড়ার আঘাত পায়ে দারুণভাবে লেগেছিল। সে গাছের ডালে বসে দাঁড়াতে চেষ্টা করল, মাটিতে পড়েও গেল। তারপর একটু সময় বিশ্রাম নিয়ে সেও উড়াল দিল!
পেঁচা দুটি সম্ভবত হুতুম পেঁচা ছিল। বয়স বেশি না। গ্রামগঞ্জে বড় গাছগাছালি ও বনে পানির খুব কাছে গাছের ওপর এদের সময় কাটে। দিনের বেলায় খাবারের সন্ধানে বের হয়, বিশেষ করে মাছের সন্ধানে। পেঁচা দুটিকে আমি আর আমার সঙ্গী মিলে বেশ সময় নিয়ে সেবা করেছিলাম। কিন্তু উড়ে যাওয়ার কালে একটি পেঁচা আমার কনিষ্ঠায় কামড়ে দিয়ে রক্তপাত ঘটিয়েছিল। সে কষ্ট বা ক্ষত এখন আর নেই, কিন্তু পেঁচা দুটিকে স্বাধীন করার সুখ আজীবন থাকবে!
ফারুখ আহমেদ

farukh.ahmed@gmail.com


বৃহস্পতিবার, ৩ মে, ২০১২

ইতিহাসের আলোকে স্বদেশের মুখ



আ লী  ই মা ম
ইতিহাস থেকে জানা যায় দু’হাজার বছর আগে বাংলাদেশে উন্নতমানের জাহাজ তৈরি হতো। বাঙালিরা তখন বাণিজ্য করতে যেত সুদূর ক্রিট, আলেকজান্দ্রিয়া ও কৃষ্ণ সাগরে। পূর্বদিকে যেত চীন সাগরে।
রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে ক্ষীর সাগর, যবদ্বীপ, ইক্ষুরস সাগর, সালমালা দ্বীপ, সোরা সাগর ও ক্ষিরদা সাগরের।
ঋগবেদে বলা হয়েছে চারটি সমুদ্রে যাতায়াতের কথা।
মহাভারতের দ্রোণপর্বে বলা হয়েছে, সমুদ্রের অগভীর পানিতে বিপদে পতিত লোকরা যদি দ্বীপ পেয়ে যায় তাহলে বেঁচে যায় তারা। আদিপর্বে রয়েছে কারু ও তার বোন বিনীতার কাহিনী। সেখানে সমুদ্রের বর্ণনা রয়েছে। দু’বোন এসে পৌঁছাল কুমিরে ভরা সমুদ্রতীরে। সমুদ্রে ছিল বিশাল তিমিঙ্গল। সামুদ্রিক দানব।
অর্জুন গিয়েছিল উত্তর সমুদ্রে। পাখি ছাড়া সেখানে আর কেউ যায় না। লবণ সমুদ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেখানে প্রচুর খনিজ দ্রব্য, পাহাড়-পর্বত রয়েছে।
রামায়ণে বর্ণিত হয়েছে সুমাত্রা ও জাভা দ্বীপের পরে ইক্ষু সাগর অবস্থিত। শিশির পর্বত রয়েছে জাভা দ্বীপের পরে। গর্জনশীল সমুদ্রকে মনে হয় মেঘের মতো কালো। এ সমুদ্র সাপে পরিপূর্ণ। উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে পড়বে লাল পানির সাগরে। সেখানে রয়েছে সালামালা দ্বীপ। ওই দ্বীপ পেরিয়ে সাদা ও হলুদ মেঘের বর্ণের মতো ক্ষীর সাগর চোখে পড়বে। ওই সাগর দেখতে এত সাদা যেন মুক্তায় পূর্ণ। এই সাগরের মাঝখানে রয়েছে গাছপালায় ভরা পর্বত।
জাতকের একটি কাহিনীতে আছে, ভৃগুচ্ছক থেকে জাহাজে করে সমুদ্রযাত্রার কথা। সাত দিনের পথ। ঝড়ের কবলে পড়ে ভেঙে যায় জাহাজটি। চার মাস একটানা ভেসে চলার পর জাহাজ এসে ভেড়ে উরুকানাল সাগরে। জাহাজটি আগুনের মতো জ্বলা অগ্নিমালা সাগর পেরিয়ে যায়।
প্রাচীন সাহিত্যে এভাবে বিভিন্ন রূপকের মধ্য দিয়ে সমুদ্রের দ্বীপের বর্ণনা রয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে আর্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের বিভিন্ন এলাকা, দ্বীপ, সাগর, নদী সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। তারা সমুদ্রে অভিযান চালায়।
বঙ্গ অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার এক নিদর্শন হচ্ছে পাণ্ডু রাজার ঢিবি। তখনকার দুঃসাহসী লোকজন সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে বিদেশে যেত বাণিজ্যের জন্য। তাদের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল ক্রিট দ্বীপ ও ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গে। যেসব দ্রব্যের বাণিজ্য হতো তা হল মসলা, তুলা, হাতির দাঁত, সোনা, রুপা, তামা, হীরা ও শর্করা। লোথাল বন্দর থেকে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির জাহাজের মাস্তুল। হরপ্পীয় বন্দরগুলো থেকে বাণিজ্য জাহাজগুলো সমুদ্র উপকূল ধরে ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরের বাহারিনে নোঙর করত। লোহিত সাগর বরাবর আরও একটি পথ ছিল। প্রাচীন উর দেশের বণিকরা মেলুহা (ভারতবর্ষ), তিলমুন (বাহারিন) এবং মাগান (ওহমান)-এর সঙ্গে বাণিজ্য করত।
সম্রাট সোলেমানের রাজত্বকাল (৮০০ খ্রিস্টপূর্ব) টায়ারের শাসক হিরামের নির্দেশে একটি বাণিজ্যিক নৌবহর পূর্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করেছিল। জাহাজ বোঝাই করে নিয়েছিল সোনা, রুপা, বানর, ময়ূর ও পাথর। অফির নামক এক স্থান থেকে এসব পণ্য সংগৃহীত হয়।
৫১০ খ্রিস্টপূর্বে পারস্য সম্রাট দারায়ুসের নির্দেশে স্কাইলাস সিন্ধু নদের গতিপথ দেখার জন্য কাবুল নদী বেয়ে জাহাজ নিয়ে সিন্ধুতে উপনীত হন।
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিখ্যাত আবিষ্কারক ইউডাক্সাস দু’বার সমুদ্রপথে সোজাসুজি ভারত অভিমুখে পাড়ি দিয়েছিলেন।
৪৫ খ্রিস্টাব্দে হিপ্পালাস নামে একজন নাবিক আবিষ্কার করলেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে ভারতীয় সমুদ্রের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় মৌসুমী বায়ু। এই অনুকূল বায়ুর সাহায্যে মাত্র ৪০ দিনের কম সময়ে লোহিত সাগরের ওজেরিন বন্দর থেকে ভারতের মালাবার উপকূলে মুজিরিস বন্দরে পৌঁছানো সম্ভবপর হয়। 
পেরিপ্লাস লিখেছিলেন ভারতের নর্মদা নদীর মোহনায় অবস্থিত ভৃগুকচ্ছ বন্দরে দূরের কাশ্মীর থেকেও রফতানির জন্য পণ্য এনে জমা করা হতো। এর উত্তরে সিন্ধু নদের মুখের মাঝে বারবারিকাম নামে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। তখন গ্রিক বাণিজ্য জাহাজগুলোকে সামরিক প্রহরায় নিয়ে আসা হতো। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের শেষদিকে আলেকজান্দ্রিয়ার অবক্ষয় ঘটতে শুরু করলে রোমের সঙ্গে এই অঞ্চলের বাণিজ্যে ভাটার লক্ষণ দেখা যায়।
সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে ‘পেরিপ্লাস, ইরিথ্রিয়ান অব দ্য সি। সত্তর খ্রিস্টাব্দে রচিত। ধারণা করা হয় আলেকজান্দ্রিয়া থেকে আগত কোনো মিসরীয় নাবিকের রচিত এই বই। এর রচয়িতা লোহিত সাগরের এক বন্দর বোরনিস থেকে যাত্রা করে রাব এল মান্দব প্রণালী পার হয়ে মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের সুযোগ নিয়ে মধ্য সমুদ্রপথে আরব সাগর অতিক্রম করেন। পথে বারবারিকন, বারিগাজা বন্দরে অবতরণ করেন। এই গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট বহু বন্দরের বিশদ বিবরণ রয়েছে। এ সব তথ্য পরবর্তীকালে পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হয়েছিল। জাহাজ পরিচালনাকারী এবং নাবিকরা মৌসুমী বায়ুপ্রবাহের গুরুত্ব এবং প্রভাবকে অনুধাবন করতে পারল। মৌসুমী বায়ুর তথ্য অভিযাত্রীদের উত্সাহিত করল। এর আগে আরব, পারস্য ও বেলুচিস্তানের উপকূলপথে মিসরীয় বাণিজ্য জাহাজগুলো আসত ভারতবর্ষের বন্দরে। পূর্ব আফ্রিকার বণিকরা তখন সরাসরি আরব সাগর পাড়ি দিয়ে আসত।
রোমকরা পেরিপ্লাসের সময় থেকে
সমুদ্র পারাপারের জন্য মৌসুমী বায়ুর সুযোগ গ্রহণ করে।
ভারতীয় বাণিজ্য জাহাজগুলো মণি-মুক্তা, মূলবান পাথর, হাতির দাঁত, মসলা, রেশমি বস্ত্র, মসলিন, চাল, তিল, তেল, ঘি, চিনিসহ নানা ধরনের ভেষজ নিয়ে যেত। বনজদ্রব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নীল। এসব বাণিজ্য জাহাজ কুয়ারিকা অন্তরীপ প্রদক্ষিণ করে তাম্রলিপ্তি (তামালিটিস), তাকোলো (মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনের নিকটবর্তী), আবানা, মৌলাসিন বন্দরে যেত। দক্ষিণ-পূর্বে যবদ্বীপ, মালয়, সুমাত্রা, কম্বোজের বিভিন্ন বন্দরে যেত। ভিয়েতনামের হ্যানয়ের কাছে কাট্টিসারা বন্দরে যেত।
খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে কাশ্মীরি বৌদ্ধ মনীষীরা চীনে গিয়েছিলেন। এদের মধ্যে যাদের সমুদ্রযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায় তারা হলেন সঙ্গদেব, বিমলাঙ্ক, পুণ্যত্রাত শঙ্খভূমি। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ ‘সংযুক্ত নিকায়ে’তে স্বেতক নগরীর উল্লেখ রয়েছে। এই নগরী অবস্থিত ছিল প্রাচীন বাংলার রাঢ়দেশে। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রচিত টীকাগ্রন্থ ‘মিলিন্দ’তে বর্ণিত রয়েছে, ‘বঙ্গে একটি প্রধান সামুদ্রিক বন্দর ছিল। বৌদ্ধ নাবিকদের পরিভ্রমণের বিবরণ থেকে প্রাচীন বাংলার অনেক তথ্য পাওয়া যায়। খ্রিস্ট্রীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে রচিত ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ ‘মিলিন্দ’, ‘জাতক’ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকে প্রাচীন বাংলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের সূত্রে বৌদ্ধ শ্রমণরা যেতেন বিভিন্ন অঞ্চলে। এর ফলেও ভৌগোলিক জ্ঞানের যথেষ্ট বিকাশ লাভ হয়েছিল।
প্রাচীনকালের বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রটি সমৃদ্ধ ছিল।
কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, তিব্বতি ভাষা থেকে এসেছে বঙ্গ শব্দটি। তিব্বতি ভাষায় বঙ্গ মানে আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে। গাঙ্গেয় অববাহিকার এ অঞ্চলটিতে ছিল অসংখ্য বিস্তীর্ণ খালবিল, নদী, জলাশয় ও হাওর। এলাকাটি ছিল জলজ প্রকৃতির। তাই নামকরণের ক্ষেত্রে এই ভৌগোলিক পরিবেশটি প্রভাব ফেলতে পারে। তখনকার এ অঞ্চলের জনপদের নাম ছিল বজ্র, পুণ্ড্র, রাঢ়, তাম্রলিপ্তি, বরেন্দ্র, গৌড়, সমতট ও হরিকেল।
খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের প্রারম্ভে মগধ দেশ থেকে বৌদ্ধ প্রচারকরা পূর্বদেশে গিয়েছিলেন ধর্ম প্রচার করতে।
সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব ২০০ বছর আগে পাটলিপুত্র থেকে মোগলীপুত্ত খেরোর নেতৃত্বে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিলেন। দলটি সুবর্ণভূমি (মিয়ানমার ও শ্যাম দেশ) গমনকালে বঙ্গ অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে গিয়েছিল।
৪২৩ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধজীব চীনের নানকিভ নগরীতে পৌঁছেছিলেন। পঞ্চম শতাব্দী থেকে ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে বৌদ্ধ দার্শনিকরা চীন দেশে ব্যাপকভাবে যেতে থাকেন। 
ইতিহাসের পথপরিক্রমায় আমরা অবহিত হই কীভাবে বাঙালির রন্ধন শিল্পের সঙ্গে মসলার সংমিশ্রণ ঘটেছিল। মসলার ইতিহাসের উত্স অনুসন্ধান করলে আমাদের দেশের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগসূত্র স্থাপনের কাহিনী জানা যাবে। বাঙালির বহির্বাণিজ্যের ইতিহাসে আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের বহু প্রেক্ষাপট জানা যাবে।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ১৯৭৩ সালে এক আলোচনাসভায় মন্তব্য করেছিলেন, বাঙালির ইতিহাস হচ্ছে এদেশের নদীতীরে গড়ে ওঠা গঞ্জ-হাটের ইতিহাস। 
মসলার বাণিজ্য করেই কালিকট রাজ এককালে সমৃদ্ধি লাভ করেছিলেন। পর্তুগালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সেই সমৃদ্ধি। পঞ্চদশ শতকে কালিকটে অধিকার বিস্তারের উদ্দেশ্যে তারা অভিযান চালায়। মসলার উত্পাদন পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে বিস্তৃত হয়েছিল। পর্তুগালের পথ ধরে সেখানে আসে ওলন্দাজরা। সতের শতকে আসে ইংরেজরা। মসলার লোভে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর অভিযান আমাদের দেশের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সে যুগের গাঙ্গেয় অববাহিকা অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার দিক সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে রয়েছে উপনিবেশ স্থাপন ও সাম্রাজ্য বিস্তার, কুিসত লোভ ও বর্বর অন্যায়, মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণের ঔপনিবেশিক প্রচেষ্টা।
বাঙালির অতীত জীবন-যাত্রার কাহিনী, কৃষি ব্যবস্থা ও তার রন্ধনশিল্প সম্পর্কে তথ্য জানা ইতিহাসের উত্স অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন।
বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন ‘চর্যাপদ’-এ তা বিধৃত রয়েছে।
প্রাচীনকালের লোকরা হরিণের মাংস খেতে পছন্দ করত। শবররা জাল পেতে হরিণ ধরত। তখনকার দিনে যে চারদিক থেকে জাল দিয়ে বন ঘিরে হাঁক পাড়তে পাড়তে শিকারিরা হরিণ ধরত, তার বিবরণ আছে চর্যাপদে। চারদিক থেকে ব্যাধে ঘিরে ফেলেছে, ভীতচকিত হরিণ তখন যে অবস্থায় আছে, তার বর্ণনাও খুব ঝকঝকে-
‘তিন ন চ্ছু পই হরিণ।
পিবই ন পানী,
হরিণা হরিণীর নিলয় ন জানী
হরিণ তো আর সব সময় পাওয়া যেত না। ছাগলের মাংস বেশ পাওয়া যেত। শবর বা পুলিন্দ জাতের লোকরা মাঝে মধ্যে পাহাড়ি ছাগল ধরে আনত।
বড় ভরাট ছিল তখনকার দিনের তরিতরকারির বাগানগুলো। তরতাজা হয়ে যখন ঝুলে থাকত, তাই দেখে চাষিরা পেত শান্তি। নিজের হাতের লাগানো সবজি। শীতকালে শিশির ধোয়া হয়ে যা আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠত। ফলমূলও ছিল অনেক রকম। প্রাচীন পুঁথিতে আমরা তাল, কলা, আখ, নারকেল, আম, কাঁঠালের বিবরণ পাই। বেল, জামরুলের কথাও আছে। আখের রস জ্বাল দিয়ে এক ধরনের গুড় তৈরি হতো। চর্যাপদের এক জায়গায় তেঁতুলের কথা পাওয়া যায়। অনেকে কাঁচা ফল থেকে আচার বানাত। বিভিন্ন পুঁথিতে তার বর্ণনা আছে। ডেফুল নামের এক রকম ফল ছিল। এ গাছের কাঁচা ফল থেকে এক রকম আঠার মতো রস পাওয়া যায়। রং তার সাদা। পাকা ফল ফালি ফালি করে চিরে রাখতে হতো। সেই ফলের টুকরো গরম পানিতে কিছু সময় ডুবিয়ে রাখলেই এক রকম জমাট রস বের হতো। সেই জমাট রসের মাঝে চাল সেদ্ধ করে তৈরি হতো চাটনি। গাঁয়ের লোকজন চালতা ফল তরকারি হিসেবে ব্যবহার করত। কতবেল ছিল হাতির প্রিয় খাদ্য।
পুকুর, খাল-বিলের ধারে কলমি আর হেলেঞ্চা শাক জন্মাত। জলপিপির দল সেই দামের ওপর দিয়ে তিরতির করে হেঁটে যেত। তরিতরকারির রান্না ছাড়াও তৈরি হতো নানা রকম পিঠা। গুড়, চালের গুঁড়া, তেল-ঘি, দুধ মিশিয়ে এসব পিঠা তৈরি হতো। অনেক সময় বিভিন্ন ফলের রস অর্থাত্ তাল, কলা, নারিকেল কিংবা খেজুরের রসের মাঝে এসব পিঠা ভিজিয়ে রাখা হতো। 
কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে চিড়া আর নারিকেলের তৈরি নানা রকমের সন্দেশ খেতে দেওয়া হতো আত্মীয়-বন্ধুদের। উড়কি ধানের মুড়কি আর বিন্নি ধানের খইও ছিল। মুড়ি, মোয়া, বাতাসাও ছিল। দুধ থেকে তৈরি হতো ক্ষীর, পায়েস, মিষ্টি। সে আমলের কিছু মিষ্টান্নের নাম বলছি। খাঁড়, কদমা, ফেনি, দুধশাকব, খাজা, ক্ষীরসা; নাড়ু আর ঘি, দই, গুড় ও আদা মিশিয়ে তৈরি হতো শিখারিনী।
মাটি দিয়ে কুমোররা নানা ধরনের পাত্র বানিয়ে দিত। যেমন জাড়ি, তেলাবনী ভাণ্ডী। নৌকাতে ভরে সেসব পাত্র এক গঞ্জ থেকে আরেক গঞ্জে যেত। লাল মাটির পাতিল, কালো মাটির কলস মুলিবাঁশের দরমার ভেতর সাজিয়ে রাখা হতো। দিনরাত ভেসে চলত নৌকা।
শুধু খাওয়া-দাওয়া করলেই তো আর চলে না, মনের আনন্দের জন্য গান বাজনা চাই। কত না বাদ্যযন্ত্র। পিনাক, ভরী, ভেউর, কাড়া, কবিলাস, দুমদুমি, ভাঙ্গরি। কত রকমের শব্দ।
প্রাচীনকালের বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিশে আছে ইতিহাসের পথপরিক্রমার নানা যোগসূত্র।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক