রবিবার, ২৭ মে, ২০১২

‘মেগাওয়াট’ সমাচার



এমএ নোমান
বেশ কয়েকদিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ক্যান্টিনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের টেবিলে দুপুরের খাবার খেতে বসেছি। হঠাত্ করেই চলে গেল বিদ্যুত্। জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিদ্যুতের দু’টি লাইন থাকায় দ্বিতীয় লাইন চালু হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। দুর্ভাগ্য ২-৩ মিনিটের মাথায় দ্বিতীয় লাইনটিও চলে গেল। একজন প্রবীণ সাংবাদিক ক্ষোভ আর আক্ষেপের স্বরে একটু জোর গলায় বলে উঠলেন, “গেলি তো গেলি একেবারে ‘মেগাওয়াট’সহ গেলি। আর সময় পেলি না।” মেগাওয়াট গেল আওয়াজ শুনেই ক্যান্টিনজোড়া সাংবাদিকরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছেন। কিছু সময় পর একজন বলে উঠলেন, “কিছুদিন ধরেই শুনে আসছি হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হয়েছে। এসব বিদ্যুত্ গেল কই?” অপর একজন বলে উঠলেন, সরকার আপাতত তিন হাজার ৩০০ মেগাওয়াট উত্পাদন করেছে। ‘মেগাওয়াট’ যেহেতু উত্পাদন হয়ে গেছে এখন ধীরে ধীরে বিদ্যুত্ও উত্পাদন হবে। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। জাতীয় প্রেস ক্লাবের পর আমি ‘মেগাওয়াট’ সংক্রান্ত আলোচনা আরও অনেক জায়গায়ই শুনেছি।
‘বাংলাদেশ নতুন করে তেলের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছে’—এ ঘোষণা দেয়ার জন্য গত ২০ মে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আজকের দিনটি বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। সমুদ্র বিজয়ের সাফল্যের পর এবার আমরা তেলের জগতেও প্রবেশ করছি। আমরা সিলেটের দুটি কূপে তেল...।’ চেয়ারম্যানের বক্তব্যের এ পর্যায়ে সেই একই বিড়ম্বনা। বিদ্যুত্ চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে একজন সাংবাদিক বলে উঠলেন, ‘মেগাওয়াট’ চলে গেল। স্যার আপনারা তেলের জগতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন তো তাই এবার মেগাওয়াট আর থাকতে চাইছে না। সেও চলে গেল।’ সাংবাদিকের এ মন্তব্যের পর চেয়ারম্যানসহ পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা ও উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরাও তেলের আলোচনা বাদ দিয়ে ‘মেগাওয়াট’ সংক্রান্ত সরস আলোচনায় লিপ্ত হলেন। জেনারেটর চালু হওয়া পর্যন্ত ‘মেগাওয়াট’ নিয়ে ওইদিন এক প্রাণবন্ত ও উপভোগ্য আলোচনা হয়। দেশের বর্তমান ‘বিদ্যুতের নাই অবস্থায়’ বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিতরণকারী সংস্থাগুলোর একই মন্তব্য, ‘বর্তমানে যে হারে বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে তা নজিরবিহীন। এর আগে বাংলাদেশে এ ধরনের লোডশেডিং আর হয়নি।’ রাজধানীতে বিজলি চমকানোর মতো বিদ্যুত্ আসা-যাওয়া করলেও পল্লী এলাকার মানুষ ২-৩ দিন পর বিদ্যুতের দেখা পান। বিদ্যুিভত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। ক্ষুব্ধ জনগণ সারা দেশের জেলা ও উপজেলায় বিদ্যুতের দাবিতে সড়ক অবরোধ, বিদ্যুত্ অফিস ভাংচুর, বিদ্যুত্ কর্মকর্তাদের মারধর—এসব এখন নিত্য ঘটনা। তীব্র লোডশেডিং যন্ত্রণায় কাতর জনগণের সঙ্গে ক্ষোভে ফুঁসছেন মহাজোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও। এ নিয়ে জাতীয় সংসদে গত অধিবেশনেও রসাত্মক আলোচনা হয়েছে। সরকারদলীয় এমপি ফজলে রাব্বি স্পিকারের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আজকে আমি গোসল করে আসতে পারিনি। বিদ্যুত্ ছিল না, তাই পাম্প দিয়ে পানি উঠানো সম্ভব হয়নি। মাঝেমধ্যে বাথরুম করে শৌচ কাজ সম্পাদন করার মতোও পানি পাওয়া যায় না।’ অ্যাডভোকেট রাব্বির এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আ’লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমদও বলেছেন, ‘অনেক দিন হলো এলাকায় যাইনি। গেলেই জনগণ জানতে চায়, বিদ্যুত্ গেল কই? জবাব দিতে পারি না।’ গত কয়েক মাস ধরে এমন কোনো সভা-সমাবেশ, সেমিনার, সেম্পোজিয়াম হয়নি যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও তার উপদেষ্টারা বিদ্যুত্ উত্পাদন নিয়ে নিজেদের সাফল্যের কথা তুলে ধরেননি। প্রতিনিয়তই তারা তিন হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের ‘বায়বীয়’ হিসাব দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুতের চলমান সঙ্কটের জন্য বিগত বিএনপি জোটের পাঁচ বছর ও মইন-ফখরুদ্দীনের ‘দানবীয় অসাংবিধানিক’ সরকারের দুই বছরের শাসনকে দায়ী করেন। তবে মইন-ফখরুদ্দীনের দুই বছরে বিদ্যুতের জন্য কিছু না করাটা দোষের নয় বলেই আমার কাছে মনে হয়। কেননা, অসাংবিধানিক ওই সরকারকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ‘আন্দোলনের ফসল’ ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি গত জাতীয় নির্বাচনের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে ১/১১’র সরকারের কর্মকাণ্ডের বৈধতা দেবেন।’ কাজেই বিদ্যুত্ উত্পাদন না করার অপরাধ থেকে মইন-ফখরুদ্দীনের দানবীয় সরকার মাফ পেয়ে গেছে বলা চলে। তবে প্রকৃত তথ্য হচ্ছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুত্ উত্পাদন হয়েছিল ৪ হাজার ১০০ মেগাওয়াট, যা এখন সাড়ে ৪ হাজারে উন্নীত হয়েছে। মেগাওয়াটের হিসাব বোঝার জন্য পিডিবি’র দেয়া এ তথ্যই যথেষ্ট বলে আমার মনে হয়। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বিদ্যুত্ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য ৩৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন, ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা এগিয়ে আনাসহ সরকার অনেক কাজই করেছে। ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা এগিয়ে আনার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তত্কালীন সংস্থাপন সচিব ইকবাল মাহমুদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, এতে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সাশ্রয় হবে। তার এ যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে একজন সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, ঘড়ির কাঁটা ১ ঘণ্টা এগিয়ে আনলে যদি ৩০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় হয় তাহলে কেন ৩ ঘণ্টা এগিয়ে দিয়ে ৯০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় করা হবে না। সেদিন এ প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি।
আমার বাসায় বিদ্যুতের মিটারের রিডিং নিতে আসা ডিপিডিসি’র রিডারকে বললাম, আপনি ‘মেগাওয়াট’ সম্পর্কে কিছু জানেন? মুচকি হেসে জবাব দিলেন, ‘মেগাওয়াট’ নয় আমার কাজ হচ্ছে ‘ইউনিট’ নিয়ে। তবে বিদ্যুত্ গেলেই এখন মানুষ বলছে ‘মেগাওয়াট’ গেল। ফিরলে বলে ‘মেগাওয়াট’ এলো।
লেখক : সাংবাদিক

হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রাহ:) -এর জীবন ও শিক্ষা



 শাহ্ কাওসার মুস্তাফা চিশ্তী আবুলউলায়ী  
আ জ ৬ই রজব ১৪৩৩ হিজরী, সুলতানুল হিন্দ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী আজমেরী (রাহ:)-এর ৮০০ তম উরস মুবারক উদযাপিত হচ্ছে। ৬৩৩ হিজরী ৬ই রজব/১৬ মার্চ ১২৩৬ খ্রী তিনি ভারতের আজমীর শহরে ইন্তেকাল করেন। তিনি যে কতবড় উচ্চমার্গের অলি ছিলেন তার নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল তার ওফাতের ঠিক পর মুহূর্তেই। উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেমে দীন হযরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহ:) তাঁর আখ্বারুল আখিয়ার নামক সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, হযরত খাজা সাহেবের ললাটে তাঁর ইন্তেকালের পর পরই “হাবীবুল্লাহ মাতা ফী হুব্বিল্লাহ”(অর্থাত্ আল্লাহর হাবীব(প্রিয়তম) আল্লাহর প্রেমেই ইহ্ধাম ত্যাগ করেছেন) শীর্ষক বাক্যটি ফুটে ওঠে। তিনি উপমহাদেশে এসেছিলেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামের নায়েব হিসেব। একথা সত্য যে, তার আগমনের বহু আগেই ইসলাম ও মুসলমানদের ভারতবর্ষে আগমন ঘটে এবং অনেক সুফী সাধক ইসলাম প্রচারে নিজেদের নিয়োজিত করেন। কিন্তু হযরত খাজা সাহেবের আগমনে ইসলাম প্রচারে এক বিপ্লব ঘটে এবং তা একটি সামাজিক বিপ্লবেও রূপান্তরিত হয়। তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে বিশেষ করে খ্রিষ্টীয় একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। উঁচু বর্ণের হিন্দু সমাজ তাদের স্ব-ধর্মের নিচু বর্ণের লোকদেরকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখতে থাকেন। সাধারণ মানুষ উচ্চ বর্ণের লোকদের দ্বারা কীভাবে নিগৃহীত হচ্ছিলেন তার বিবরণ আবু রায়হান আল-বিরূনীর কিতাবুল হিন্দ নামক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর খালীক আহ্মাদ নিজামী তার তারীখে মাশায়েখে চিশ্ত নামক গ্রন্থে বিষটির উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন যে, আল্লাহ তাদেরকে মানুষ বানিয়েছিলেন কিন্তু তার বান্দারা তাদেরকে, অর্থাত্ নিচু শ্রেণীর লোকদেরকে জানোয়ারের জীবন যাপনে বাধ্য করছিল। আল-বিরূনী আরো বলেন যে, হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রকট থাকায় এবং মুসলমানদের মধ্যে কোরআনের আয়াত “ইন্না আক্রামাকুম ইন্দাল্লাহি আত্কাকুম” (অর্থাত্ আল্লাহর কাছে সেই সম্মানিত যে আল্লাহকে অধিক ভয় করে) এর মর্মার্থ অনুযায়ী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মানবীয় মর্যাদা সম্পর্কিত সম্পূর্ণ ভিন্নতর দুটি চিন্তাধারা বিরাজমান ছিল।
হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রাহ:) সেই সময় এই সব জাতিভেদ এবং স্পৃশ্য-অস্পৃশ্যতার বেড়াজাল ছিন্ন করে তাওহীদের দর্শন প্রচার করেন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দলে দলে লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া শুরু করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রাহ:) ইরানের সিজিস্তান নামক স্থানে ৫৩৬/৫৩৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম খাজা গিয়াসুদ্দীন হাসান। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন। খাজা সাহেব মাত্র ১৫ বছর বয়সে পিতৃহীন হন। পৈতৃক সূত্রে তিনি একটি ফলের বাগান লাভ করেছিলেন। ইব্রাহিম কান্দুযী নামক একজন মজ্জুব বুযুর্গের সংস্পর্শে এসে তাঁর জীবনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। তিনি তাঁর ফলের বাগান অন্যদের দান করে দুনিয়াত্যাগী একজন সাধক হিসাবে নতুন জীবন শুরু করেন। আল্লাহ্র রাস্তায় সফরকালীন সময় নিশাপুরের নিকটে হারূন বা হারভান নামক স্থানে চিশিতয়া তরীকার প্রখ্যাত শায়খ হযরত খাজা উসমান হারূনী (অনেকের মতে হারভানী) এর সাক্ষাত্ ঘটে এবং তাঁর কাছে  বায়আত  গ্রহণ করেন। আখবারুল আখিয়ার নামক গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী (রাহ:) দীর্ঘ ২০ বছর ধরে আপন পীর ও মুর্শেদের খিদমতে থেকে উচ্চতর আধ্যাত্মিক মর্যাদা লাভ করেন। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, খাজা সাহেবের এই বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল। আফগানিস্তানের অন্তর্গত ঘোর প্রদেশের সাধনকর্তা মঈমুদ্দীন মুহাম্মদ বিন সাম, যিনি শাহাবুদ্দীন মুহাম্মদ ঘোরী নামে সমধিক পরিচিত। স্বপ্নযোগে হযরত খাজা সাহেবের নির্দেশ পেয়ে ভারত আক্রমণ করেন। দিল্লির সন্নিকটে উভয়ের মধ্যে চরম যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে দেড়শত ভারতীয় রাজন্যবর্গ পৃথ্বীরাজের পক্ষ অবলম্বন করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন কিন্তু তাঁদের সকল প্রতিরোধ চূর্ণ করে ঘোরী বিজয়ী হন এবং পৃথ্বীরাজকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করা হয় এবং সুলতানের নির্দেশে তিনি নিহত হন। এভাবে এই মহান সাধকের দোআয় এই অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে জাতি হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশ্তীর দরবারে গরীব, ধনী সবাই সমানভাবে সমাদৃত হতেন। গরীব মিসকিনকে তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন। এই জন্য তাঁর অত্যন্ত বহুল প্রচলিত উপাধি হল গরীবে নেওয়াজ। হযরত গরীবে নেওয়াজ এর রূহানী ফায়েজে এত বিপুল সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, ইতিহাসে আর কোন মনীষীর হাতে এত অধিক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে উল্লেখ নেই। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নেতা খাজা হাসান নিজামী বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ পর্যালোচনা করে তাঁর প্রখ্যাত গ্রন্থ নিজামী বাঁসরীতে উল্লেখ করেন যে, হযরত গরীবে নেওয়াজ এর হাতে প্রায় এক কোটি লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। আর এভাবেই সারা ভারত বর্ষে ইসলামের ব্যাপক প্রচার শুরু হয়। হযরত খাজা সাহেবের পরে তাঁর খলিফাগণ, তাঁদের খলিফাগণ এবং অন্যান্য সূফীয়ে কেরাম ও ধর্ম প্রচারকগণ ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহত রাখেন এবং বিপথগামী মানুষদের সুপথ প্রদর্শন করতে থাকেন। আজ এই উপমহাদেশে, পঞ্চাশ কোটির অধিক মুসলমানের বাস। এর মূল ভিত হযরত গরীবে নেওয়াজ স্থাপন করে গেছেন। তাঁর শিক্ষার মূল বিষয় ছিল আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি প্রেম। তাঁর কাছে খোদা প্রেমই সবচেয়ে বড় শক্তি। যে আল্লাহকে ভালবাসে সে কোন অপশক্তির কাছে মাথা নত করে না। আজ সমাজে যে হিংসা-বিদ্বেষ বিরাজ করছে এর নিরসনে সকলের খাজা গরীবে নেওয়াজের প্রেমের দর্শন থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। আর তিনি শিক্ষা নিয়েছিলেন আল্লাহর হাবীব রাহমাতাল্লীল আল-আমিন হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হে ওয়াসাল্লামের জীবন দর্শন থেকে। নায়েবে নবী সুলতানুল হিন্দ হযরত গরীবে নেওয়াজের ৮০০তম উরসের এই দিনে প্রার্থনা করি এই উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক, সকলে মহান আল্লাহর প্রেমে উজ্জীবিত হয়ে তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে ভালবাসুক।
n লেখকঃ  প্রফেসর, দর্শন বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

‘জেনেশোনে বিষ করেছি পান' এই মধুমাসে


সাজজাদ হোসাইন খান

জ্যৈষ্ঠমাসকে বলা হয় মধুমাস। এ মাসে নানা ধরনের রসালো ফলে সয়লাব হয় হাট-বাজার। এক সময় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো ছুটি ঘোষণা করতো এ মাসে। এই ছুটির নাম ছিল আম-কাঁঠালের ছুটি, গ্রীষ্মের ছুটি নামেও পরিচিতি ছিল। ছাত্র-ছাত্রীগণ গ্রামে ছুটে যেত, ফল-উৎসব করতো। নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি করতো। একটা অন্যরকম অনুভূতি আনন্দে আন্দোলিত করতো বড়-ছোট সবাইকে। এখন আর সে দৃশ্য দেখা যায় না। স্কুল-কলেজগুলোতেও আম-কাঁঠালের ছুটির অস্তিত্ব নাই। থাকলেও তা নামে মাত্র। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ফল-ফলাদির গাছ প্রায় উজাড়। গ্রাম-গঞ্জ বৃক্ষশূন্য হতে চলেছে। প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত হলেও নানা কিসিমের ফল কেবল আম-কাঁঠালই নয় বিভিন্ন নামের রসালো ফল বাজারে আসে। এই ফলের মিষ্টিগন্ধ তখন বাতাসকে উতলা করে, হৃদয়কে করে প্রশান্ত, আর রসনাকে করে তৃপ্ত। জ্যৈষ্ঠমাস এখন উপস্থিত রসালো ফলের ডালি নিয়ে। আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু, তরমুজসহ আরো অনেক ফলই এখন বাজারে। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে অনেকেরই নাগালের বাইরে এসব ফল। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে ফল ভক্ষণ এক প্রকার দুরূহ ব্যাপার। তবু মওসুমী ফলের অপেক্ষায় থাকে শহর-গ্রামের মানুষ।
ফিবছর এই সময়টা আসে আনন্দ-উল্লাসের সাথে। পাশাপাশি আতঙ্ক-আশঙ্কাও ছড়িয়ে পড়ে দেশময়। কারণ এইসব ফলের শতকরা আটানববই ভাগই থাকে বিষ বহনকারী। ফল ভক্ষণের ফলে দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়ায় মানবদেহ জেরবার হয় মারাত্মক সব ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে। পুষ্টির পরিবর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। কোন সময় ফলের পচন রোধে আবার কোন সময় অপুষ্ট ফল পাকানোর জন্য ওষুধ প্রয়োগ করে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী। যে ওষুধ মানবদেহকে মারাত্মক ক্ষতির দিকে ধাবিত করে। শেষাবধি মৃত্যুর কারণ হয়। তাই এই দুষ্টচক্রকে ‘অসাধু' বিশেষণের আওতায় না এনে সরাসরি ‘খুনি' শব্দটি ব্যবহার করা দরকার। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের মতে, ফলে যে পরিমাণ অহিতকর ওষুধ মেশানো হয় তা মানবদেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পুষ্টির পরিবর্তে অপুষ্টির জন্ম দেয়। প্রতি মওসুমে এই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয় পত্র-পত্রিকায়, সভা-সেমিনারে। বছর ঘুরলেই সব ভুলে যায় মানুষ। দ্বিগুণ উৎসাহে খুনি ব্যবসায়ীরা কার্বাইড-ফর্মালিন ইস্তেমাল শুরু করে। যদিও অভিযান জরিমানার মহড়াও সরকারের বিশেষ বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে করা হয়। এসব অভিযানে তেমন কোন ইতিবাচক লক্ষণ বাজারে পড়তে দেখা যায় না। বিষ মেশানো ফলে বাজার ভরা থাকে। বেচা-বিক্রিও মন্দ হয় না। প্রতি মওসুমেই সরকারের এই বিভাগটি তাদের জনসংখ্যার স্বল্পতা এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার অজুহাত প্রকাশ করে। এই অজুহাত আর কতকাল চলবে? কুমিরের এক ছানাকে সাতবার দেখানোর মতো হয়েছে এদের। প্রশ্ন রাখলেই তারা একটি শব্দই উচ্চারণ করে ‘অল্প-স্বল্প' ইত্যাদি। তবে দেশবাসীর ধারণা, কথিত স্বল্পতার পশ্চাতে অন্য কোন বৃহৎ কারণ লুকিয়ে থাকা বিচিত্র নয়। যেমন ফুটপাত পরিষ্কার হয় না আইনশৃক্মখলা বাহিনীর সাথে ফুটপাত ব্যবসায়ীদের বামহাতের কায়কারবারের কারণে। এটি যেভাবে ওপেন সিক্রেটের তালিকায় উঠে গেছে ঠিক তেমনি এই বিভাগটিরও সিক্রেটের ফুল ফুটতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। এত জরিমানা-সাবধান বাণী শুনানোর পরও প্রতি মওসুমে একই দৃশ্য কেন দেখছে মানুষ। বিষেভরা লোভনীয় ফলে বাজার সয়লাব হবে কেন? খুনি তেজারতরা চাঙ্গা হয় কোন সাহসে!
আপাতকারণ গুরুপাপে লঘুদন্ড। খুনির ফাঁসির বদলে যদি সাতদিনের হাজতবাস হয় তাহলেতো খুনির পোয়াবারো হবেই। হাজতবাস শেষ করে বিপুল উৎসাহে দ্বিতীয় খুনের আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। এমনটাই অপরাধীর দস্তুর। ফল ফসলে যারা বিষ মিশায় অধিক লাভের আশায়, কঠিন শাস্তির পরিবর্তে জরিমানা-টরিমানায় এদেরকে নিবৃত করা সম্ভব হবে না। কারণ অর্থলোভ একটি দুরারোগ্য ব্যাধির নাম। এই জাতীয় ব্যাধি উপশমে প্রয়োজন উচ্চতর চিকিৎসা, উচ্চতর চিকিৎসক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশে এ দু'টিরই অভাব প্রকট।
ফল-ফলাদিতে বিষ, আনাজ-পাতিতে বিষ, বিশেষ করে খাবার জিনিসে বিষ প্রয়োগের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাবার-দাবার এবং ফল-ফসলে নির্দিষ্ট মেয়াদে সংরক্ষণের জন্য প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের একটা রীতি রয়েছে। তাও সহনীয় পরিমাণে, যা মানবদেহ ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। কিন্তু বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম। প্রিজারভেটিভের নামে এখানে সরাসরি বিষজাতীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। আনাজ-পাতিতেও একেবারেই অনাহূতভাবে ফর্মালিন-কার্বাইড জাতীয় ওষুধ স্প্রে করছে। মাছে ফর্মালিন মেশানো তো বর্তমানে স্বাভাবিক রীতি হিসাবেই উঠে আসছে। অপুষ্ট ফল পাকানোর জন্য ব্যবহার করে কার্বাইড। এসব ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ বিষয়টিকে জটিল করে তুলছে। চিকিৎসকরা বলছেন, ফলে বিষ মানব দেহে ক্যান্সারের মতো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে কেবলমাত্র বিষাক্ত ফল ভক্ষণের কারণে।
এরই মধ্যে মওসুমী ফল আম নামতে শুরু করেছে। ফলের দোকানগুলোতে সাজানো আছে পাকা আম। আসলেই কি এগুলো পাকা? পরীক্ষা করলে দেখা যাচ্ছে, অপুষ্ট আম কার্বাইড প্রয়োগ করে পাকানো হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএসটিআই লোকজন বিভিন্ন আড়তে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ কার্বাইড যুক্ত আম ধ্বংস করেছে। ফি-বছরই তারা এ কাজটি করে থাকেন। তারা নিজেরাই ঘোষণা করেন তাদের লোকবল এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে অভিযান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই সুযোগে খুনি-ব্যবসায়ীরা মুনাফা গুণে। বিপরীতে বিষভরা আম খেয়ে ক্রেতা সাধারণ অসুস্থ হয়।
এই অপরাধের দন্ড যে পরিমাণ তা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়। পাঁচ-দশ হাজার বা লাখ টাকা জরিমানা অপরাধের তুলনায় এটি কোন শাস্তিই নয়। এই জরিমানার অর্থ তারা তুলে নিচ্ছে অন্য কোন চালান থেকে। যে জন্যে এই অপরাধের মাত্রা কমার বদলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্যদ্রব্যে যারা বিষ মিশায় তারা আসলে জীবননাশের অপরাধে অপরাধী। খুনের বদলে খুন। এদের অবশ্যই মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা উচিত। নিদেন পক্ষে যাবজ্জীবন কারাদন্ড। সেখানে ৫/১০ হাজার টাকা জরিমানা হাস্যকর বলেই মনে হয়। সভ্যদেশে খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মারাত্মক অপরাধ বলেই বিবেচিত হয়। প্রয়োজনবোধে আইনের সংশোধন দরকার। আইন কঠোর না হলে, শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি না পেলে খুনি-ব্যবসায়ীগণকে নিবৃত করা হবে অসম্ভব। তাছাড়া একটি-দুটি আড়ৎ এবং ৫-১০ মণ আম ধ্বংস করে শুদ্ধি অভিযানের শুদ্ধতার ফল পাওয়া যাবে না। কেবল পাইকারী দোকানদার নয়, খুচরা দোকানগুলোতেও হানা দিতে হবে। ঘোষণা দিতে হবে যার কাছেই বিষ মাখানো ফল পাওয়া যাবে, তারই জেল-জরিমানা। যেমন নকল নোটের ব্যাপারে ঘোষণা আছে। তাছাড়া যারা অভিযানের হর্তাকর্তা তাদের সাধুতা এবং স্বচ্ছতা অপরাধীদের দ্বিতীয়বার অপরাধে অগ্রসর হতে একশ'বার ভাবনায় ফেলবে। এমন ঘোষণা এবং কার্যক্রম যতসত্বর আসবে ততই মঙ্গল দেশ এবং জনগণের জন্যে।
কার্বাইড-ফরমালিন পুষ্ট ফলে বাজার সয়লাব হবার আরও একটি বড় কারণ হলো ক্রেতাসাধারণের নির্বুদ্ধিতা এবং অসচতেনতা। ফলে বিষ এ তথ্যটি বোধ হয় কারো অজানা থাকার কথা নয়। যেভাবে এ খবরটি পত্র-পত্রিকায় চাউর হয় তাতে করে তো বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরেই পৌঁছে যায়। এরপরও এক শ্রেণীর মানুষ মওসুমের প্রথম ফলটির আস্বাদ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই ব্যস্ততায় খুনি ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পায়।  জেনে-শোনে যদি কেউ বিষ পান করে তাকে নিবৃত করা কষ্টকর তো বটেই। যে জন্যে বিষ মাখানো ফল বাজার পায়। মওসুমের প্রথম ফলটি খেতে হবে। অবশ্যই খাব, যদি তা পুষ্ট এবং স্বাস্থ্যকর হয়। কিন্তু প্রায়শই দেখা যায়, বাজার থেকে যে ফলটি কেনা হচ্ছে এর ৯৮ ভাগই ভেজাল, শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তারপরও কেউ কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ে দোকানে। এ ধরনের বেবুঝ ক্রেতার কারণেও অসাধু বা খুনি-ব্যবসায়ী যে নামেই ডাকা হয়, যাদের দৌরাত্ম্য কমছে না। ক্রেতাদেরও দায়িত্ব আছে। নিজের বুঝতো পাগলেও বুঝে। আমরা কি পাগলের চেয়েও অধম হয়ে গেলাম?

যে দেশে শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড



অ জ য়  দা শ গু প্ত
আমার সন্তানটি এবার ম্যাকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করল। অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ে আসার সময় ওর বয়স ছিল আট। পড়ত দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তৃতীয় শ্রেণী না হয়ে এক লাফে চতুর্থ শ্রেণী থেকে তার শিক্ষাজীবনের শুরু। সে এক কাহিনী বটে। বঙ্গদেশ থেকে দু’ক্লাস উত্তীর্ণ শিশুর তো তৃতীয় ক্লাসেই যাওয়ার কথা। তা ছাড়া আমাদের ইংরেজি জ্ঞান বা পড়াশোনার পদ্ধতিও এদের চেয়ে অগ্রসর। ধারণা ছিল তাকে পুনর্বার দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেই শুরু করতে হবে। হল উল্টো, কেন এই ব্যতিক্রম? তখন কি আর জানতাম, এ দেশে শিক্ষাও নিয়মের অধীনে, সুশৃঙ্খল আর সবার জন্য সাম্য মেনে চলে। জুনের আগে জন্মালে যে ক্লাসে, জুনের পরে জন্মালে তার পরের ক্লাসে পড়তে হবে এটাই নিয়ম। যেহেতু তার জন্ম মে মাসে, তাকে জোর করেই চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি করানো হল। এই নিয়মের কারণে আমাদের দেশের মতো জন্মদিন, মাস বা বয়স নিয়ে বিশৃঙ্খলা নেই, নেই কোনো ঝুট-ঝামেলা। সবার জন্য এক নিয়ম, আর এই নিয়মের সূতিকাগার হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রতিটি মানবশিশুর জন্মতারিখ, সময় আর জন্মের বৃত্তান্ত সেখানে রেজিস্টার্ড, সে দেশে এ জাতীয় বিধি মেনে চলার সমস্যা হওয়ার কারণ নেই। বলছিলাম প্রাথমিক শিক্ষার কথা। ছেলে তো চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে পড়ল ঘোর বিপদে, ভয়ে স্কুলেই যেতে চায় না। একদিন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিশাল বৃক্ষটিকে পরম মমতায় জড়িয়ে সে কী কাঁদা। অস্বাভাবিক কিছু নয়, একদিকে সহপাঠীদের ভাষা না বোঝার কারণে বোবার মতো থাকা, অন্যদিকে উঁচু ক্লাস। আমরা পড়লাম অগাধ সমুদ্রে। কী করে পার হব এই সঙ্কটসমুদ্র? একটাই সন্তান আমাদের, আর তার ভবিষ্যত্ ভেবেই তো অভিবাসনের নামে দেশান্তরী হওয়া। কী আশ্চর্য! আমাদের চেয়েও বিচলিত হয়ে উঠল স্কুল। স্কুলের রাশভারী ডেপুুটি প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠালেন আমাকে। ভাবলাম কপালে নির্ঘাত ভোগান্তি আছে। গালমন্দ দিয়ে হয়তো ছেলেটিকে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে, ‘অনেক হয়েছে বাপু, এবার নিয়ে যাও।’ গিয়ে দেখি অন্য কাণ্ড। ভদ্রলোকই উল্টো আমাকে সরি সরি বলে ক্ষমা চেয়ে অস্থির। এক মাস হয়ে যাচ্ছে তবু তারা তাকে ধাতস্থ করতে পারছে না বা সে ধাতস্থ হচ্ছে না, এ যেন তারই দায়। অবাক করে দিয়ে বললেন, ওই হপ্তা থেকে তার জন্য অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা হয়েছে। আমি তো প্রমাদ গুনতে শুরু করলাম, সবেমাত্র চাকরিতে ঢুকেছি, গিন্নি তখনও শিক্ষানবিশ, এ সময় অতিরিক্ত শিক্ষা ও শিক্ষকের জন্য ডলার জোগাড় করব কীভাবে? ডেপুটি প্রিন্সিপালই জানালেন এসব ক্লাস বা ওর শিক্ষার জন্য তারা যেসব ব্যবস্থা নিচ্ছেন সবই ফ্রি। উল্টো আমাকেই চয়েস দিলেন, ভালো না লাগলে বা উন্নতি না দেখলে যেন যোগাযোগ করি। সে বিস্ময় আমার আজও কাটেনি। প্রাথমিক শিক্ষার সূচনাপর্বে কাঁচুমাচু সন্তানটি এখন এ দেশের মূলধারায় নাটক করে, ইংরেজি পড়ায়। তার যাবতীয় কৃতকার্যতার পেছনে আছে শৈশবের ওই স্কুলিং, আর সুযোগ যারা দিয়েছিলেন সেসব শিক্ষক এ দেশের অন্যতম সম্মানিত ও প্রতিষ্ঠিত নাগরিক। এ দেশে বা যেকোনো উন্নত দেশে স্কুলের শিক্ষকতা পাওয়া বা শিক্ষক হতে পারাটা পরম গৌরবের। শুধু সামাজিক মর্যাদা বা জ্ঞানের কারণে নয়, এদের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও আকর্ষণীয়। উঁচু বেতনে প্রাচুর্য আর সচ্ছলতার ভেতর থাকেন বলেই উজাড় করে শিক্ষা ও শিক্ষার্থীকে সময় দেন তারা। বলাবাহুল্য এ দায়িত্বের পুরোভাগে আছে সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা।
এ তো গেল সিডনি তথা অস্ট্রেলিয়ার কথা। আমাদের উপমহাদেশের অপেক্ষাকৃত অগ্রসর দেশগুলোর কথাই ভাবুন। এশিয়ার উন্নত দেশ ও সমাজেও শিক্ষকরা আছেন বহাল তবিয়তে। যে দেশের অর্থনীতি যেমন বা জীবনের মান যেমন তেমনি ধারায়ও তার অধীনে সমাজের শীর্ষে আছেন শিক্ষককুল। প্রাথমিক শিক্ষা বিশেষত স্কুলের প্রথম পাঠ, যেখানে জীবনের বীজ বোনার কাজ শুরু হয়, সেই বীজতলার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখে সমাজ ও সমাজপতিরা। আমাদের দেশেও সে ধারা চালু ছিল। প্লেইন লিভিং আর হাই থিংকিংয়ের স্বর্ণযুগে শিক্ষকরাই ছিলেন আদর্শ। রোল মডেল বলে পরিচিত শিক্ষকদের ভেতর প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকরাই ছিলেন অধিক আদৃত। সাইকেল চালিয়ে মাইলের পর মাইল ছুটে শিক্ষা ও জ্ঞান বিতরণ করতেন তারা। অতি সস্তা দামের পাঞ্জাবি-পায়জামা বা সাধারণ পোশাকের এসব শিক্ষককে দেখে রক্তচক্ষু চেয়ারম্যান, এমপি বা পাড়ার গুণ্ডারাও ভড়কে যেত। আদাব-সালাম পায়ে ধরে দোয়া-আশীর্বাদ চাওয়াটা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। পাড়া-মহল্লা বা গ্রামগঞ্জে যে কোনো আপদ-বিপদ বা সালিশ-বিচারে এরাই ছিলেন নিয়ামক। কালক্রমে কালো টাকা, সন্ত্রাস আর দুর্নীতির চাপে অন্য ধরনের মানুষ ‘হঠাত্ বড়লোক’ হয়ে ওঠা বাঙালিরাই সব কিছু গ্রাস করে নিল। মাতব্বর আর সমাজপতিদের দৌরাত্ম্যে একঘরে হতে হতে শিক্ষকরা আজ পরাজিত ও পর্যুদস্ত। প্রাইমারি শিক্ষকের হাল যে কোথায় নেমেছে সাম্প্রতিক ঘটনাবলিই তার বড় উদাহরণ। রাষ্ট্র কোথায় পাশে এসে দাঁড়াবে, কোথায় তাকে আশ্রয় দেবে, বড় বা উজ্জ্ব্বল করে তুলবে, তার পরিবর্তে রাস্তায় নেমে এসেছে প্রতিপক্ষ হয়ে। সে প্রতিপক্ষ বা শত্রুতা আজ এতই প্রকট, জাতির কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে শিক্ষার লাশ। আমি ভাবি এমন ঘটনা বা এর সিকিভাগও যদি এসব দেশে ঘটত, তোলপাড় হয়ে যেত সবকিছু। সরকারের গদি তো নড়তই, রাষ্ট্রও বিচলিত হয়ে উঠত। ধন্য আমাদের সমাজ, ধন্য বঙ্গদেশ, এই ভারি লাশের বোঝাও তাকে কম্পিত বা নতজানু করতে পারল না। শিক্ষা তবে কোন দেশের কোন জাতির মেরুদণ্ড? আমাদের না উন্নত দেশগুলোর?
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক
dasguptajoye.hotmail.com

শনিবার, ২৬ মে, ২০১২

রূপলাল হাউসের সাতকাহন


পাশা শাহ
আপনারা অনেকেই আহসান মঞ্জিল এক নামে চেনেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না পুরান ঢাকায় রূপলাল হাউস নামে একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে। শুনে অবাক হতে হয় যে রূপলাল হাউসে বসবাসকারী অনেক বাসিন্দাই জানে না যে তাদের বসবাসকৃত ভবনটির নাম রূপলাল হাউস। পুরান ঢাকায় বহুবার গিয়েছি কিন্তু কোনোদিন সেখানে যাওয়া হয়নি। সেদিন শ্যামবাজারে ঢুকে খুঁজতে শুরু করলাম রূপলাল হাউস। কেউ চেনে না। শেষে একজনকে অনেক কথার পর জানতে চাইলাম আশপাশে কোনো পুরনো বাড়ি আছে কি-না। তবেই একজন দেখিয়ে দিল। কিন্তু এটা রূপলাল হাউস নামে কেউ চেনে না। অবশেষে অনেক অনুসন্ধান শেষে নিশ্চিত হলাম এই বাড়িটিই রূপলাল হাউস।
একটু পেছনে ফেরা যাক। ইতিহাসটা ফরাশগঞ্জের। ১৭৩০ সালে ফরাসিরা এ দেশে আসে ব্যবসার উদ্দেশ্যে। বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত একটি বাড়ি শেখ মতিউল্লাহর কাছ থেকে ফরাসিরা কিনে তাতে তাদের কুঠি তৈরি করে, যা বর্তমানে আহসান মঞ্জিল নামে পরিচিত। নায়িব আজিম এবং নওয়াজিশ আলী খানের অনুমতিক্রমে ফরাসিরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাজার তৈরি করে নাম দেয় 'ফ্রেন্সগঞ্জ', যা পরবর্তীকালে বর্তমানে 'ফরাশগঞ্জ' নামে পরিচিত। তাদের ব্যবসা লাভজনক না হওয়ার ফলে ১৭৮৪ সালে তারা চলে যান। এরপর আরমেনিয়ান জমিদাররা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে এলাকাটি লিজ নেন। ১৮৩৫ সালে নবাব আলিমুল্লাহ খান আহসান মঞ্জিলকে পুনরায় কিনে নেন। তারও আগে ১৮২৫ সালে আরমেনিয়ান জমিদার আরাতুন আহসান মঞ্জিলের সামান্য দূরে বুড়িগঙ্গার কোল ঘেঁষে (বর্তমান ১৫নং ফরাশগঞ্জ) একটি প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেন। ১৮৩৫ সালে রূপলাল দাস এবং তার ভাই রঘুনাথ দাস বাড়িটি কিনে নেন। এরপর থেকে বাড়ির নাম হয় রূপলাল হাউস।
রূপলাল দাস ছিলেন একজন জমিদার তথা ব্যবসায়ী। তিনি ছিলেন তার পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি। তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন এবং সে সময় স্কলারশিপ পেয়েছিলেন ১০ টাকা। যত দূর জানা যায়, তিনি একজন সঙ্গীত অনুরাগী ছিলেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার যত না অংশগ্রহণ থাকত তার চেয়ে বেশি খরচ করতেন সঙ্গীতের পেছনে। সে সময় রূপলাল হাউসে নিয়মিত সঙ্গীতের আসর হতো। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, ওস্তাদ ওয়ালী উল্লাহ খান এবং লক্ষ্মীদেবীসহ আরও অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ রূপলাল হাউসে সঙ্গীত আসরে নিয়মিত আসতেন। ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন ঢাকায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। তাদের সম্মানে নাচ-গানের আসর কোথায় হবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয় আহসান মঞ্জিল এবং রূপলাল হাউসের মধ্যে। এতে অনেক বেশি ভোটে বিজয়ী হয় রূপলাল হাউস। সে সময় ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ে রূপলাল হাউসের আধুনিকীকরণ করা হয়। শ্রুত আছে যে, সে সময়কার বিদেশিরা ঢাকায় এলে রূপলাল হাউসে ভাড়া করে থাকতেন। সে যুগে রুমপ্রতি ভাড়া প্রদান করতেন ২০০ টাকা। শ্যামবাজারের পুরো ইতিহাস এই দাস পরিবারকে ঘিরেই।
১৮৯৭ সালে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বাড়িটি অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর প্রায় পঞ্চাশ বছর বাড়িটির অনেক অংশ প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। রূপলাল হাউসের একপাশে সুন্দর বাগান ছিল, যা 'রঘুবাবুর বাগান' এবং একপাশে একটি পুল ছিল যা শ্যামবাজার পুল নামে পরিচিত ছিল। কালের বিবর্তনে অযত্নে-অবহেলায় এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এরপর নদীকে ঘিরে বাজার গড়ে ওঠে, যার নামকরণ করা হয় শ্যামবাজার। বাড়ির ভেতরের অংশে ইউরোপিয়ান অফিসার এবং ব্যবসায়ীরা থাকার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালের দিকে নদীর অংশটি ব্যবসা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ফলে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠলে তারাও জায়গাটি ত্যাগ করেন।
রূপলাল হাউসের সর্বশেষ মালিক রূপলালের পৌত্র যোগেন্দ্র দাস এবং তারকনাথ দাস। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের পর দাস পরিবার সপরিবারে ভারতে পারি জমায়। শেষ হয় রূপলাল হাউসের এক পর্বের ইতিহাস।
এখানেই শেষ নয়। ১৯৪৮ সালে বাড়িটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সিদ্দিক জামাল নামে একজন দাবি করেন, তিনি দাস পরিবার থেকে ১৯৭১ সালে রঘুনাথের অংশটি কিনে নিয়েছেন। সে সুবাদে তিনি দ্বিতীয়তলায় বসবাস শুরু করেন। তারই সূত্র ধরে সিদ্দিক জামালের মৃত্যুর পর তার ছেলে দাউদ জামাল ১৯৭৩ সালে ভারতে চলে যান, এরপর নূরজাহান ও তার স্বামী দাবি করেন, এই অংশটি তাদের এবং তারা বর্তমানে দখলে আছেন। তারা এখানে গত তিরিশ বছর ধরে বসবাস করছেন। রূপলাল দাসের অংশটিতে প্রিন্স করিম আগা খান প্রিপারেটরি স্কুল চালু হয় ১৯৫৮ সালে। ১৯৭৩ সালে তা কলেজে উন্নীত করলে মাত্র ১৬ দিনের মাথায় তা গুটিয়ে ফেলা হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সরকার রক্ষীবাহিনীর জন্য বাড়িটি রিকুইজিশন করা হয়। রক্ষীবাহিনীর বিলুপ্তির পর ১৯৭৬ সালে রূপলাল হাউসকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করলে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
দেখতে কেমন ছিল রূপলাল হাউস। তখনকার যুগের অত্যন্ত ব্যয়বহুল নির্মাণ রূপলাল হাউস। ইংরেজি 'ই' আকৃতির বাড়িটি যোগাযোগের সুবিধার্থে বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মাণ করা হয়। বাড়ির সামনে থেকে দুটি সিঁড়িঘাট একেবারে নদীর জল নাগাদ নেমে গেছে। রূপলাল হাউসের ডিজাইন করে কলকাতার মার্টিন কোম্পানি। ইউরোপিয়ান নির্মাণ কৌশলে নির্মিত বাড়ির দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ১৪৪ মিটার। প্রস্থ এক হাজার ৮৩০ মিটার। দ্বিতল বাড়িটির দুটি বল্গকে বিভিন্ন সাইজের ৫০টি কক্ষ আছে। ঠিক মাঝখানে কাঠের নৃত্যমঞ্চ। স্থাপত্য নকশায় যথেষ্ট বৈচিত্র্য এবং কারুকাজ বিদ্যমান। সমতল ছাদে তিনটি চিলেকোঠা আছে।
এ তো গেল ইতিহাসের কথা। বর্তমানে কেমন আছে রূপলাল হাউস। কাগজে-কলম আর বাস্তবতায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অতীতের সেসব কথা আজ শুধুই স্মৃতি। রূপলাল হাউস তার রূপ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই আর এখন অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। স্থানে স্থানে ভেঙে পড়েছে, মেরামতের কোনো উদ্যোগ নেই। ছাদে, কার্নিশে এবং অন্যান্য স্থানে বটগাছ গজিয়েছে। কিন্তু বসবাসকারীরা নির্বিঘ্নে বসবাস করে যাচ্ছেন। চারদিকে অসংখ্য দোকানপাটসহ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। ফলে মূল ভবনকে খুঁজে পাওয়া বেশ দুষ্কর। নদীতে গিয়ে ছবির সঙ্গে বাড়িটিকে মেলানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু সামনের দোকানের জন্য মূল নকশা বিলীন হয়ে গেছে অনেক আগেই। তবে সেই সিঁড়িঘাট দুটি এখনও আছে।
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে পোস্তগোলার ১২৪৩নং খুঁটির কিছু বিজিবি সদস্য তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। তাদের কোনো ভাড়া দিতে হয় না। এ ছাড়া ভবনের বেশ কিছু কক্ষ বিভিন্ন ব্যবসায়ী মন্ত্রণালয় থেকে লিজ নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং তারা নিয়মিত ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধ করছেন।
আসলে কী হচ্ছে তা আমরা অনেকেই জানি না। বসবাসকারী অনেক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, এই বাড়ির নাম রূপলাল হাউস এটা অনেকেই জানেন না। অন্যদিকে বাড়ির বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন মালিকের নামে (জামাল হাউস, আনোয়ারা হাউস ইত্যাদি) সাইনবোর্ড লাগানো আছে। তাদের প্রত্যেকেরই দাবি, এই অংশটি তাদের। এ বিষয়ে তারা আইনি লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছেন। নিচতলার পুরোটাই ব্যবসায়ীদের দখলে। এখানে প্রতিদিন বসে পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ কাঁচা সবজির আড়ত। যার বড় অংশটাই রূপলাল হাউসের নিচতলায়।
সবশেষে বলতে হয় আহসান মঞ্জিলের মতো রূপলাল হাউসও ঢাকার একটি ঐতিহ্য। রূপলাল হাউসের যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। প্রয়োজন মেরামতের। অনাকাঙ্ক্ষিত স্থাপনাগুলো ভেঙে দিয়ে মূল বাড়িটি পুনরায় মেরামত করলেই ফিরে পাবে রূপলাল হাউসের পুরনো সেই রূপ।

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১২

জাতীয় কবির জন্মদিনে

জাতীয় কবির জন্মদিনে



॥ মুস্তাফা জামান আব্বাসী ॥

আগামীকাল একটি বিশেষ দিন। জাতির জন্য গৌরবের, আনন্দের, পেছনে ফিরে তাকানোর। কবি নজরুল ১১৩ বছর আগে এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন, জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন নতুন দিগন্ত অভিসারী সাহিত্য, সঙ্গীতের ভুবনে প্রথম জাগরণী কণ্ঠ, জাতিকে যা দিয়েছে প্রেরণা নতুনভাবে বেঁচে থাকার। তার জীবন ছিল না কুসুমাস্তীর্ণ। মাত্র ১০টি বছর ছিল তার দেয়ার মুহূর্ত, দীর্ঘ ৩৪ বছর নির্বাক। বাংলাদেশ জাতি হিসেবে নজরুলের সাহিত্য-সঙ্গীত সাধনার পরিপূর্ণ ফসল।
আগামীকাল সকাল থেকে নানা অনুষ্ঠানে কবিকে স্মরণ করা হবে, এ দিনটিই তার জন্য বরাদ্দ, আর কোনো দিন নয়; ঠিক যেমন ঈদে মিলাদুন্নবীর দিন নবীকে স্মরণ করি, মাঝে মাঝে মিলাদে। প্রতিদিনই নবীকে স্মরণ করা, রোজই কুরআন শরীফ স্পর্শ করা; তা না হলে ওই একটি দিনে কিছুই হবে না। নবীই আমাদের আদর্শ, আর কেউ নয়। তেমনি জাতীয় কবির স্মরণ হবে প্রতিদিন, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র সর্বত্র।
রবীন্দ্র-নজরুলের স্মৃতিতর্পণ ব্যবস্থার দাবিদার প্রেসিডেন্ট এরশাদ। বন্ধু ড. এনামুল হক রাষ্ট্রীয়ভাবে কবি রবীন্দ্র ও নজরুলের কাছে আছেন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি। একবার এক হোমরাচোমরা ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলামÑ কই ভাই, এতগুলো অনুষ্ঠান হয়ে গেল, কোনো দিন স্টেজে উঠতে পারলাম না। কারণটা কী? উনি বললেন ফিসফিস করে, অনুষ্ঠান রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলকে খুশি করার জন্য কে বলল? বরং যিনি সবচেয়ে বড় অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট এরশাদ, তাকে খুশি করার জন্যই আমাদের যাবতীয় প্রয়াস। সামনাসামনি আপনাকে পছন্দ করলেও তার মনে সদা দ্বন্দ্ব। আপনি বিরাট ব্যক্তিত্ব আব্বাসউদ্দিনের ছেলে, খানিকটা হিংসা কাজ করেছে হয়তো। এখনো সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
আগামীকাল প্রধানমন্ত্রী বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন, যেটি অনেক লোক টেলিভিশনে প্রত্যক্ষ করবে। আমি গানের ঘরে নিভৃতে গাইব যে গানটি : ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি’। জিজ্ঞেস করবেনÑ কেন? বলব, আগামীকালের দিনটির পরই নজরুলকে আর কেউ মনে করবে না। তিনি এক দিনের কবি, প্রতিদিনের নন; তাই তার প্রতি এত অবজ্ঞা। ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলে জেনেছি তিনি ভালোবাসেন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে সমভাবে, বরং নজরুলকে একটু বেশি। কারণ উনি নাত ও হামদ লিখেছেন শ-চারেক।
একবার ত্রিশালের জাতীয় কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার আমন্ত্রণ পাই। আনন্দে উৎফুল্ল আমি। পরে ভিসি সাহেব জানালেন, আপনার বক্তব্য আমরা খুবই মূল্য দিই, কিন্তু এটি হতে হবে আমাদের বক্তব্য। প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে চাই, নজরুলকে নয়। বুঝুন ঠেলা। ওই অনুষ্ঠানে যাইনি, বরং দুই বছর ধরে কোথাও বাইরে না গিয়ে লিখেছি নজরুলের জীবনভিত্তিক উপন্যাস ‘পুড়িব একাকী’ ও ‘নজরুল-আব্বাসউদ্দিন স্মৃতিময় অ্যালবাম’।
জীবনের গল্পটি তুলে এনেছি, রঙ চড়াইনি। প্রজাপ্রতির পাখা রেঙে উঠেছে মাঝে মাঝে। ফিকশন, ইতিহাস নয়। গল্প আমাদের প্রিয় কবির। বিদ্রোহ ও সুন্দরের কারণে হিন্দুরা অনুভব করছেন, মুসলমানেরা আঁকড়ে ধরতে চাইছেন তাদের একমাত্র নকিব, কমরেডরা খুঁজেছেন বঞ্চিতের জয়গান উদ্গাতাকে। মাত্র ১০টি বছর সময় পান কবি তার জীবন মেলে ধরার। সাম্প্রদায়িক মিলনের স্বপ্ন ছিল তার। চুরমার করে দিতে ছুটে আসে মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা। প্রতিকূল সময়ের ঝড়ে পাল তোলে হিংসা-অপবাদের ছুরি, অপমান। বিত কবিমনকে ধীরসন্তর্পণে গ্রাস করে দারিদ্র্য, আঘাত, ব্যাধি।
সম্প্রদায়ের সমঝোতা না হতেই দেশ ভাগ। উপন্যাসের ময়ূরপঙ্খী কখনো চলে দুলকি চালে বাতাসের আবর্তে, কখনো ফিকশনের রস্রোতে; স্বগত উচ্চারণে, কবিতায়, গানে, ভাষণে। বাঙালি হিন্দু ও মুসলিম মানসের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যে কবি, প্রবাহিত তিনি নিজ দুঃখনদীতে। কেউ নিতে পারেননি সে দুঃখভার। ময়লা কথা ময়লা বাক্সে। শেষের দিনে ঘাড়ে মাথায় নিয়েছেন আঘাত। পিতৃবন্ধু কে. মল্লিকের কথন সত্যি বলে গ্রহণ করেছি। বেশ কিছু দিন থেকেই তিনি অসুস্থ, আর ওই দিন থেকে তার অসুস্থতা বেড়েই চলে, চিকিৎসা হয় বহু দিন ধরে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন নির্বাক। আপনার মনে পুড়েছেন একাকী গন্ধবিধুর ধূপ। এরপর আর গল্প নেই।
সবার আগ্রহ অন্তর্গত মানুষটির গল্পে, কবিপ্রাণে। সমসাময়িকদের স্মৃতিবাসরে সযতনে কুড়িয়েছি সংলাপ। পথ গিয়েছে বেঁকে, দুই ধারের তৃণলতাও কথা বলে উঠেছে। ইথারে ভেসে বেড়ায় স্বগত সংলাপ। কথা ছিল তার গানের ভাষণের আড়াল। কেউ খুঁজবেন স্থান-কাল-পাত্র। শুধু মূল সুর খোঁজার চেষ্টা করেছি। 
পুস্তকে অভিনব সংযোজন। পরিশিষ্ট ১ : সাহিত্যবাসর, পাঠক খুঁজে পাবেন কবিকে তার নিজ পরিমণ্ডলে। পরিশিষ্ট ২ : গান ও কবিতার আসরে কবির প্রিয়জন। পরিশিষ্ট ৩ : ১৯৪২ থেকে ২০১১ পর্যন্ত নজরুলকে সামনে নিয়ে এসেছেন যারা। পরিশিষ্ট ৪ : নজরুল ঘনিষ্ঠজনের নির্ঘণ্ট। যারা নজরুলকে জীবন্ত রেখেছেন এতগুলো বছর তার সজ্ঞান অবস্থায় ও অদ্যাবধি তাদের অবদান নিশ্চয়ই স্বীকার করতে হবে। এই নির্ঘণ্ট হালনাগাদ করতে সবার সহায়তা প্রার্থনা করছি।
পিতা আব্বাসউদ্দিন বলেছিলেন : আমাকে ভালোবাস জানি, আমার চেয়েও ভালোবেস নজরুলকে, নজরুলের চেয়েও বেশি রসুলকে। চেষ্টা করে গেছি। নজরুলের ভালোবাসার মানুষ অনেক, তার মাঝে দেখতে পাই যিনি সর্বাধিক অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তাঁকে, আমাদের রসুল। নজরুলের সাথে ছিল যাদের ওঠাবসা, কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। পিতা ছাড়াও : আসাদুদ্দৌলা শিরাজী, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন, সুফি জুলফিকার হায়দার, ইব্রাহিম খান, এস ওয়াজেদ আলী, মাহবুবুল আলম, গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, কমল দাসগুপ্ত [কামাল আহমেদ], ইজাবউদ্দিন আহমেদ, আবুল হোসেন, ওস্তাদ মুহাম্মদ হোসেন খসরু, মাস্তান গামা প্রমুখ। ফিকশনে ওঁরা স্থান করে নিয়েছেন।
ছোট জীবন, ব্যাপ্তি বিশাল, প্রয়োজন হাজার পৃষ্ঠার। কাতিব অশ্রুরুদ্ধ, লিখেছেন অল্পই। তার কেউ নই আমি, তবু উত্তরাধিকারীদের একজন। লক্ষ অনাত্মীয় পাঠক পড়বেন ঘনিষ্ঠতম কবির কাহিনী। প্রজন্মের অশ্রুভরা চোখে নামাবে বিষাদের বৃষ্টি, যা আমার ইচ্ছা ছিল না। একাকী পুড়েছে যে কবির হৃদয়, জলসা শেষে ফিরে গেছেন প্রভুর কাছে। গ্রন্থের প্রতিবাক্য ভালোবাসার অশ্রু দিয়ে গাঁথা, গীত শেষে প্রার্থনা।
বিদ্রোহী প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। অসহযোগের গান গেয়েছেন এক দিকে, আবার রাজা-রানীর জয়গানও গেয়েছেন তাদের সাথে নজরুলের তফাত বুঝবেন এই গ্রন্থে। যার ধর্ম তার কাছে। পৃথিবীতে এত মানুষ। প্রতি মানুষের সমর্পণ ও সম্পর্ক তার নিজ প্রভুর সাথে আলাদা। ধর্ম বাইরে থেকে শনাক্ত করা গেলেও ভেতরে ঢোকার সাধ্যি কার, প্রতি মানুষের সাথে বিধাতা সেখানে একাকী, নজরুল, আমার, আপনার সবার েেত্র তাই। হিন্দু-মুসলমানের সমঝোতা হয়নি। মাটির কলসি ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না। থাকব ভাইয়ের মতো, হিংসার ঊর্ধ্বে।
টেগোর সোসাইটি ও ইকবাল অ্যাকাডেমির কার্যক্রম পর্যালোচনার পর জানা গেল নজরুলকে নিয়ে কাজ অগ্রসর হতে পারেনি অর্থাভাবে। সম্প্রতি ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, কাজী নজরুল ইসলাম ও আব্বাসউদ্দিনকে নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে। এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকতে পেরে আনন্দিত বোধ করছি।
তার ১১৩তম জন্মদিবসে ভেবেছিলাম প্রতি স্কুলে ছেলেমেয়েরা গাইবে তার গান, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত একটি অনুষ্ঠানে ছেলেমেয়েরা স্মরণ করবে তাদের প্রিয় কবিকে, তার নামাঙ্কিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সমবেত হবেন হাজার হাজার নজরুল প্রেমিক; যেখানে জানা যাবে জাতি কিভাবে গত একটি বছর কবিকে নিয়ে এসেছেন জাতির সামনে। জাতীয় ও প্রাইভেট টিভি স্টেশনগুলো উদ্ভাবন করবে নতুন নতুন অনুষ্ঠান, যেখানে কবির ফেলে যাওয়া নাটক-উপন্যাস গীতিনাট্য নতুন করে উপলব্ধি করবে দেশের মানুষ।
গত একটি বছর বিশ্বকবির দেড় শ’ বছর পালন করেছে ভারত ও বাংলাদেশ। এতে রবীন্দ্রনাথের কাব্য ও সঙ্গীতের প্রতি সাধারণের উৎসাহ ও আকর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার ইচ্ছা প্রতিটি স্কুলে নজরুল চর্চা হোক। সেই সাথে আব্বাসউদ্দিন, যিনি নজরুলকে নিয়ে এসেছিলেন সবার কাছে।
‘নজরুল-আব্বাসউদ্দিন স্মৃতিময় অ্যালবাম’ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের আজাদী পাবলিকেশন্স আমার সংগ্রহ ও সম্পাদনায়। ইসমাইল চৌধুরী সযতেœ প্রকাশ করেছেন নজরুলের আশিটি ও আব্বাসউদ্দিনের ৪৫টি অত্যন্ত মূল্যবান ছবি। রয়েছে বিবক্ষণ, বাংলা ও ইংরেজিতে। বক্তৃতা করে সময় নষ্ট না করে কাজ দুটো করেছি, জাতির উদ্দেশ্যে বিনম্র উপহার। চলে গেলে মূল্য অনুধাবন হবে, আগে নয়।
২৩ মে ২০১২ লেখক : সাহিত্য ও সঙ্গীতব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net

সোমবার, ২১ মে, ২০১২

মাত্র একজন মানুষের পাশে দাঁড়াও


মুস্তাফা জামান আব্বাসী
যেদিকে তাকাই, বন্ধু আর বন্ধু, এত বন্ধুও ভাগ্যে ছিল, কে জানত। বাংলাদেশের মানুষ শুনে অন্যান্য দেশের রোটারিয়ানরা গলা জড়িয়ে ধরেছেন, বলেছেন, শুনেছি তোমাদের দেশ সবচেয়ে সুন্দর, শ্যামল, যেখানে বাস করে পৃথিবীর নামকরা ব্যাঘ্র, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর বাস করে ষোল কোটি শুভ্রহৃদয় মানুষ, অল্পে যারা তুষ্ট, সব ধর্মের মানুষকে যারা আহ্বান জানায়
ব্যাংককে কুড়ি বছর পর। নতুন অনুভূতি। দু'দশকে এ শহর ও জাতি এগিয়ে গেল সামনের দিকে, দেখে বিস্মিত। বিশাল ব্যাংকক, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত যেতে সময় কুড়ি মিনিট, স্কাই ট্রেইন, ফ্লাইওভার, চকচকে বাস-ট্যাক্সি-টুকটুক চলে মুহূর্তের ইশারায়, প্রতি মানুষ কাজ করছে সকাল থেকে সন্ধ্যা অক্লেশে, বসে নেই কেউ।
পাঁচশ' বঙ্গসন্তান এসেছি রোটারির ১০৩তম কনভেশনে যোগ দিতে, পঁচিশ হাজার রোটারিয়ান পৃথিবীর সব দেশ থেকে। এ এক অনন্য অনুভূতি। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসেছে নানা রঙের নানা ভাষার মানুষ। সবাই সবার গলা জড়িয়ে ধরছেন, কেউ পুরনো বন্ধু, কেউ নতুন বন্ধুত্বে আবদ্ধ। শত খাবারের ঘর, খাবার খেতে গিয়ে বন্ধুত্ব, 'হাউজ অব ফ্রেন্ডশিপে' গান-নৃত্য জুড়ে দিয়েছেন গানপাগল বন্ধুরা, সঙ্গে শত স্টল যেখানে মেলে ধরেছি কে কোথায় সমাজের জন্য কী কাজ করেছি। প্রজেক্টে আনন্দ পান যারা, বক্তৃতার আসরে নেই উপস্থিত। সারাদিন খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেসব সফল প্রজেক্টের উদ্যোক্তাদের যারা স্টল খুলে বসেছেন, আলাপ করছেন কীভাবে এটি তাদের দেশে উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব। অর্থের অভাব নেই, যে যত প্রজেক্ট করতে চান সম্ভব, অর্ধেক অর্থ জোগাবে রোটারি ফাউন্ডেশন। ঢাকা রোটারি ক্লাব আগামী বছর পঁচাত্তরতম জন্মদিন [আমিও হবো ৭৫] পালন করবে, বাংলাদেশেও রোটারি আগমনের ৭৫তম বছর। ঢাকা ক্লাব থেকে এক ডজন রোটারিয়ান ব্যস্ত 'হাউজ অব ফ্রেন্ডশিপে'। তেরোজন রোটারি গভর্নর : ইফতেখারুল আলম, হাবিবুল্লাহ খান, এমএ মাহবুব, প্রফেসর হাফিজুল্লাহ, ড. মোশাররফ হোসেন, এমএ আউয়াল, জামাল উদ্দিন, মীর আনিসুজ্জামান, ড. মনজুরুল হক চৌধুরী, ড. ইশতিয়াক আবিদ-উজ-জামান, গোলাম মোস্তফা, সাফিনা রহমান, কমডোর রহমান ও আমাদের দু'জনকে দেখে বাংলাদেশের ১৬০টি ক্লাবের ও পশ্চিমবঙ্গের রোটারিয়ানরা মহাখুশি। আসমা ও আমি কনভেনশনে আসিনি কোনোদিন, অর্থের প্রয়োজন। পারিবারিক বন্ধু কল্যাণ ব্যানার্জি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট। তার স্ত্রী বিনতা ব্যানার্জি বললেন, আসমা, তোমাকে এবার আসতেই হবে, তা না হলে আর কথা বলব না। সেই সুবাদেই প্রথমবারের মতো কনভেনশনে দিয়েছি উপস্থিতি। বক্তৃতা মঞ্চে উঠে দাঁড়াইনি, গাইনি কোনো গান, কোনো কবিতা, একমাত্র হজ ও ইরানে অনুষ্ঠিত রুমি কনফারেন্স ছাড়া এর চেয়ে বেশি আনন্দ আর কোনো কনভেনশনে বা জনসমাবেশ থেকে সংগ্রহ করতে পারিনি।
যেদিকে তাকাই, বন্ধু আর বন্ধু, এত বন্ধুও ভাগ্যে ছিল, কে জানত। বাংলাদেশের মানুষ শুনে অন্যান্য দেশের রোটারিয়ানরা গলা জড়িয়ে ধরেছেন, বলেছেন, শুনেছি তোমাদের দেশ সবচেয়ে সুন্দর, শ্যামল, যেখানে বাস করে পৃথিবীর নামকরা ব্যাঘ্র, রয়েল বেঙ্গল টাইগার আর বাস করে ষোল কোটি শুভ্রহৃদয় মানুষ, অল্পে যারা তুষ্ট, সব ধর্মের মানুষকে যারা আহ্বান জানায়। যাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে চারদিনে ৬-৯ মে, তাদের কথা যদি বলি একটু একটু করে, একটি গ্রন্থ সাজানো যাবে অনায়াসেই। কেউ জিজ্ঞেস করলেন বঙ্গবন্ধুর কথা, এতদিন পরেও।
মূল আয়োজনের কথা বলি। মূল শহর থেকে বিশ কিলোমিটার দূরে 'ইমপ্যাক্ট, মুয়াং থং থানি', কুড়িটি বড় বড় হল, বড় কনভেনশনগুলো যেখানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সবকিছু তৈরি, কীভাবে শহরের বড় হোটেল থেকে ডেলিগেটরা আসবেন, কীভাবে কোথায় গিয়ে নামবেন, কোন হলে গিয়ে উঠবেন, কোথায় দুপুরের খাবার খাবেন, কোথায় রেস্ট নেবেন, কীভাবে ফিরবেন, সব আগে থেকে নির্ধারিত। সেখানে ইন্টারনেট আউটলেট এক হাজার, নানা দ্রব্যসামগ্রী, কেউ জুয়েলারি কিনতে চাইলে আর শহরে যেতে হবে না। ক্যামেরা, এমনকি কারও জুতা ছিঁড়ে গেলে নতুন জুতা কেনার সুবিধা। আমার জুতা ছেঁড়ার সুবর্ণ মুহূর্তটি উপস্থিত। গিনি্ন কিনে দিলেন সুন্দর একজোড়া জুতা, যেটি ইতালি থেকে গত সপ্তাহে এখানে জায়গা করে নিয়েছে, এখন আমার পায়ে। আম ও পেয়ারার সমঝদার ইচ্ছা করলে লবণ-চিনি-মরিচ মেশানো ফল খেয়ে দিব্যি ক্ষুধা নিবৃত্তে সমর্থ হবেন।
মূল অনুষ্ঠান যেখানে একসঙ্গে বসতে পারে বিশ হাজার লোক। মূল অধিবেশন দু'ভাগে, সকালে ও বিকেলে। সকালের অধিবেশনে এসেছেন রাজকুমারী, যতক্ষণ বক্তৃতা করেছেন সবাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। প্রতিদিন প্লেনারি সেশনে চারজন বক্তা। তাদের বক্তৃতা শোনা জীবনের অভিজ্ঞতা বৈকি। সার্কাস দেখতে এসে অনেকেই রয়েল বেঙ্গল টাইগার বা হাতি বা বানরের নাচ দেখেই আনন্দিত, হ্যাঁ পয়সা উসুল হয়েছে। তেমনি আটজনের বক্তৃতা শোনার পর আমার মনে হয়েছে আমার এখানে আসা সার্থক হয়েছে।
প্রথমেই বলি, প্রিয় ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইউনূসের কথা। তার বক্তৃতার আগে, মাঝখানে ও শেষে শ্রোতৃমণ্ডলী তিনবার দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট ধরে তাকে ভালোবাসা জানান, আর কেউ এই সম্মানে ভূষিত হননি। তিনি বলেছেন গরিব মানুষের কথা, বলেছেন যারা বড়লোক তাদের জন্য ব্যাংক, তাদের কাছে গিয়ে পয়সা জমা দিতে হয়। তারা আরও টাকা নেন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। আর আমার ব্যাংক হলো গরিবদের জন্য, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকা দিই, তাদের প্রায় সবাই মহিলা। এ এক নতুন দিক যা পৃথিবী আগে জানত না। এখন আমেরিকার শহরগুলোতে গরিবদের জন্য তৈরি হয়েছে এই নতুন ব্যাংক। এ ছাড়া জানালেন, গরিবদের জন্য শুধু দান নয় 'সোশ্যাল বিজনেস' অর্থাৎ যে ব্যবসায় গরিবদের স্থান থাকবে, ওই টাকা শেষ হয়ে যাবে না। রোটারিয়ানদের আহ্বান জানালেন 'সোশ্যাল বিজনেসে' নতুন পুঁজি খাটাতে। এতে দু'দিক সামলানো যাবে। একটি তাদের টাকা, তাদের টাকাই থাকবে। মুনাফা যাবে গরিবদের কাছে, গরিবরা কাজ পাবে, টাকা শেষ হয়ে যাবে না। প্রফেসর ইউনূসের একেকটি বাক্য শেষ হতে লাগছে এক মিনিট সময়, আর আরেক মিনিট করতালির জন্য। মনে পড়ল, সোভিয়েত ইউনিয়নের তাশখন্দ শহরে গেয়েছিলাম ভাওয়াইয়া গান ১৯৬৭ সালে, 'ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে', গানটি তিন মিনিটের, করতালি এক মিনিটের। ইউনূসের বক্তৃতার পর গ্রিনরুমে তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি জড়িয়ে ধরে বললেন : আব্বাসী, এ সাফল্য আমার নয়, সমস্ত বাংলাদেশের। আসমাসহ শত শত প্রাচ্যবাসীর চোখে সেদিন চোখের পানি। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম।
কল্যাণ ব্যানার্জি তৃতীয় বাঙালি, যিনি রোটারি ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি, স্মার্ট, বিনয়ী, সপ্রতিভ, কর্মচঞ্চল। সমস্ত অবয়ব কল্যাণের স্পর্শে অবধূত, স্ত্রী বিনতা, বিনম্র, সি্নগ্ধশ্রী ও কল্যাণময়ী। এমন একজন দম্পতিকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমরা আপ্লুত। তার বক্তৃতা প্রতিটি রোটারিয়ানকে করেছে স্পর্শিত। বললেন, বেশি লাগবে না, মাত্র একজন মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান, অনুভব করুন কী সে স্পর্শের মূল্য, বিধাতা কখন এসে আলোকিত করেন আপনার জীবন। জলবিহীন জীবন পৃথিবীর অর্ধেক লোককে করেছে তৃষিত, নিজের জন্য নির্ধারিত জলের সাশ্রয় করুন, সেই সাশ্রয়ের টাকা রোটারিকে পাঠান, আফ্রিকার জলবিহীন তৃষিত ধরায় তা আনবে খানিকটা তৃষ্ণার জল, তাই-বা মন্দ কি। তার প্রতিটি কথা এখনও যেন আমার মন্দ্রস্পর্শে নিনাদিত। সহজ কথা বলতে আমায় বল যে, সহজ কথা যায় যে বলা সহজে। প্রয়োজন : সহজ কথা উপলব্ধির মানুষের।
মূল বক্তাদের মধ্যে ভালো লেগেছে কনভেনশন সভাপতি সদাহাস্য ও.পি ভায়েস, ব্যাংকক সিমফনি অর্কেস্ট্রার পরিবেশনা, টাটা ইয়াংয়ের থাই জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনা, ব্যাংকক পিয়ানো ট্রায়োর পরিবেশনা, তিনজন বুলগেরীয় শিল্পী কিরিললিয়েফ, আলেকজান্ডার গসপদিনভ ও ইলিয়ান নেদাভের সঙ্গীত, অস্ট্রেলিয়ার গ্গ্নোবাল পোভার্টি প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা হিউ ইভান, ইউনাইটেড ন্যাশন্স ফাউন্ডেশনের গিলিয়ন সোরেনসন ও রাজশ্রী বিরলার বক্তৃতা।
অ্যাঞ্জেলিক কিডজোজো, যিনি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তা গায়িকা, সঙ্গীত রচয়িতা এবং ইউনিসেফের 'গুডউইল অ্যাম্বাসাডর' এত সুন্দর গাইলেন যে তার কণ্ঠ এখনও কানে বাজছে। তার সুর দেওয়া 'মালায়কি', গত বছর ডিসেম্বরে নোবেল শান্তি পুরস্কার অনুষ্ঠানে গীত হলে সবাই হন অভিভূত। আমি স্থির নিশ্চিত যে, অ্যাঞ্জেলিককে ঢাকায় আনা হলে বাংলাদেশের মানুষ তার গান শুনে হতো উদ্বুদ্ধ। পৃথিবীর অনেক লেখক সাহিত্যিক সাংবাদিক গায়ক শিল্পী এখানে উপস্থিত, তাদের সবার স্টেজে ওঠার সুযোগ হয়নি, শোনাও এক বিরাট অভিজ্ঞতা, এ অভিজ্ঞতা অমূল্য।
পঞ্চাশটি সেশনে গুরুগম্ভীর আলোচনায় বিভক্ত হলেন কয়েক হাজার রোটারিয়ান চারদিন ধরে, কেউ পোলিও. কেউ জলকষ্ট, কেউ স্যানিটেশন, কেউ শিক্ষা, কেউ স্বাস্থ্য, কেউ গ্রামসেবা, কেউ তারুণ্যসেবা, কেউ মাতৃঋণ নিয়ে ব্যস্ত। আমি কী নিয়ে ব্যস্ত? পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাঙালিরা এসেছেন রবীন্দ্রতর্পণের জন্য অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাতে। জানালাম, এক বছর ধরে ওই কাজটি করেছি। পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ, বাংলাদেশ সমবায়ে হতে চলেছে 'হারমোনি কমিটি', যাতে এলাকার যাতায়াত সমস্যা সমাধানকল্পে রোটারি নেতৃত্ব এগিয়ে এসে কিছু কাজ করে। কমিটিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছি।
সাউথ এশিয়ার রোটারিয়ানরা বড় হোটেলে আয়োজন করেছেন টি পার্টি, কখনও নদীবিহারে নৃত্যগীত সংবলিত ভোজসভা। সেগুলোতে যাইনি। ব্যাংকক হাসপাতালে কাটিয়েছি দু'দিন, দু'জনেরই জীর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো পরীক্ষা করে দেখলেন থাইল্যান্ডের ডাক্তাররা। এর চেয়ে ভালো ডাক্তার দেশেই আছে। তফাত হলো : তারা মনোযোগী, সময় দিয়েছেন, রিপোর্ট দিয়েছেন এবং রোগ নির্ণয় পিনপয়েন্টেড। নতুন সভাপতি জাপানের সাকুজি তানাকা আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, ঢাকা রোটারির পঁচাত্তরতম জন্মদিনে। তানাকা জানালেন, আগামী বছর কনভেনশন পর্তুগালের লিসবনে। আসবেন অতি অবশ্য। এ মিলনমেলা প্রতি বছরে মাত্র একবার। আসবেন তো?

মুস্তাফা জামান আব্বাসী :সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net