বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১২

একা একটি তরুণী এবং কয়েকজন পুলিশ

ফারুক ওয়াসিফ | তারিখ: ০১-০৬-২০১২
তিনজন পুলিশ মিলে একটি মেয়েকে পেটাচ্ছে। প্রথম আলোর ছবি। পুলিশের হিংস্র মুখ, বর্বর লাঠি, সব স্পষ্ট। কেবল অস্পষ্ট মেয়েটির মুখ। সামাজিক বিড়ম্বনার কথা ভেবে ছবিতে অস্পষ্ট করে রাখা হয়েছে তার মুখচ্ছবি। ঘটনার শুরুতে যে মেয়েটিকে আমরা নিপীড়িত চেহারায় দেখি, ঘটনার শেষে তাকেই ফিরে পাই বীরোচিত সংগ্রামের নায়িকা হিসেবে। যদি সে নারী না হতো, যদি আমাদের দেশে নারীকে কেবল নিপীড়িতা বা কলঙ্কিতা চেহারায় দেখার ও দেখানোর কুঅভ্যাস জারি না থাকত, তাহলে বীরের বন্দনা মেয়েটির প্রাপ্য হতো।
তার নিপীড়ন যতটা সত্য, ততটাই সত্য তার প্রতিবাদের সাহসিকতা, তার আত্মমর্যাদা রক্ষার জেদ। নারীর ওপর আরোপিত ভাবমূর্তি ভেঙে নির্যাতন মোকাবিলা করাই এই প্রায়-কিশোরী ক্লাস এইট পাস, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েটির প্রধান সার্থকতা। হে মেয়ে, তোমার মুখ যে আমাদের অস্পষ্ট করে দিতে হলো, সেটা আমাদের পুরুষালি মনেরই সমস্যা। অন্য সময়, অন্য সমাজ হলে তোমার মুখ দেখার জন্য, তোমাকে অভিনন্দন জানানোর জন্য অজস্র মানুষ ছুটে আসত। অথচ আমাদের দুর্বলতা ঢাকতে আমরা তোমাকেই লুকিয়ে রাখছি।

স্পষ্ট পুলিশ ও অস্পষ্ট মুখের সেই মেয়েটি
অস্পষ্ট মুখের সেই মেয়েটি সব স্পষ্ট করে দিয়েছে। পুলিশ কতটা নির্যাতক, পুলিশ কতটা যৌন নিপীড়ক এবং পুলিশ কতটা আইন ও অধিকারের বিপরীত শক্তি। নিজের শরীরে পীড়নের চিহ্ন বয়ে সে এই সত্য আবারও প্রমাণ করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ‘ভালো’ পুলিশের সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন পুলিশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে বলেছেন, তখন সেই ‘ভালো’ পুলিশ মেয়েটি ও তার পরিবারকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে দেয়নি। কিন্তু আর দশটি নির্যাতনের ঘটনা থেকে এই ঘটনা খুবই আলাদা। মেয়েটি এখানে নীরবে সহ্য করেনি, পালিয়ে বাঁচতে চায়নি বা অপমানে আত্মহত্যা করে বসেনি। এখানে সে রুখে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ নাগরিকদের পথ দেখিয়েছে।
আদালতের গা-ঘেঁষেই পুলিশ ক্লাব। তার সামনের রাস্তায় মা-বাবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে প্রথম পিটুনি খায় সে। তারপর তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ক্লাবের ভেতরে। সেখানে যা হয় তার সঙ্গে কোনো মাফিয়া নির্যাতনকেন্দ্রের পরিস্থিতিরই তুলনা চলে। এক ঘরে বাবাকে পেটানো হচ্ছে। অন্য একটি ঘরে একা সেই তরুণী এবং তাকে ঘিরে কয়েকজন উদগ্র পুলিশ। তার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তার সঠিক নাম পুলিশি সন্ত্রাস ও যৌন নিপীড়ন। সরকার আমাদের বলেছিল, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে পুলিশকে জিরো টলারেন্স দেখাতে বলা হয়েছে। সেই পুলিশ এমনই পুলিশ, যে নিজেই অবতীর্ণ হয়েছে যৌন নির্যাতকের ভূমিকায়। নাগরিকের নিরাপত্তার সহায় পুলিশ এখন ভয়ের ডাকনাম।

রাষ্ট্র বনাম পরিবার
এই ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে পরিবার। মা, বাবা ও কন্যা—তিনজন তিন ঘরে আটক। সেই মা এক কানে তাঁর স্বামীর চিৎকার শুনছেন, অন্য কানে শুনছেন মেয়ের আর্তনাদ। পুলিশ কিছুই শুনছে না। তারা বধির। তারা পিটিয়ে যাচ্ছে, নির্যাতন করেই যাচ্ছে। তখনই মা, মেয়ে আর বাবার কান্নার ধ্বনি একাকার হয়ে লাঞ্ছিত মানবতার হাহাকার হয়ে ওঠে। এই হাহাকার এই মুহূর্তে বাংলাদেশে নিপীড়িত মানবতারই ডাক।
সেই হাহাকার শুনেই বোধ হয় পুলিশের অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা এসে তাঁদের উদ্ধার করেন। যদি তাঁরা সাড়া না দিতেন, যদি তাঁরা বাকিদের মতো অমানুষই হয়ে থাকতেন, তাহলে হয়তো আরেকটা ইয়াসমিন, আরেকটা সীমা চৌধুরীর পরিণতি হতে পারত। কয়েকজন কর্মকর্তার এই সাড়া বিপর্যয়ের মধ্যে ক্ষীণ আশার আলামত হতে পারত। কিন্তু হয়নি।
পুলিশ এবার ‘সত্যিকার’ পুলিশি কারবার শুরু করে দিল। সেই হস্তক্ষেপ করা কর্মকর্তারা পরিবারটির কাছে ক্ষমা চাইলেন না, অপরাধ করা পুলিশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবলেন না। তাঁরা ভাবলেন পরিবারটিকে আটকে রেখে ‘কুকীর্তি’ গোপন করবার কথা। পুলিশ তারপর পুলিশি কায়দাতেই বাপ-বেটি আর মাকে ধরে কোতোয়ালি থানায় নিয়ে যায়। বাবার স্থান হয় হাজতে আর মা-মেয়েকে রাখা হয় একটি ঘরে। রাত ১০টা পর্যন্ত গরাদের ভেতর-বাইরে তারা কোনো একজন ত্রাণকর্তার অপেক্ষা করছিল।
এই সময়ে কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে খবর গিয়েছিল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রসচিবের কিছু করণীয় ছিল কি? মানবাধিকারকর্মী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল যা করেছেন, তাঁদের উচিত ছিল সেই কাজটিই করা। তাহলে অন্তত আইন ও সরকারের কার্যকারিতার একটা নমুনা মিলত। কিন্তু মেলেনি। রাষ্ট্রের একক হলো পরিবার। পরিবার না টিকলে রাষ্ট্র টিকবে না। একটি পরিবার যেখানে বিপন্ন, সেই বিপন্নতার জন্য দায়ী যেখানে স্বয়ং রাষ্ট্র, সেখানে রাষ্ট্রীয় হর্তাকর্তাদের উদাসীনতা কি রাষ্ট্রের পক্ষে যায়?

সভ্যতার শেষ প্রহরীরা
আইনের রক্ষকের দায়িত্বে থাকা সরকার যেখানে আইনি সংস্থার আইনভঙ্গে বিচলিত হচ্ছে না, সেখানে নাগরিকদেরই নিজেদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসতে হয়। এত কথা হয়তো মেয়েটি ভাবেনি। সহজাত আত্মরক্ষার প্রবৃত্তির বশেই হয়তো মা ও মেয়ে করণীয় ঠিক করে। ঘটনা প্রবেশ করে দ্বিতীয় পর্বে। বিকেলের দিকে তারা থানা থেকে বেরিয়ে সেই আদালত চত্বরেই ফিরে আসে, যেখান থেকে তাদের দুর্ভাগ্যের শুরু হয়েছিল এবং যা নাকি ন্যায়বিচারের তীর্থভূমি। উপস্থিত সাংবাদিক ও আইনজীবীদের কাছে তারা ফরিয়াদ করে, তারা সাহায্য চায়। বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এবং আইনজীবী তাঁদের ডাকে সাড়া দেন। দফায় দফায় মার খেয়েও এই সাংবাদিকদের বোধ হয় শিক্ষা হয়নি। তরুণ আইনজীবীদেরও হয়তো মনে পড়েছিল, আইনজীবিতা শুধু ব্যবসায় নয়, দায়িত্বও বটে। মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা বোঝালেন, মানুষ আছে এখনো। সেই মানুষেরা সবাই ‘পুলিশ’ হয়ে যায়নি। ওদিকে পুলিশ তো জেনে গেছে, সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না। আইনজীবী পেটালে কিছু হয় না। তারা এবার সাংবাদিক-আইনজীবী পেটায় এবং মা-মেয়েসহ প্রতিবাদী আইনজীবী ও সাংবাদিকদের থানায় ধরে নিয়ে আটকে রাখে।
বাকি ঘটনাও সবার জানা। সুলতানা কামাল ছুটে আসেন, আটককৃতদের না নিয়ে থানা ছাড়বেন না বলে জেদ ধরেন এবং রাত পৌনে ১০টায় তাঁরা সবাই ছাড়া পান। অস্পষ্ট মুখের তরুণীর সাহসিকতায় যে করুণ নাটকের শুরু, সুলতানা কামালের অসাধারণ দায়িত্বনিষ্ঠায় তা উপসংহারে পৌঁছায়। এক নারীর প্রতিবাদ আর আরেক নারীর দায়িত্ব পালনে প্রমাণ হয়, মানবতার গতি করতে ঝুঁকি নিতে হয়।
এ অবস্থায় সাংবাদিক আর আইনজীবীদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। সাংবাদিক কেবল সংবাদ সংগ্রাহক নন। জনগণের অংশ হয়ে থাকা, জনস্বার্থের পক্ষে থাকা আর সৎ থাকার দায় তাঁদের রয়েছে। কারণ, তাঁদের পেশাটাই অন্যায় ও মিথ্যার বিরুদ্ধে। তাঁরা ভীত হলে বা আপন গর্তে মুখ লুকালে দাপট আর মিথ্যাই জয়ী হবে। আইনকে মানুষের পক্ষে ধরে রাখার দায় আইনজীবীরাও এড়াতে পারেন না। নির্যাতিত মেয়েটির পাশে দাঁড়িয়ে, মার খেয়ে তাঁরা প্রমাণ করেছেন অসভ্যতার বিরুদ্ধে তাঁরাই সভ্যতার শেষ প্রহরী। এ কথাটি অনেক দিন আমরা ভুলে ছিলাম। ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তালিকায় নিহত বা আহত সাংবাদিকদের নাম যুক্ত হওয়ার এই বাস্তবতায় আর ভুলে থাকার সুযোগ নেই। যদি থাকি, তাহলেআমাদের ভূমিকা ছবির ওই কলাপসিবল গেটের শিকধরে দাঁড়িয়েথাকা মানুষগুলোর মতোই অথর্ব হয়ে যাবে।

কোথাও কেউ নেই?
এই ঘটনার একটি শিক্ষা আছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গবেষক আকবর আলি খানের কথায় সেটাই উচ্চারিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সভায় তিনি বলেছেন, ‘সর্বক্ষেত্রে নাগরিকদের সজাগ, সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না-হয় দুঃশাসন দেখা দেবে।’ নাগরিক নজরদারি, প্রতিবাদ ও নাগরিক সংহতি ছাড়া যে বাঁচা যায় না, অস্পষ্ট মুখের ওই মেয়েটি সেটাই জানিয়ে গেল। বুঝিয়ে দিল ভয়, নিরাপত্তাহীনতা আর দুঃশাসনই শেষ কথা নয়।
ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

উপমহাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ

শেখ আবদুস সালাম
বাঙালিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন মানিক মিয়া। সাংবাদিকতা চর্চায়, তার লেখায় এই ভালোবাসা নানাভাবে প্রতিমূর্ত হয়ে উঠেছিল। সময় ও সমাজ বদলের মোক্ষম হাতিয়াররূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা পেশাকে। সুদূরপ্রসারী মিশন ও ভিশন নিয়ে একজন সুদক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে তিনি তার পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল পাঠকগোষ্ঠী

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া উপমহাদেশের সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ কলমসৈনিক। ডাক নাম মানিক মিয়া। ছদ্মনাম মুসাফির। গতানুগতিক কলমজীবী না হয়ে আদর্শ রাজনীতি ও সমাজচেতনার কালপুরুষরূপে তিনি এ দেশের সাংবাদিকতায় এক কালজয়ী অবদান রেখে গেছেন। কলমসৈনিক ও রাজনীতিবিদ মানিক মিয়ার কর্মকাণ্ড ছিল বিশাল অবয়বে পরিব্যাপ্ত। জাতীয় রাজনীতির অতন্দ্র প্রহরী মানিক মিয়া তার আদর্শ ও কর্মনিষ্ঠা দিয়ে বাঙালির ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় স্থান করে নিয়েছেন।

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ছিলেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির অন্যতম দিকপাল হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠ অনুসারী। সহকর্মী ও সহমর্মী হিসেবে এ দেশের রাজনীতির সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্ক বা যোগসূত্রেরই কার্যকর প্রতিফলন ঘটে তার 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামের মধ্য দিয়ে। রাজনীতি ও সমাজ সচেতনতায় তার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে সে সময় তার কলামটি হয়ে ওঠে দেশবাসীর জন্য রাজনীতির এক দূরশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানস্বরূপ। রাজনীতি ছাড়াও তার কলামে স্থান পেয়েছে অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসহ জীবনঘনিষ্ঠ নানা প্রসঙ্গ। বস্তুত তার বহুল পঠিত ও আলোচিত কলামের মাধ্যমে তার জীবদ্দশায় তিনি হয়ে ওঠেন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও পথিকৃৎ জাতীয় ব্যক্তিত্বরূপে।
১৯৪৬ সালে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা থেকে 'ইত্তেহাদ' নামের একটি বাংলা পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আবুল মনসুর আহমেদকে 'দৈনিক ইত্তেহাদে'র সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়। মানিক মিয়া এ সময় মুসলিম লীগ অফিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে 'ইত্তেহাদে'র পরিচালনা বিভাগে সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দেন। ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দিয়ে এ সময় তিনি সবাইকে মুগ্ধ করেন। সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার প্রত্যক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্রপাত ঘটে এই পত্রিকার মাধ্যমেই। আর এ সময় থেকেই তার রাজনৈতিক রচনার হাতেখড়ি। এক বছরের কিছু বেশি সময় তিনি এই পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকাটি সে সময় সব দিক দিয়েই একটি প্রথম শ্রেণীর বাংলা দৈনিক ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর রাজনৈতিক কারণে এ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে মানিক মিয়া ঢাকায় চলে আসেন।
১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের বিরোধী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সে বছরই এই নতুন দলের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক। আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তখন পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর ১৯৫১-এর ১৪ আগস্ট থেকে এই পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে ১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক দৈনিকরূপে আত্মপ্রকাশ করে। ইত্তেফাক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মানিক মিয়া ধীরে ধীরে পত্রিকাটিকে মুসলিম লীগবিরোধী ও পূর্ব বাংলার বঞ্চিত জনগণের মুখপত্র হিসেবে গড়ে তোলেন। ইত্তেফাক অল্পদিনেই সাধারণ পাঠক তথা গণমানুষের পত্রিকা হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পেছনে দৈনিক ইত্তেফাক সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। আর এ ক্ষেত্রে 'মুসাফিরে'র 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
মানিক মিয়া মুসাফির ছদ্মনামে 'রাজনৈতিক মঞ্চ' কলামটিতে অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায়, অন্তরঙ্গ অথচ তীক্ষষ্টভাবে মুসলিম লীগ সরকারের নানা বৈষম্য, অবিচার, অত্যাচার ও বঞ্চনার কাহিনী তুলে ধরতেন। পাঠকরা পরম আগ্রহভরে এই কলামটি পড়ার জন্য অপেক্ষা করত এবং পত্রিকাটি হাতে পেলে যেন গোগ্রাসে তা পড়ে ফেলত।
১৯৫৪ সালের পর পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে যে ভাঙা-গড়ার সূত্রপাত হয়, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার ওপর যে বৈষম্য, অবিচার আর বঞ্চনা চাপিয়ে দেয় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া তার তীব্র বিরোধিতা করেন। আগুন ঝরা লেখনীর মাধ্যমে স্বৈরশাসনের মুখোশ উন্মোচন করেন। আর তাই স্বর্থান্বেষী কেন্দ্রীয় শাসকচক্র তার লেখা সহ্য করতে পারেনি। তাকে বারবার রাজরোষে পড়তে হয়েছে। কারাবরণ করতে হয়েছে তাকে বহুবার। তার পত্রিকা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইনের চোখে তাকে কখনোই দোষী সাব্যস্ত করতে পারেনি।
১৯৫৫ সালে ইত্তেফাকের প্রকাশনা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখে কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৫৯ সালে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে সামরিক আইন লঙ্ঘনের মিথ্যা অজুহাতে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করলে পূর্ব বাংলায় যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল, তা দমনের জন্য অন্য অনেক নেতার সঙ্গে মানিক মিয়াকে আবারও গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের ডাকে পূর্ব বাংলায় যে হরতাল পালিত হয়, সে সময়ও মানিক মিয়াকে গ্রেফতার করা হয় এবং সে সঙ্গে 'নিউ নেশন প্রেস' বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য প্রেস বাজেয়াপ্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের রায়ে তিনি জয়লাভ করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকার অর্ডিন্যান্স সংশোধন করে দ্বিতীয়বার এ প্রেস বাজেয়াপ্ত করে। এ সময় মানিক মিয়া দীর্ঘ ১০ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনের ফলে আইয়ুব সরকার পুনরায় ইত্তেফাক প্রকাশের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। নৈতিক বিজয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯
সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাক পুনঃপ্রকাশিত হয়।
ইত্তেফাকের সাংগঠনিক কাজে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯৬৯ সালের ২৬ মে রাওয়ালপিন্ডি গমন করেন এবং
১ জুন সেখানকার এক হোটেলে
তিনি আকস্মিকভাবে মৃত্যুমুখে
পতিত হন।
বাঙালিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন মানিক মিয়া। সাংবাদিকতা চর্চায়, তার লেখায় এই ভালোবাসা নানাভাবে প্রতিমূর্ত হয়ে উঠেছিল। সময় ও সমাজ বদলের মোক্ষম হাতিয়াররূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা পেশাকে। সুদূরপ্রসারী মিশন ও ভিশন নিয়ে একজন সুদক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে তিনি তার পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল পাঠকগোষ্ঠী।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও মানিক মিয়ার ভূমিকা ছিল অনন্য। পিরোজপুর জেলার বহু স্থানে বিশেষ করে জন্মস্থান ভাণ্ডারিয়া এলাকায় তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ড. শেখ আবদুস সালাম :অধ্যাপক গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা

বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সোনালি সূর্য, চড়ূইয়ের খেলা, ক্ষুধার দর্শন

আলী যাকের
একদিন সাইকেলে করে আশুলিয়ার পথ ধরলাম। পেঁৗছে গেলাম তুরাগ নদের ধারে সেই জায়গায়, যেখানে রাস্তাটি ত্রিধারায় বিভক্ত হয়েছে। একটি ঢাকা থেকে এসেছে, একটি চলে গেছে আশুলিয়া হয়ে নবীনগর-চন্দ্রা রাস্তার দিকে, আর একটি ঢাকার অদূরে অবস্থিত উদ্ভিদ উদ্যানের পাশ দিয়ে চলে গেছে মিরপুর। নিসর্গ আমার অতি প্রিয় একটি বিষয়। ভাবলাম, এখনও দুপুর হয়নি, সাইকেল চালিয়ে যদি পেঁৗছে যাওয়া যায় উদ্ভিদ উদ্যানে, তবে হয়তো বৃক্ষরাজির সানি্নধ্যে বাকি দিনটা কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসা যাবে

রোজ সকালে আমি এখানে এসে বসি, আমার পড়ার টেবিলের পাশে। সামনে বিশাল জানালা। সেই জানালার কোল ঘেঁষে আলসেতে রাখা গাছগাছালির টব। ওই জানালা, ছোট গাছগুলো এবং টবের চারপাশ ঘিরে চড়ূইয়ের কিচিরমিচির আমাকে স্বাগত জানায়। আমি তখন ওদের কিছু আধার খেতে দিই। ওরা দ্বিগুণ উৎসাহে আরও বেশি নাচানাচি করে। এদের মধ্যে অনেকে ঘাড় বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকায়। লেজ ওপরে তুলে ধন্যবাদ জানায় আমাকে। পরের দিন সকালে আমি যখন ওই জানালার ধারে গিয়ে বসি, তখন আবারও ওরা একইভাবে আমার কাছে ছুটে আসে। অব্যক্ত ভাষায় আমরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলি। এ রকম প্রতি সকালেই ঘটে। বস্তুতপক্ষে, আমি যদি কোনো সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠি, ওরা মহাবিরক্ত হয়ে যায়। তারস্বরে চেঁচামেচি করে। ভাবটা এমন যে, যেন আমায় বলছে, 'আজ কী হলো তোমার? এতক্ষণ ধরে এখানে এসে বসে আছি তোমার জন্য?' আমি দেখি, ওরা যখন ওদের খাবার খায়, উড়ে উড়ে এখান থেকে সেখানে। বাচ্চা চড়ূই মায়ের সামনে এসে ঠোঁট দুটি সম্পূর্ণ খুলে ওপরে তাকায়। মা খাবার ভরে দেয় বাচ্চার হাঁ করা মুখের ভেতরে। আবার অনেক সময় দেখি, খাবারের ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ঝগড়াও বাধিয়ে দেয়। কিন্তু অতি দ্রুত তারা এই শত্রুতা ভুলে গিয়ে আবার বন্ধু বনে যায়। মানুষের সঙ্গে এখানেই বোধহয় ওদের তফাত। আমি প্রতি সকালে অভিনিবেশ সহকারে ওদের দেখি। আমি চেষ্টা করি নিদেনপক্ষে একটি হলুদ বক্ষের চড়ূই খুঁজে বের করতে। যে চড়ূই বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় পক্ষীবিশারদ সেলিম আলীকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল পাখি নিয়ে গবেষণা করতে। অনেকদিন ধরেই আমি খুঁজে আসছি এই হলুদ বক্ষবিশিষ্ট চড়ূই, কিন্তু খুঁজে পাইনি এখনও। হতাশ হয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, খালি চোখে বোধহয় এই দুর্লভ পাখি দেখা যায় না, যদি না সেলিম আলীর মতো এক জোড়া বিশেষ চোখ থাকে। তার লেখা ঋধষষ ড়ভ অ ঝঢ়ধৎৎড় ি(একটি চড়ূইয়ের পতন) আমার খুবই প্রিয় গ্রন্থ।

এই একঝাঁক চড়ূইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তাদের স্বাধীনতা, তাদের শঙ্কাহীন জীবন ইত্যাদি দেখতে দেখতে আমার মনে কিঞ্চিৎ হিংসার উদ্রেক হয়। হায়, আমাদের জীবন যদি এ রকম হতো! যে জীবনে দ্বন্দ্ব নেই, ঘৃণা নেই, স্বার্থপরতা নেই। যে জীবনে প্রতিনিয়তই আমাদের কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে না, কণ্ঠরোধ করা হয় না স্বাধীন-মুক্ত চিন্তার। আমাদের মন পরিপূর্ণ, অজ্ঞানতার অমানিশায়। আমরা কি আজ কোনো কিছুই যুক্তি দিয়ে ভেবে দেখি? অথচ যুক্তিবিদ্যার ছাত্র হিসেবে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে যে বাক্যটি আমি প্রথম শিখেছিলাম, সেটি হচ্ছে 'মানুষ যুক্তিবাদী পশু' (গধহ রং ধ জধঃরড়হধষ অহরসধষ)। এর অর্থ তাহলে তো স্পষ্ট এই দাঁড়ায় যে, যদি আমি যুক্তি-বুদ্ধিকে ত্যাগ করি, তবে কেবল পশুতেই পরিণত হয়ে যাব? এই সহজ কথাটি কি আপাত শিক্ষিত আমরা একবারও ভেবে দেখি? এ জগতে মনে হয় মানুষই একমাত্র জীব, যারা অবলীলায় এবং অসংকোচে পাশবিক আচরণ করে বেড়াচ্ছে যত্রতত্র। এই অযৌক্তিক কর্মকাণ্ড আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এর অগ্রযাত্রা সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী। লক্ষ্য করা সম্ভব হবে যে, আমরা অতি সহজেই যুক্তিকে জলাঞ্জলি দিই যখন ব্যক্তিস্বার্থ আমাদের কাছে অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। এ কথাগুলো বলতে বলতে আমার হৃদয়নন্দন বন হঠাৎ কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে পড়ে। মনে হয়, এখনও যখন চারদিকে অনেক আলো, অনেক পাখির গান, অনেক শিশুর কলকাকলি, তখন কেন আমি অকারণে নিজের মনকে ভারাক্রান্ত করছি?
ছেড়ে দিই এসব মন-কেমন-করা কথা। ফিরে যাই হৃদয়ের নিকটে আমার। বেশ কিছুদিন আগের কথা। তখন ঢাকা কিংবা এর পার্শ্ববর্তী রাস্তাগুলো অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ছিল। তখন আমি উত্তরাবাসী ছিলাম। ছুটিছাটার দিনে দিব্যি আমরা বাইসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম বিভিন্ন দিকে। একদিন সাইকেলে করে আশুলিয়ার পথ ধরলাম। পেঁৗছে গেলাম তুরাগ নদের ধারে সেই জায়গায়, যেখানে রাস্তাটি ত্রিধারায় বিভক্ত হয়েছে। একটি ঢাকা থেকে এসেছে, একটি চলে গেছে আশুলিয়া হয়ে নবীনগর-চন্দ্রা রাস্তার দিকে, আর একটি ঢাকার অদূরে অবস্থিত উদ্ভিদ উদ্যানের পাশ দিয়ে চলে গেছে মিরপুর। নিসর্গ আমার অতি প্রিয় একটি বিষয়। ভাবলাম, এখনও দুপুর হয়নি, সাইকেল চালিয়ে যদি পেঁৗছে যাওয়া যায় উদ্ভিদ উদ্যানে, তবে হয়তো বৃক্ষরাজির সানি্নধ্যে বাকি দিনটা কাটিয়ে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসা যাবে। তখনও আমার জানা ছিল না ওই তিন রাস্তার মোড় থেকে কতদূরে বোটানিক্যাল গার্ডেন। রাস্তার নিচেই ফসলের ক্ষেতের পাশে সবুজ ঘাসে মোড়া একটি সমান জায়গায় কিছু বাচ্চা ছেলে খেলাধুলা করছিল। আমি তাদের ডেকে রাস্তার ওপরে তুললাম। তারা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। আমি তাদের প্রশ্ন করি, 'আচ্ছা, এখান থেকে বোটানিক্যাল গার্ডেন কতদূর, এই পথে গেলে?' তারা কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর স্বকীয় ভাষায় জবাব দিল, 'ম্যালা দূর।' আমি জিজ্ঞেস করি, 'ম্যালা মানে কত?' আরেকজন, অপেক্ষাকৃত প্রগল্্ভ ছেলে, আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, 'ম্যালা মানে বুঝেন না? ম্যালা মানে ম্যালা দূর।' আমার মাথায় তখন খেপামি ঢুকে গেছে। আমার জানা দরকার কত এই দূরত্ব, সময়ের মাপে কিংবা কিলোমিটারের মাপে। ফলে আমি আবার বলি, 'ম্যালা দূর তো বুঝলাম। কিন্তু সেটা কত ম্যালা?' তাদের মধ্যে একজন, সবচেয়ে কম বয়সী হবে হয়তোবা, সবাইকে ঠেলেঠুলে দু'পাশে সরিয়ে একেবারে আমার কাছে চলে এলো। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, 'এতদূর যে, যাইতে যাইতে আপনের খিদা লাইগা যাইব।' আমি একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। কী অকাট্য কথা! ক্ষুধা দিয়ে দূরত্বের পরিমাপ। এই যে মানুষগুলো, যাদের জীবনে ক্ষুধা একটি অত্যন্ত বড় সত্য, তাদের সবকিছুর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সেই দর্শন, যার পরিমাপ করা যায় কেবল ক্ষুধার মাধ্যমেই। এই দর্শন আপাতদৃষ্টিতে কত সহজ, কত প্রত্যক্ষ, কত নিরাভরণ, কিন্তু কত সত্য। এতদূর যে, যেতে যেতে খিদে লেগে যাবে! এর চেয়ে সুন্দর কথা আমি সাম্প্রতিককালে খুব কমই শুনেছি। বড্ড ভালো লাগল ওদের। স্থানটির অদূরেই যে ঘাট রয়েছে, তার পাশে ঝালমুড়িওয়ালা ছিল। আমি তাকে ডেকে বললাম, আমাদের সবাইকে মুড়ি খাওয়ান। তারপর সেই মুড়ি খাওয়া নিয়ে মহা হৈচৈ, অনেক গল্প, সবশেষে ডাংগুলি খেলা। তারপর সূর্য যখন তেতে উঠল, আমি ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হৃষ্ট চিত্তে সাইকেল চড়ে রওনা হলাম
বাড়ির পথে।

আলী যাকের :সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

মঙ্গলবার, ২৯ মে, ২০১২

‘ওগো নজরুল হয়নি মোদের কোন ভুল’



মনিরুজ্জামান মনির
‘চিরতরে আমি দূরে চলে যাবো। তবু আমারে দেবো না ভুলিতে’—কবি নজরুল এই গানের অংশবিশেষ শুধু তার প্রিয়ার উদ্দেশে উচ্চারণ করেননি, তিনি সমগ্র মানব পাঠক, মানব-শ্রোতার উদ্দেশে এই গীতিময় বাণী রচনা করেছিলেন। সত্যিই তো আমরা নজরুলকে, নজরুলের অপূর্ব সৃষ্টিকে ভুলতে পারিনি, কখনও ভুলতে পারব না। তাই তো কবির ১১৩তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে, এই বাংলাদেশে সাড়ম্বরে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে। নজরুল বলেছিলেন, ‘আমার এই পরিচয় হোক, আমি তোমাদের লোক’। হ্যাঁ, অবশ্যই নজরুল আমাদের লোক। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীতের রাজকীয় ভাণ্ডারের অর্ধেকের বেশি পূর্ণ করে রেখেছেন তিনি। যুগে যুগে সেই সঞ্চয় আমাদের করবে অহঙ্কারী, করবে অনুপ্রাণিত। অভিমান করে নজরুল কখনও বলেছেন, ‘আমায় নহেগো ভালোবাসো শুধু ভালোবাসো মোর গান।’ নজরুলের গানকে এবং নজরুলকে ভালো না বেসে উপায় নেই। কেননা তার গানে আছে সাম্যের কথা, মানবতার কথা, নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা, ঝঞ্ঝার মতো উচ্ছল, প্রকৃতির মতো সচ্ছলতার কথা। বিশ্বলয়ে খেলা করা বিরাট শিশুর কথা। অসাম্প্রদায়িকতার কথা, মানবপ্রেমের কথা, ইতিহাসের কথা, সংগ্রামের কথা, বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের কথা, তারুণ্যের কথা, যৌবনের কথা, তার গানের সুর, রাগ-রাগিণী আশ্রিত-মিশ্রিত হয়ে নতুন এক ম্যালোডিপূর্ণ সুরের রূপ ধারণ করেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সহজ কথায় বলতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ নজরুল ইসলাম তার গানে ওই সহজ কথা বলেছেন সহজে। তাই সহজ কথায় ভাব প্রকাশ নজরুলগীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাধারণ মানুষের একজন গান শুনে বুঝতে পারে এটি তার হৃদয়ের কথা, অনুভবের কথা। নজরুল তার গানের মতো, কবিতার মতো, গল্পের মতো জীবন যাপন করেছেন। এই সৃষ্টিগুলো তার বাস্তব অভিজ্ঞতারই আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ। স্মৃতির ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় তিনি জন্মের পর থেকে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষ, বিটিশবিরোধী আন্দোলনে সশরীরে সংগ্রামরত সৈনিক, কণ্ঠশিল্পী, গানের শিক্ষক, একজন প্রেমের কাঙাল, সাচ্চা প্রেমিক। নজরুল তার সাহিত্যকর্মে, সঙ্গীত সৃষ্টিতে বাংলার সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়েছেন কিছু উর্দু, আরবি, ফার্সি শব্দসহ বিদেশি সহজবোধ্য শব্দ। এতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ বা অলঙ্কৃত হয়েছে বলা যায়। তার কিছু কিছু গানের সুরেও ইরানি, ইরাকি, মিসরীয় প্রলেপ লক্ষ্য করা যায়। এতে বাংলা গানে সুরের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। নজরুলগীতির আঙ্গিক গায়কি এতই ব্যতিক্রমী, মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যে, সেই গীত নিয়মিত পরিবেশনকারী গায়ক-গায়িকাকে নজরুলগীতির শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত বা বিশেষিত করে দেয়। এই প্রসঙ্গে কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম, সোহরাব হোসেন, সুধীন দাস, খালিদ হোসেন, শবনম মুশতারী, ফাতেমা তুজ জোহরা, মোঃ সালাউদ্দিন, রওশন আরা মোস্তাফিজ, নাশিদ কামাল প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। নজরুল অন্যায়-অবিচারে ‘বিদ্রোহী’ হয়েছেন, বাজিয়েছেন ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’। নজরুলগীতি যেমন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে পূজায় প্রার্থনায় গীত হয়েছে, তেমনি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মনের মসজিদে উচ্চারিত হয়েছে আল্লাহ ও নবীর হামদ-নাতে। কবির এক হাতে ছিল বাঁশের বাঁশরী, আরেক হাতে রণতূর্য্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নজরুলের গান হয়েছিল মেশিনগান, শব্দসৈনিক শিল্পীদের শত্রু বিনাশের ধারালো অস্ত্র। একাত্তরের রণাঙ্গনে ইথারে গর্জে উঠত তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা, আর বজ্রসঙ্গীত—‘এই শিকল পরা ছল মোদের, চল চল ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’, ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’ ইত্যাদি। নজরুলের সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। তিনি শ্রেষ্ঠতম শিখরে একটি আপন ভুবন তৈরি করেছেন। সেখানেই তার একান্ত বসবাস। আমার জীবনে কবি দর্শন একটি উল্লেখযোগ্য অহঙ্কারযোগ্য স্মৃতি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বাকরুদ্ধ জীবন্ত কিংবদন্তি কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে এলেন। হাজার লোকের লাইনে দাঁড়িয়ে আমিও দর্শন করলাম কবিকে। কী আনন্দ এবং বিস্ময় লেগেছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। দেখলাম তার সেই মায়াভরা, প্রেমভরা সুগভীর চোখ দুটো, কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। ঠোঁট দুটো বিরতিহীনভাবে নড়ছে, কাঁপছে। আমি আশায় ছিলাম, এই বুঝি কবি কথা বলবেন। সবই ব্যর্থ। কবি আর কখনও কথা বললেন না। তার পুঞ্জীভূত অনেক বছরের অনেক কথা পৃথিবীর মানুষের কাছে না বলা, না জানাই রয়ে গেল। আমার কেবল মনে পড়তে লাগল কবির লেখা দুটি গানের দুটি পঙক্তি। ১. ‘তোমাদের প্রাণে চাহিয়া বন্ধু আমি আর জাগিবো না’ এবং ২. ‘কথা কও কও কথা থাকিও না চুপ করে’। আমার দ্বিতীয় স্মৃতি কলকাতার কালিঘাটে এইচএমভি’র প্রাচীন দফতরে কবি নজরুল ইসলামের গান লেখার কক্ষ দর্শন। কবিকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়া হলো, নাগরিকত্ব দেয়া হলো। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তার নামকরণ ‘কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ’ করলেন। কিন্তু ধানমন্ডিতে কবির স্মৃতি ঘেরা কবি ভবনটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হলো না। আমি এক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গীতিকার তাকে নিয়ে একটি গান লিখে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলাম অনেক আগে। গানটির সুরকার ছিলেন প্রয়াত আবু তাহের, কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদি।

ওগো নজরুল
হয়নি মোদের কোন ভুল।
মসজিদেরই পাশে তোমার
দিলাম চিরস্থান।
তুমি কি শুনতে পাওনা আজান?
monirlyric@gmail.com

সোমবার, ২৮ মে, ২০১২

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়



আজ প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিবস। জন্ম শিবপুর, হাওরা, ২৬ নভেম্বর, ১৮৯০ সাল। ইংরেজের সওদাগরি অফিসের কেরানি হরিদাস চট্টোপাধ্যায় তার পিতা। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম। মতিলাল শীল ফ্রি স্কুল থেকে ১৯০৭ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে ২০ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে তৃতীয় স্থান অধিকার করে এফএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১১ সালে ইংরেজিতে অনার্সসহ প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ পাস করেছিলেন। ১৯১৩ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক নিযুক্ত হন। পরের বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়ে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত এ পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯১৮ সালে সংস্কৃতের শেষ পরীক্ষায় পাস এবং প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি ও জুবিলি গবেষণা পুরস্কার অর্জন করেন। ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে ১৯১৯ সালে ধ্বনিতত্ত্ব সম্পর্কে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদেশ যান এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্বনিতত্ত্বে ডিপ্লোমা লাভ করেন। ১৯২১ সালে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ‘ইন্দো-আরিয়ান ফিলোলজি’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভ রচনা করে ডি-লিট উপাধি পেয়েছিলেন। ১৯২২ সালে দেশে ফিরে এলে স্যার আশুতোষ তাকে ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের ‘খয়রা’ প্রফেসর নিযুক্ত করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ৩০ বছর এ পদে কর্মরত ছিলেন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থখানি রচনা করে অসাধারণ বিদ্যাবত্তার পরিচয় দেন। ১৯৫২ সালে ইমেরিটাস প্রফেসর নিযুক্ত হন। ১৯৩৬ সালে রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯৬৩ সালে ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ উপাধি পান। ১৯৬৬ সালে জাতীয় অধ্যাপকের সম্মান লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : The Origin and Development of the Bengali Language, Bengali Phonetic Reader. কিরাত জনকৃতি, ভারত-সংস্কৃতি, বাঙ্গালা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, পশ্চিমের যাত্রী, ইউরোপ ভ্রমণ, জাতি সংস্কৃতি সাহিত্য, ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা, সংস্কৃতি কী, দ্বীপময় ভারত, রবীন্দ্রসঙ্গমে, শ্যামদেশ ইত্যাদি। মৃত্যু, কলকাতা, ২৯ মে, ১৯৭৭ সাল।

আমাদের প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর মোজাফফর আহমদ



॥ আবু আহমেদ ॥

স্যারের সরাসরি ছাত্র হইনি আমি কখনো। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে এলেন, তখন আমি অর্থনীতি বিভাগের বাইরে, আর আমি যখন শিক্ষক হিসেবে অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিই তখন তিনি অর্থ বিভাগ ছেড়ে ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে বা আইবিএতে চলে গিয়েছিলেন। আমার জানা মতে, তখন আইবিএ শিক্ষকস্বল্পতায় ভুগছিল। তার যোগদানের মাধ্যমে আইবিএতে সেই শূন্যতা কিছুটা পূরণ হয়। বলা চলে, সত্তর দশকের শুরুতে বা আমাদের স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ঢাবি অর্থনীতি বিভাগের জন্য স্বর্ণযুগ ছিল। তখন প্রথিতযশা অনেক অর্থনীতিবিদই এই বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর আনিসুর রহমান, প্রফেসর এমএন হুদা, প্রফেসর মোশাররফ হোসেন প্রমুখ। প্রফেসর মোজাফফর যখন আইবিএতে যোগদান করেন, তার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ইনস্টিটিউটেরও সোনালি দিন শুরু হয়। তার মতো আদর্শবাদী এবং জ্ঞানে সমৃদ্ধ শিক্ষক ছিলেন বলেই আইবিএ অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়। ছাত্র ভর্তি হয় শিক্ষকদের দেখে। অন্তত আইবিএর গ্র্যাজুয়েটদের যে এত সম্মান ও মূল্য ছিল, তার কারণ তারা প্রফেসর মোজাফফর আহমদের মতো শিক্ষাবিদের ছাত্র ছিলেন। আজো লোকে এর গ্র্যাজুয়টদের বেশি কদর করে। এর মূল কারণ হলো, এই ইনস্টিটিউটগুলো তাদের অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত বাইরের ধারণা এটাই। প্রফেসর মোজাফফর আহমদের বর্ণাঢ্য জীবন ছিল। আসলে প্রতিভাবান লোকেরা এক জায়গায় বসে থাকেন না। তাদের চাহিদা যেমন ব্যাপক, যাকে তেমন এসব লোক নিজের কর্মদক্ষতাকে অন্যত্রও ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি বাংলাদেশের প্ল্যানিং কমিশনেও কাজ করেছেন এবং এর আগে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি শিল্প গড়ার প্রতিষ্ঠান ইপিআইডিসি-তে উঁচু পদে কাজ করেছেন। বলা যেতে পারে, স্বাধীনতাপূর্ব যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেগুলোর পেছনে প্রফেসর মোজাফফরেরও বড় অবদান ছিল। এগুলোর মধ্যে ছিল চট্টগ্রামের স্টিল মিলস, কর্ণফুলী পেপার মিলস ইত্যাদি। একপর্যায়ে তিনি মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বস্ত্রশিল্প উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। বলা চলে, মোজাফফর আহমদের মতো লোকদের হাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যত দিন ছিল তত দিন ওগুলো ভালোই চলেছিল। এসব শিল্পকারখানা ক্ষয় হতে থাকে পরের দশকে যা আজো অব্যাহত আছে। মোজাফফর স্যার আমেরিকার বিখ্যাত শিকাগো ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেছেন। সেই শিকাগো ‘স্কুল’ কিন্তু পুরোপুরি বাজারমুখী একটা স্কুল। অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় সেখান থেকে পাস করা ছাত্রদের শিক্ষাগতভাবেই তারা বাজার অর্থনীতির প্রতি দুর্বল থাকবে এবং পাবলিক সেক্টর অর্থাৎ সরকার নিয়ন্ত্রিত ও সরকারের মালিকানাধীন ব্যবসায়-বাণিজ্যের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু স্যারের মধ্যে ওই আদর্শিক প্রবণতা দেখিনি। তিনি পাবলিক সেক্টর এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে তো ছিলেন না, বরং ওগুলো সঠিকভাবে চালাতে নানাবিধ কৌশলের কথা বলতেন। অনেক সভা-সেমিনারে আমি স্যারের সাথে বিনয়ের মাধ্যমে দ্বিমত পোষণ করতাম পাবলিক সেক্টরের ভূমিকা নিয়ে। অন্যভাবে যেটা পর্যবেক্ষণ করেছি, সেটা হলো ষাট ও সত্তর দশকের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে পাবলিক সেক্টরের প্রতি একধরনের ভক্তি ছিল। হয়তো এমন হবে যে, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন পলিটিক্যাল ইকোনমির দারুণ প্রভাব। তখনো বিশ্বে সমাজতন্ত্র না পুঁজিবাদ বা বাজার অর্থনীতি, এমন একটা বিতর্ক প্রবলভাবে চলছিল। আমাদের দেশের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিদেরাও ওই বিতর্কে প্রভাবিত হয়েছিলেন। একধরনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার প্রতি তাদের বেশ দুর্বলতা ছিল। তাদের যুক্তি এবং অবস্থান বুঝতে চেষ্টা করেছি এবং বলা চলে, দ্বিমত থাকলেও তাদের যুক্তি বুঝতে সক্ষম হয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকে দারিদ্র্যকে হঠানোর জন্য রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বা প্রভাবিত অর্থনীতির পক্ষে ছিলেন। প্রফেসর মোজাফফর আহমদ উন্মুক্ত বাজারের বিপক্ষে ছিলেন। তার যুক্তি ছিল, এমন বাজার শোষকদের হাতে অপব্যবহৃত হয় এবং অনিয়ন্ত্রিত বাজার একচেটিয়া মুনাফার জন্ম দেয়। হ্যাঁ, স্যারের এই তত্ত্ব ভাবনায় আমিও অংশীদার। সে জন্য বাজার অর্থনীতির পক্ষে বলতে গিয়ে সব সময় বলি, বাজার দরকার, তবে বাজার অবশ্যই সুনিয়ন্ত্রিত হতে হবে। দুর্ভাগ্য, আজকে আমাদের এই বাজার অর্থনীতিতে রেগুলেশন বলতে তেমন কিছু নেই। তাই তো দেশে হাজার হাজার কোটি কালো টাকার উৎপাদন হচ্ছে। তাই তো দেশের বিপুল অর্থ বিদেশ পাড়ি দিচ্ছে। মোজাফফর স্যারের সাথে আইবিএর কক্ষে প্রায় দেখা হতো। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন। আমি অনেক কথা শুনতাম এবং তার থেকে অনেক কিছু জেনেছিও। বুঝতাম যে, স্যার কথা ও বিশ্বাসে এক। যেটা বিশ্বাস করতেন সেটাই বলতেন। অবসর নেয়ার পরও স্যার কাজ থেকে দূরে থাকেননি। তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ থেকে দুর্নীতি কিভাবে তাড়ানো যায়। গঠন করলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআইবি বাংলাদেশ চ্যাপ্টার। এই টিআইবির মাধ্যমে মানুষ জানল, বাংলাদেশে দুর্নীতি কত গভীরে। মোজাফফর স্যার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোর দিয়ে বলতেন বলে সমাজের কথিত ক্ষমতাধরেরা তাকে প্রতিপক্ষ মনে করতেন। কিন্তু তিনি যা করেছিলেন সেটা এই দেশের মানুষের জন্যই করেছিলেন। আজকে তিনি নেই। আমরা উপলব্ধি করছি বাংলাদেশ দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটা জোরালো কণ্ঠস্বর হারাল। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। 
লেখন : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রবিবার, ২৭ মে, ২০১২

হ্যাপীকে কি মনে পড়ে?


  • শাম্মী আক্তার হ্যাপী
    শাম
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে। অপচয় হচ্ছে মেধার। কবে কে সড়ক দুর্ঘটনার বলি হবে, তা কেউ জানে না। তাই কেউ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাকে আর কে মনে রাখে? হ্যাপী নামের মেয়েটিকেও কি কেউ মনে রেখেছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন শাম্মী আক্তার হ্যাপী। থাকতেন রোকেয়া হলের বর্ধিত ভবনের ৮৫ নম্বর কক্ষে। বাড়ি পঞ্চগড় শহরের ইসলামবাগ মহল্লায়। ২০০৫ সালের ২৮ মে সকালে ঢাকার শাহবাগে সহপাঠীদের সঙ্গে হ্যাপীও গাড়ি থেকে নেমে পড়েন রোকেয়া হলে ফেরার জন্য। সিগন্যাল পড়ার পর হ্যাপীও তাঁদের পিছুপিছু ব্যস্ত রাস্তাটি পার হচ্ছিলেন। কিন্তু সিগন্যাল উপেক্ষা করে একটি বাস মুহূর্তে ওই সড়কে দানবের মতো তেড়ে আসে। মেধাবী প্রাণটি চোখের পলকে নিঃশেষ হয়ে যায়।
হ্যাপীর স্বপ্ন ছিল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পাস করে দেশের বিখ্যাত মনোরোগ চিকিৎসক হবেন। সে স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি ঘাতক ওই বাসটি। সদা হাস্যোজ্জ্বল হ্যাপী সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন।
মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন হ্যাপী। তাঁর শেষ কথাটি ছিল, ‘বাবা, আমি ভালো আছি’। এদিন সকালেও বাসায় বাবার সঙ্গে নানা বিষয়ে হ্যাপীর কথা হয়েছিল। কেউ বিশ্বাসই করতে পারেনি কিছুক্ষণ পরে হ্যাপী না-ফেরার জগতে চলে যাবে। তবু এটাই ছিল রূঢ় বাস্তবতা।
পঞ্চগড়ে হ্যাপীদের বাড়িতে শোক আছে, কিন্তু জীবন তো প্রবহমান, কারও জন্য থেমে থাকে না। হ্যাপীর বাবা-মাও সন্তানহারা জীবনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে তাঁদের মনে এখনো বেঁচে আছে সন্তান।
বাবা মোজাম্মেল হক চৌধুরী (মুকু চৌধুরী) হ্যাপীর প্রসঙ্গ তুলতেই চোখ মুছে বলেন, ‘আমার কাছে ও মরেনি, যত দিন বেঁচে আছি তার কথা ভুলতে পারব না। আমার মেধাবী মেয়েটা বেঁচে থাকলে প্রতিষ্ঠিত হতো। তার স্বপ্ন ছিল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি পাস করে দেশের সেরা মনোরোগ চিকিৎসক হওয়ার। এদিনে তার সে স্বপ্ন পূরণ হতো। ঘাতক চালক তার সে স্বপ্ন পূরণ করতে দিল না। ঘাতক চালকের কোনো বিচার হয়নি। বিচার হয় না বলেই সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। কিন্তু কই, সড়ক দুর্ঘটনা তো বন্ধ হয়নি, বরং বেড়েছে। সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষার্থী প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকার ব্যর্থ।’ কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়েন মুকু চৌধুরী। তারপর আবার শান্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলেন, ‘হ্যাপী আমাকে নিয়ে, সংসার নিয়ে খুবই ভাবত। আমার চাকরি থেকে অবসর নেওয়া, বাইপাস সার্জারি করার পর আরও বেশি চিন্তা করত।’
হ্যাপীর মা আলেয়া বেগম বলেন, ‘হ্যাপীকে ভুলতে পারি না। হ্যাপীর কথা মনে পড়লে ছবি দেখি আর কাঁদি। তাই তো প্রতিটি ঘরে হ্যাপীর ছবি বাঁধাই করে রেখেছি। এখনো মনে হয় আমার গলা ধরে পাশে শুয়ে আছে। বেঁচে থাকলে এত দিনে তার চাকরি হতো, বিয়েশাদি হতো। এটা-সেটা নিয়ে আসত। যেমন বড় মেয়েটা নিয়ে আসে। এখনো ওর সব স্মৃতি মনে পড়ে। বাড়িতে এলে আশপাশের বাচ্চাদের খুব আদর করত। পাশের বাড়ির ছেলেটাকে নিয়ে এসে আদর করত, গোসল করিয়ে দিত। বড় ভাই বকুলের ছেলে হয়েছে। ও বেঁচে থাকলে ছেলেটাকে খুবই আদর করত।’ বলেই কেঁদে ফেলেন। আরও বলেন, ‘হ্যাপী শাড়ি আর গয়না পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত আর আমাকে দেখতে বলত। সাত বছর হচ্ছে, এখনো তার কথা মন থেকে সরাতে পারছি না।’
বকুল ছিলেন তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। আর হ্যাপী সবার ছোট। এ দুজনের সম্পর্কটাও ছিল অনেকটা বন্ধুর মতো, গাঢ়-গভীর। হ্যাপীর চলে যাওয়ার পর বন্ধুবৎসল ভাইটির সময় যেন কিছুতেই কাটে না। এ জন্য বোধহয় প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে দেখা যায় কেন্দ্রীয় কবরস্থান মাঠে হ্যাপীর কবরের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে। নীরবে চোখের জলও ফেলেন। হ্যাপীর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘যেন বুকের ভেতর কেউ চেপে ধরেছে। ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারি না। কিছুতেই মেনে নিতে পারি না হ্যাপী নেই।’ 
হ্যাপীর সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পঞ্চগড়ে তাঁদের ইসলামবাগের বাসায় আজ সোমবার কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, এতিমদের মাঝে খাবার বিতরণের আয়োজন করা হয়েছে।
আমরা একজন হ্যাপীর পরিবারের কথা বললাম। এ রকম কত পরিবারের না-বলা কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে আকাশে-বাতাসে। সড়ক দুর্ঘটনা যাঁদের সরিয়ে দিয়েছে পৃথিবী থেকে, তাঁদের স্মৃতি দিনে দিনে ফিকে হয়ে আসে। তাঁরা বেঁচে থাকেন শুধু স্বজনদের গভীরে।
শহীদুল ইসলাম
পঞ্চগড় প্রতিনিধি