সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

মহাবিচ্ছেদের কাহিনী



আল মাহমুদ
অসুখ-বিসুখে জর্জরিত হয়েও দিন তো আমার কেটেই যাচ্ছে। দিনের পেছনে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন মনে প্রশ্ন তো জাগবেই, এই দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কী কাজ করেছি, কার জন্য করেছি, কোথায় জমা হয়ে আছে আমার এই পরিশ্রমের শস্য। আবার দেখেছি হিসাব মেলাতে মন সায় দেয় না। পড়েছি, উপভোগ করেছি। এর উপাদেয় অংশ শরীরে-মনে মিশে আছে। আমি কবি মানুষ। আমার তো কাজ ছিল স্বপ্ন, ছন্দ, গন্ধ নিংড়িয়ে সৌন্দর্যের রস সৃষ্টি করা। আমি তো বশ মানিনি। কাজ করেছি। তারপর ভাঁজ করে রেখে দিয়েছি। একদিন ভেবেছি কেউ না কেউ এই ভাঁজ খুলে আঁচ করবে আমার কাজের তেজ, তীক্ষষ্টতা, পরাক্রম কী পরিমাণ ছিল। আমি ইতিহাসের পেছনে ছুটতে চেয়েছি। ইতিহাস আমাকে রেখে নানা বাঁক ঘুরে চলে গেছে তার নির্দিষ্ট নিয়মে। আমি সময়ের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি। কী সাক্ষী দেব আমি ভবিষ্যতের কাছে? একটাই কথা বলতে পারি, আমি ভালোবেসেছিলাম। প্রতিদান পেয়েছি কী পাইনি এটা আর তুলে লাভ কী। আমার কাজ আমি করেছি। পেছন ফিরে তাকাইনি। একটা কথা আছে না, পেছনে যা রেখে এসেছ তা তোমার অতীত নয়, তোমার অভিজ্ঞতা, দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণার ইতিহাস মাত্র। জগতে যা কিছু দেখ তার একটা বিবরণ তুমি তোমার পছন্দমত লিখেছ, ভালো কথা। না লিখলেও কারও কিছু কি এসে যেত? তুমি কবিতা লিখেছ কেন? এজন্য যে তুমি সত্যকে স্বপ্নে মিশ্রিত করতে চেয়েছিলে—এ কাজটি তুমি কমবেশি করে গেছ এবং সেখানে তুমি চাও বা না চাও তোমার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছ এক সঙ্গিনীকে। এইতো তোমার সৃষ্টি। পরিমাপ করতে গেলে অতি সামান্য ব্যাপার। কিন্তু যেহেতু তুমি কবি, সে কারণে সত্য ও মিথ্যায়, কল্পনায় ও বাস্তবে তুমি যা ধরতে চেয়েছিলে সেটা নিঃসন্দেহে ছন্দ, গন্ধ, মিল এবং শেষ পর্যন্ত এক আকাশের দিকে উত্থিত প্রার্থনা। এগুলো তুমি মোটামুটিভাবে করে গেলেও তোমার মধ্যে আছে এক অতৃপ্তি। এই অতৃপ্তি নিয়ে তোমার সঙ্কোচ করতে হবে না, মানুষমাত্রই অতৃপ্ত। সে বহু বছর ধরে সুখাদ্য, সুপেয় কঠিন ও তারল্য পর্যায়ক্রমে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছে। এতে কি তোমার পেট ভরেছে? বলতো কত হাজার বছর ধরে খাচ্ছ? কিন্তু তোমার কি ক্ষিধে মিটেছে? যদি না মিটে থাকে তুমি তো তোমার খাওয়া বন্ধ করবে না। ভোগ-লালসালিপ্ততা কখনও মানুষ বন্ধ করতে পারে না। সে সহস্র বছর খেয়ে ভাড়ার উজাড় করেছে। তবু তার আশ মেটেনি। তবে একটা কাজ সে করেছে। সেটা হলো বারে বারে কবি হয়ে জন্মেছে। শব্দে গন্ধে অনন্তের গান সে রচনা করেছে। সে সুখের মধ্যে বিচ্ছেদের কল্পনাকে অশ্রুজলে সিক্ত করেছে। সে তিক্ততাকে, রিক্ততাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অকারণে কেঁদেছে। বারণ মানেনি। সে শুধু একটাই কথা বলতে জগতের কানকে ঝালাপালা করে দিয়েছে। আর সে কথাটির বিষয়বস্তু হলো তার নিজের দেয়া নাম অনুযায়ী প্রেম। আমরা এই প্রেমের ইতিহাসকে বার বার রচনা করি, রটনা করি এবং ঘটনায় পর্যবসিত করি। আমরা ট্র্যাজেডির জন্ম দিই। মানুষ প্রথম যে জায়গা থেকে বিভিন্ন ভাষায় আলাদা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেই শহরটির নাম ছিল বাবেল। বাবেল শব্দের অর্থ হলো বিচ্ছেদ। এই বাবেল থেকেই বাইবেল শব্দের উত্পত্তি হয়েছে। বাইবেল হলো মহাবিচ্ছেদের কাহিনী।
লেখক : কবি

যাহা পাই তাহা চাই না

আলী হাবিব
কথায় বলে, 'সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর।' কিন্তু কথা না বলেও তো থাকা যায় না। কথা বলতে না পারলে বাঙালির বদহজম হয়ে যায়। বাঙালির অতীত আছে, বাঙালি অতীত নিয়ে কথা বলে। বাঙালি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। স্বপ্নও দেখে। সেই স্বপ্ন কখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। তাই বলে স্বপ্ন দেখা বন্ধ নেই। বন্ধ নেই স্বপ্ন দেখানো। এটা পেলে ওটা দেব, গাড়ু পেলে লোটা দেব- এমন হাজারো স্বপ্নের ফুলঝুরি। কেউ কাউকে ভালো রাখছে। কেউ কাউকে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। দিন যাচ্ছে এভাবেই।
ভবিষ্যতের কথা বলতে পারা কম যোগ্যতার ব্যাপার নয়। এই যোগ্যতা সবার থাকে না। বাঙালির আছে। বাঙালি আশা ও আশঙ্কার কথা সমানভাবে বলতে পারে। জমানা খুব উর্বর। 'যেখানে দেখিবে ছাই', সেখানেই উড়িয়ে দেখার ব্যাপারে বাঙালির জুড়ি নেই। বাঙালি সব পারে। আজ যাকে উদ্ধার করে ছাড়ছে, কাল আবার গলা ছেড়ে তারই কেত্তন গাইছে। সব কিছু পেছনে ফেলে একই মিছিলে 'মানি না মানব না' আর 'মানতে হবে মেনে নাও' স্লোগান দিচ্ছে। এ বলছে 'মানতে হবে মেনে নাও', ও বলছে 'মানছি না মানব না'। সালিস সবাই মানতে রাজি, তবে তালগাছটা যে যার মতো করে চাইছে। একটুকু জমি ছাড়তে রাজি নয় কেউ। একটু ছাড় না দিলে চলবে কেন? গ্লোবাল মার্কেটিংয়ের যুগে এটা হচ্ছে ছাড়ের দুনিয়া। ছাড় দিয়ে মাল ছাড়াতে হয়। 'দেবে আর নেবে'- এই তত্ত্বে বিশ্বাসী না হয়ে কেবল না-মানার স্লোগানে দিন পার করে দিলে তো চলবে না। 'মানি না মানব না' কিংবা 'মানছি না মানব না'- এই দুই পক্ষের না মানামানিতে পাবলিকের জীবন অনেক সময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে ভাবতে হবে। পাবলিকের জীবন নিয়ে কে ভাবছে, ভাই। সেই তো 'থোড় বড়ি কলা, কলা বড়ি থোড়।' পানসে একঘেয়ে জীবন। একদিকে ওপরে ওঠার ব্যাকুলতা। এই সামনে যাই যাই অবস্থা। পেছন থেকে টানছে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ। বাজারে গিয়ে কম দামের জিনিস খুঁজতে খুঁজতে জীবনটাই কমদামি হয়ে গেল। অথচ একটাই মাত্র জীবন। ঘেন্না উগরে দিতে দিতে জীবনের ওপরই ঘেন্না ধরে গেল। ঘেন্না উগরে দেওয়া থামছে না। দেখতে যখন পারি না, তখন দেখে নিতে সমস্যা কোথায়? যে যার মতো করে দেখে নিলেই ল্যাটা চুকে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘেন্না উগরে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আবার দেশপ্রেমের মিশেল রয়েছে। কে কার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক, সেটা প্রমাণের জন্য সবাই প্রাণান্ত। নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রমাণ করতে চাইলে অন্যের দিকে ঘেন্না উগরে দিতে হবে। বিষদাঁত দেখাতে হবে। কামড়ে দেব, কামড়ে দেব- এমন একটা ভাব দেখাতে হবে। ভয় দেখিয়ে জয় করার চেষ্টা। সব বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। আন্দোলন কত প্রকার ও কী কী- উদাহরণসহ বুঝিয়ে দেওয়ার হুমকি তো আছেই। ওদিকে আরেকজন দেখাচ্ছে ইরেজ করে দেওয়ার হুমকি।
যদি প্রশ্ন করা হয়, কী বন্ধ করবেন? উত্তরটা কী হবে? আগে আধপেটা খেতাম, এখন জুটছে কোনো রকমে। বন্ধ করবেন কী? আগে দোকানে গিয়ে নিয়ন আলোয় জামাকাপড় কিনে ঠকে আসতাম। এখন 'রেলিং ব্রাদার্স' কিংবা 'ভ্যান প্লাজাতে'ই স্বস্তি। বন্ধ করবেন কী। আগে মাসে অন্তত একবার বন্ধুদের ডেকে বাড়িতে খাওয়াতাম। সন্তানের জন্মদিনে আনন্দ করতাম। এখন ছোট একটা গিফট কিনে চোরের মতো সেরে ফেলছি। মধ্যবিত্ত বলে কথা! হুট করে একটা কালচার তো বন্ধ করে দিতে পারি না। চালিয়ে যাচ্ছি। আগে বছরে অন্তত একবার বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া হতো। বাজে খরচ আর কত করা যায়। পাবলিক হয়ে জন্মেছি শাটল ককের মতো অদ্ভুত এক ভাগ্য নিয়ে। এদিকে গেলে ও মারছে, ওদিকে গেলে এ মারছে। আমার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। সবাই আমার অভিভাবক। শিশুরা যেমন অভিভাবকের এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়, আমাদের মতো পাবলিকের অবস্থা ঠিক সে রকমই। আমরা এই অভিভাবকদের এক্সপেরিমেন্টের শিকার। সবাই আমাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছে। সেটা করতে গিয়ে আমরা যে মার খাচ্ছি, মার খেতে খেতে আমাদের জীবন যে শুকিয়ে গেল, এটা কাউকে বুঝিয়ে ওঠা গেল না। আমরা যেন খেলার সামগ্রী। এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ। জীবন বটে!
দুনিয়া কোথায় গেছে, সে হিসাব নেই। বাঙালি মেয়েরা পর্যন্ত এভারেস্টের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ফিরে আসছে। আর আমরা এখানে বসে একজন আরেকজনকে বিষদাঁত দেখাচ্ছি। একজন আরেকজনের দিকে ঘেন্না উগরে দিচ্ছে। কে কেমন করে ঘেন্না উগরে দিচ্ছে? ওই যে, 'মানি না মানব না'। কে মানবে আর কে মানবে না, অনেক সময় সেটা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এ মানলে যে ও মানবে না, ও মানলে যে এ মানবে না- এটা এখন স্পষ্ট। 'মানামানিতেই উঠেছে নাভিশ্বাস'। কে দেখছে সেটা? আমরা দেখছি। কী দেখছি? স্বপ্ন দেখছি। কবিরা স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখান। কবি নির্মলেন্দু গুণও স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন। স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে গিয়েই তিনি লিখেছিলেন, '...দিন আসে ঐ মাভৈ মাভৈ'। এই দিন কি আমাদের স্বপ্নের দিন? যেমন স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই স্বপ্ন কি পূরণ হবে আগামী দিনে? তেমন হলে তো বেশ হতো।
আহা, আমাদের স্বপ্নের দিন! সেই সুনীল লিখেছেন, '...আমার পিঠে হাত রেখে বাবা বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও.../আমাদের দেখা হয়নি কিছুই'। কবিতার সঙ্গে আমাদের দেখার মিল হবে না। কবিতার মতো জীবন তো আর আমাদের নয়। নয়, সেটাই বা বলি কেমন করে? এখনো তো আমাদের অনেকের জীবনে ঝলসানো রুটির বাস্তবতা গেল না। তার পরও আমাদের স্বপ্ন দেখা ফুরায় না। আমাদের কল্পনার জগৎজুড়ে এক সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। ভয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এত দিন তো কেবল স্বপ্নভঙ্গই হলো। আমরা এত দিন ধরে যা চেয়েছি, তা কি পেয়েছি? যা পেয়েছি তা কি চেয়েছি? এই পাওয়া না-পাওয়া, চাওয়া না-চাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে সব কেমন গুলিয়ে যায়।
যাকগে, না হয় স্বপ্ন দেখতে দেখতেই জীবন পার করে দেবে বাঙালি। কিন্তু ওদিকে ঝোপের আড়ালে কে যেন উঁকি দিচ্ছে, সেটা কি দেখতে পাচ্ছেন কেউ? আচ্ছা, ওটা কী? ফেউ, নাকি আর কেউ? ওটারও কেমন বিষদাঁত দেখা যাচ্ছে যেন!
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

মহাযোগী বাবা লোকনাথ


বিষুষ্ণপদ ভৌমিক
জমিদার ও বিত্তবানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন মানুষকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে। একইভাবে মহাযোগী বাবা লোকনাথের জীবন ও দর্শনের আলোতে মানবকল্যাণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কর্মযজ্ঞ প্রসারণের প্রয়াস চলছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, 'মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বর লাভ।' ঈশ্বর লাভ করতে হলে মানুষকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। যেমন_ পবিত্রতা, অহিংসা, অচৌর্য, সত্য ও সংযম। পবিত্র না হলে কোনো কিছুই ধারণ করা যায় না। যেমন_ হিংসা মানুষকে ধ্বংসের রাস্তায় নিয়ে যায়। তাই অহিংসুক হওয়া যেমন_ পরদ্রব্যে লোভ না করা। আবার সত্য ও সংযমের অনুশীলন করে নিজের জীবনে প্রয়োগ_ এভাবে মানুষের ভগবৎকৃপাপ্রাপ্ত হয়ে দুর্লভ মনুষ্যজন্ম সার্থক করা। আমরা জানি, সম্পদ সংকট তৈরি করছে। তারপরও সম্পদের পেছনে ছুটছি। ছুটছি অপরাধ জগতে, যে জগৎ থেকে সম্পদ জুগিয়ে সম্পদশালী হবো। তারপর সুখের সাগরে ভাসব_ এ হলো জগৎসংসারে সুখে থাকার মোহনিদ্রা। এ অবস্থায় দেহপাত হলে তাকে আবার জগতের অন্ধকারে চলে আসতে হবে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।
শ্রীশ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার সখা অর্জুনকে বলেছিলেন_ তুমি যোগী হও। তাহলেই তুমি আমাকে জানতে পারবে। বলেছিলেন, তুমি বৈরাগ্য অভ্যাস কর। তাহলে অন্তিমকালে আমাকে স্মরণ করতে করতে মুক্ত হয়ে যাবে। মানুষ শান্তি চায়, আনন্দ চায়। চায় সুখে বসবাসের ঠিকানা। কেন আজ আমরা সুখ ও শান্তির ঠিকানা হারিয়ে স্মৃতিভ্রম হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছি?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোমের আলো জ্বালিয়ে অনেক ভাবনার মধ্যে অনেকক্ষণ ডুবে ছিলেন_ কী বিষয়ে লিখবেন? অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মোমের আলো নিভে গেল। দেখা গেল, পূর্ণিমার সি্নগ্ধ আলোয় ধরণী অপূর্ব সাজ নিয়েছে। ভাবনার আকাশে অনেক বিষয়ে লেখার উপাদান পাওয়া গেল। মানুষের মধ্যে যে ক্ষুদ্র অহংবোধ তার নাশ হলে দিব্যতার উদয় হয়। ছোট মোম কোনো ভাবের সৃষ্টি করতে পারেনি।
আমরা চাই অপরাধপ্রবণতার সীমানা। রাতারাতি কেউ পবিত্র জীবন লাভ করতে পারে না। তার জন্য চাই সত্য ও সুন্দর জীবনবোধের নিরলস প্রয়াস। সৎ বৃত্তির অনুশীলনে পবিত্র জীবন ধারণ করে মানুষ সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারে। সৎ বৃত্তির অভাবে জীবনে মরুময় পরিবেশ নেমে আসে।
মানুষ কী পরিমাণ সম্পদ আহরণে সুখ-শান্তির ঠিকানা পাবে জানে না। শুরু হয় নিরলসভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের দুর্বার সংগ্রাম। পরিশেষে সম্পদ সংকট তৈরি করে জীবনকে বিষবৃক্ষে রূপান্তরিত করে চলেছে_ এ হলো আধুনিক সভ্যতা অর্জনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা। সমষ্টি স্বার্থের প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বার্থকে সংরক্ষণ করতে হবে, তবেই সংসার ও সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। যোগেশ্বর বাবা লোকনাথ বলেছেন, 'সৎ কর্মে যোগ হয়, অসৎ কর্মে বিয়োগ হয়।' এভাবে সৎ বৃত্তির অনুশীলনে মানুষ দেবতায় উন্নীত হতে পারে।
বিশ্বকবি রবিঠাকুরের কথায়_ আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান। আজ যারা দুর্নীতি করছেন তারা জেনে-বুঝেই করছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? এ পথে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ছেন তারা কিন্তু ভোগ করতে পারছেন না। কারণ তারা এতক্ষণে দুরারোগ্য বিচিত্র রোগে আক্রান্ত। এভাবে খালি হাতে আসা মানুষ খালি হাতেই বিদায় নেয়।
সত্যাশ্রয়ী সংসারী ব্যক্তি অনিত্যবস্তু ও নিত্যবস্তু পরখ করে নিত্যবস্তুতে আকর্ষিত হয়ে ঈশ্বরানুভূতি লাভ করে স্বাভাবিক জীবন নির্বাহ করে চলেছে। কৃতকর্মের শুভ ও অশুভ ফলাফল আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সর্বময় ব্রহ্মর্ষি বা লোকনাথকে সমাজের দুস্থ, আতুর-অসহায় মানুষের মধ্যে দর্শন ও তাদের শিবজ্ঞানে সেবার জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সেবামূলক ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পরিচালনা এবং সেবাধর্মকে সাধনার মূল স্তম্ভরূপে গ্রহণ করা প্রয়োজন। মহাযোগী বাবা লোকনাথের ১২২তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে জানাই শ্রদ্ধার্ঘ্য।

বিষুষ্ণপদ ভৌমিক :সাধারণ সম্পাদক শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী
আশ্রম ও মন্দির

শনিবার, ২ জুন, ২০১২

বড় হয়ে পুলিশ হব!


জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান। এখানে প্রায় সময়ই আসি। কিছু মনোরম ছবি চোখ আর ক্যামেরায় বন্দী করে বাড়ি ফিরি। এখানকার গোলাপ বাগান দুটি অসাধারণ। সবুজ গোলাপ এখানেই প্রথম দেখেছি। এখানে আছে চমৎকার একটি পদ্মপুকুর, আছে শাপলাপুকুর আর উদ্যান আলো করা গাছগাছালি। এখানকার বাঁশবাগানটি অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে। তা ছাড়া এই গ্রীষ্মে আগুনলাল কৃষ্ণচূড়া আর পেল্টোফোরাম কী অসাধারণ করে তুলেছে উদ্যানটিকে, দেখে চোখ ধাঁ ধাঁ খাওয়ার জোগাড়। এখানে অনেক দর্শনার্থী আসে প্রতিদিন, ছুটির দিনে যেখানেই তাকান শুধু মানুষ আর মানুষ। তবে এখানকার গাছপালা নষ্ট করা বা ফুল ছেঁড়ায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এটা যেকোনো উদ্যানের জন্য খুব সুখকর একটা দিক। উদ্যানের কর্মীরাও বেশ তৎপর। তবে ইজারাদারদের তৎপরতা খুব কম, তাঁরা উদ্যোগী হলে উদ্যানের পরিবেশটা ভালো করা যেত। শুধু পরিবেশগত কারণেই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের অনেক বদনাম। তবু দর্শনার্থীর কমতি নেই। বিনোদনের খুব অভাব এ দেশে, সে জন্য দেশের অধিকাংশ শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার যেকোনো দিন, বিশেষত ছুটির দিনে এখানে ছুটে আসে।
উদ্যানের ভেতরে হকারদের ঢোকা নিষেধ। তার পরও একধরনের কর্মজীবী মানুষের একটা বলয় গড়ে উঠেছে এখানে, যারা দর্শনার্থীদের ফুট-ফরমায়েশ শোনে। কেউ বা আবার চা-সিগারেট-চিপস-চানাচুর ইত্যাদি বিক্রি করে থাকে। 
এবার বসন্তে মাধবীলতার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। খুব যত্ন করে ছবি তুললাম মাধবীলতার, পাশের গ্লিরিসিডিয়া আর টেবেবুইয়াও বাদ গেল না। এরপর ছবি তুলি ক্যাকটাস ছায়াতরুর ভেতরে। আচ্ছামতো ছবি তোলা শেষে বের হয়ে বাইরের উদালের ছবি ক্লিক করতে গিয়ে ভিউ ফাইন্ডারে ১০-১২ বছরের একটি ছেলে ধরা পড়ে। ছেলেটি তখন টাকা গুনতে গুনতে সামনে এগিয়ে চলেছে। ক্যামেরা ছেলেটির ওপর স্থির হয়ে বেশ কবার ক্লিক করে ওঠে। ছেলেটা দৌড়ের ওপর ছিল, তবু আমার ডাক শুনে কাছে আসে। নাম জানতে চাইলে বলে; আল-আমীন। আমি ব্যাগ থেকে কাগজ-কলম বের করে লিখলাম আলামিন। সে আমার লেখা উঁকি মেরে দেখে সংশোধন করার কথা বলে, ‘ভাইজান, বানান ঠিক করেন। আমার নাম আল-আমীন, আলামিন না।’ আমি বিস্ময় নিয়ে তাকাই। এর মধ্যে সে গড়গড় করে বলে চলেছে, ‘আমি নাম লিখতে পারি, কল্পনা বানান করতে পারি। নার্সারিতে পড়ি, আমার স্কুলের নাম সোহাগ, স্বপ্নধারা পাঠশালা।’ তারপর সে নিজেই বলে তার বাসা মিরপুরের ১০ নম্বরের কাছের দুয়ারীপাড়ায়। রাস্তায় চলতে প্রায় সময়ই আপনারা সদরঘাট টু দুয়ারীপাড়া নামের বাস দেখে থাকবেন। সেই দুয়ারীপাড়ায় কখনো যাওয়া হয়নি। আমি দুয়ারীপাড়া নিয়ে ভাবতে ভাবতে শুনতে পাই, ছেলেটি তখনো বলে চলেছে, ‘বাবা অসুস্থ, কাম করতে পারে না। মা বাসাবাড়িতে কাম করে। আমরা এক ভাই এক বইন। বইনের নাম কুলসুম। আর কিছু ভাইজান?’
এবার ছেলেটির দিকে তাকাই, উচ্ছল প্রাণবন্ত একজন। দেখে মনে হলো অফুরান প্রাণশক্তি তার ভেতর। হুম, কী করিস এখানে? ‘স্যার, মাইনসের কাছে ট্যাকা চাই। ট্যাকা চাইলে মাইনসে না করে না। আমি ছোট তো, আদর করে। মাঝে মাঝে ট্যাকার লগে খাইতে দেয়। খাবার না দিলে ট্যাকা দিয়া কিনা খাই। এই ধরেন শিঙারা, চা, বিস্কুট। প্রতিদিন আমি স্কুল ছুটির পর এই হানে আহি। বিকালবেলা যাইগা।’ টাকা চাইতে লজ্জা করে না? ‘লজ্জা কিসের, ট্যাকা তো আর খালি খালি দেয় না, আমি হেগোর অনেক কাম কইরা দেই!’
আজ কত টাকা পেলি?
‘আজ একটু বেশি পাইছি—১২০ ট্যাকা, আরও পামু। তয় পইত্যেক দিন এমুন পাই না। কোনো দিন এক শ ট্যাকা, আবার কোনো দিন নব্বই ট্যাকার মতন হয়।’
টাকা দিয়ে কী করবি?
‘নানির পান শেষ, নানির লাইগা ১০ ট্যাকার পান কিনুম। আমি একটা আইসক্রিম খামু, কুলসুমের শরীরডা ভালা না। আল্লাহ যেন তার শরীর ভালা কইরা দেয়, হের লাইগা ফকিররে পাঁচ ট্যাকা দিমু, বাকি ট্যাকা মায়রে দিমু।’
তুই কি এমন চেয়ে চেয়ে খাবি সব সময়?
‘না, ভাইজান। কইছি না আমার বাপ অসুস্থ। সংসার চলে না, তাই তো পার্কে আহি। আমি তো ছোট, কাজ করতে পারি না। যহন কাজ করতে পারুম করুম। তা ছাড়া আপনেরে তো কইলাম না, মাইনসে আমারে এমনি এমনি ট্যাকা দেয় না, কত কী কাম যে কইরা লয় আপনে বুজবেন না। শোনেন, ভাইজান, এই যে আপনে খারাইতে কইলেন খারাইলাম, এইটাও একটা কাম! পড়তে আমার খুব ভালা লাগে। স্কুলে আমার রোল নম্বর ৮। আমি পড়ালেখা কইরা অনেক বড় হমু। আমি বড় হয়া পুলিশ হমু।’
পুলিশ হবি কেন?
‘হেগো সক্কলে ডরায়।’
এই জন্য তোর পুলিশ হওয়া লাগব?
‘লাগব, ভাইজান। যে বাড়ি মারে, প্রাণডা বাইর অইয়া যায়।’
আল-আমীনের কথা শুনে আমার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথা মনে পড়ে। একদিন তাঁর স্কুলের শিক্ষিকা ডারমাওয়ান তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘তুমি বড় হয়ে কী হবে।’ ছেলেটির জবাব ছিল, ‘আমি বড় হয়ে প্রেসিডেন্ট হব।’ শেষ পর্যন্ত ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আল-আমীন কী হতে পারবে শেষ পর্যন্ত!
ফারুখ আহমেদ

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ


  • আলোকচিত্র: নিজামুদ্দিন
  • প্রাণেশ সমাদ্দার
    প্রাণেশ সমাদ্দার
1 2 3
অদিতি ফাল্গুনী | তারিখ: ০১-০৬-২০১২
বাংলা সাহিত্যের একটু মনোযোগী পাঠক মাত্রই আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে বিশ শতকের শুরু অবধি বাংলা কথাসাহিত্যে হিন্দু-ব্রাহ্ম মতাদর্শিক সংঘাত, হিন্দুসমাজের নানাবিধ পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে সংস্কারবাদী আন্দোলন হিসেবে ব্রাহ্মধর্মের উত্থান আবার সমাজের বিপুলসংখ্যক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে না পারা কি ব্রাহ্মসমাজের নিজের ভেতরেই মত ও পথের নানা দ্বন্দ্বে কালপ্রবাহে এ ধর্মের বিলুপ্তি প্রভৃতি বিষয়ে অল্প-বিস্তর অবগত। তবে আজও আমাদের দেশের অনেক সাধারণ মানুষই ‘ব্রাহ্মধর্ম’ বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত নন। অনেকেই ‘ব্রাহ্ম’ ও ‘ব্রাহ্মণ’ গুলিয়ে ফেলেন। অথচ এ দুইয়ের মধ্যে যে প্রবল ঝগড়া! বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধানতম কবি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশ যে ব্রাহ্ম ছিলেন, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিষবৃক্ষ উপন্যাসে মদ্যপ দেবেন্দ্রকে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হিসেবে দেখান এবং সেই সঙ্গে হিন্দু বিধবা নারীর পুনর্বিবাহের প্রবক্তা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও দু কথা বলতে ছাড়েন না। রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসে বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে প্রতিপালিত আইরিশ যুবক ও কট্টর হিন্দু জাত্যভিমানসম্পন্ন গোরার সঙ্গে ব্রাহ্মকন্যা সুচরিতার প্রেম হলেও ধর্মীয় ব্যবধানে ভেঙে যেতে চায় সেই প্রেম। শরৎচন্দ্রের একাধিক উপন্যাসে (পরিণীতা, দত্তা ও গৃহবিবাদ) এই হিন্দু-ব্রাহ্ম মতাদর্শিক সংঘাতের পাশাপাশি আন্তসম্প্রদায় প্রণয়-পরিণয়ও বর্ণিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের বাসমতী উপাখ্যান নামের উপন্যাসে দেশবিভাগের ঠিক আগে আগে ‘বাসমতী’ নামের আড়ালে বরিশাল শহরের একদিকে হিন্দু-মুসলিম আন্তসম্প্র্রদায় চাপা টেনশন, নায়কের নির্জন কারুআকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি সেখানকার ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্মের ক্ষয় পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। 

ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন ও বঙ্গীয় রেনেসাঁর সংক্ষিপ্ত ইতিকথা
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট উত্তর কলকাতায় ফিরিঙ্গি কমল বোসের বাসায় প্রথম ‘ব্রাহ্ম সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। এ দিনটিকে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরা ‘ভাদ্রোৎসব’ হিসেবে পালন করে থাকেন। ১৮৩০ সালে বাংলার মোগল নিজামতে চাকরির অপরাধে সামাজিকভাবে একঘরে হওয়া দুই জমিদার ও কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের দুই প্রতিভূ রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার চিৎপুর সড়কে (বর্তমানে যেখানে রবীন্দ্র সরণি) ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি অথবা ১১ মাঘ প্রায় ৫০০ ব্রাহ্মণ এবং একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের উপস্থিতিতে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এ দিনটি ব্রাহ্মসমাজে আজও ‘মাঘোৎসব’ হিসেবে উদ্যাপিত হয়। মূলত রাজা রামমোহন রায় ও দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বেই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন সূচিত হয়েছিল। তৎকালীন হিন্দু বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কৌলীন্য প্রথা, শিশুবিবাহ, কঠোর পণপ্রথা, শিশুবৈধব্য, নারী অশিক্ষা, জাতিভেদ বা বর্ণাশ্রমসহ অসংখ্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনই সহস্রাব্দের শাস্ত্রীয় নিগড়ে আটকে পড়া বাঙালি হিন্দুসমাজের অতিদ্রুত সামাজিক ও শিক্ষাগত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব করে তুলেছিল। বাঙালি হিন্দুসমাজের এই অগ্রগতি প্রভাবিত করে তোলে অবাঙালি হিন্দুসম্প্র্রদায়সমূহ ও বাঙালি মুসলিম মানসকেও। ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নারীশিক্ষা, প্রাপ্তবয়সে বিয়ে, অর্থকরী কাজের প্রয়োজন, নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সক্ষম হয় গোটা ভারত উপমহাদেশ। উইকিপিডিয়ায় তাই আধুনিক ভারত উপমহাদেশকে এই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনেরই ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনের মূল প্রবক্তা রাজা রামমোহন রায় বেদ ও উপনিষদের সারাৎসার আত্মস্থ করে বাতিল করতে চেয়েছিলেন হিন্দুসমাজে প্রচারিত নানা দেব-দেবীর সাকার উপাসনা, একই সঙ্গে তিনি ইসলাম ধর্মের কোরআন-হাদিসও আয়ত্ত করেছেন। ইসলাম ধর্মের কঠোর একেশ্বরবাদিতা ও খ্রিষ্টধর্মের নানা জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। 
১৮৩০-এর নভেম্বরে রাজা রামমোহন রায় ইংল্যান্ডে যান এবং সেখানেই ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। হিন্দুধর্মের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এই ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা হলেও রামমোহনের অবর্তমানে রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ হিন্দুধর্মের একটি মৌলিক পশ্চাৎপদ প্রবণতা অর্থাৎ বর্ণাশ্রমের পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেন। যেমন, ব্রাহ্মসমাজের ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সব সদস্যই উপনিষদ পাঠ ও উপাসনাসংগীত শোনার অধিকার পেলেও তেলেগু ব্রাহ্মণদের সংস্কৃত ভাষায় বেদ পাঠ শুনতে পেতেন শুধু ব্রাহ্মণ বর্ণ থেকে ধর্মান্তরিত সদস্যরাই। রামমোহনের মৃত্যু হতে না হতেই ব্রাহ্ম সভার তেলেগু ব্রাহ্মণ সদস্যরা সাকার উপাসনা বা প্রতিমা পূজায় ফিরে যান। দেবেন্দ্রনাথ জমিদারির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সভার সদস্যসংখ্যাও কমে যায়। যাহোক, ১৮৩৯ সালের ৬ অক্টোবর দেবেন্দ্রনাথ ‘তত্ত্বরঞ্জিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ নামে পরিচিত হয়। শুরুতে ঠাকুর পরিবারের ভেতর সীমিত থাকলেও দুই বছরেই ৫০০-এর বেশি সদস্য হয় এই সভার। ১৮৪০ সালে দেবেন্দ্রনাথ কঠোপনিষদ বাংলায় অনুবাদ করেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁর অপর দুই পুরোধা ব্যক্তিত্ব অক্ষয় কুমার দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এই সভায় যোগ দেন। ১৮৫৫ সাল থেকেই অবশ্য ব্রাহ্মসমাজের ভেতরে প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল অংশের লড়াই পুনরায় শুরু হয়। 
বলা বাহুল্য যে রক্ষণশীল অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কলকাতা ব্রাহ্মসমাজের অব্রাহ্মণ সদস্য কেশবচন্দ্র সেনকে দেবেন্দ্রনাথের পুত্র ও রবীন্দ্রনাথের সেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব পছন্দ করলেও দেবেন্দ্রনাথের ক্রমাগত রক্ষণশীল অবস্থানে বিরক্ত হয়ে ১৮৫৯ সালে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তত্ত্ববোধিনী সভার সচিবের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে পদত্যাগ করেন স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথও। দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র ও বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববোধিনী সভার দায়িত্ব নেন। পিতার পক্ষে ও প্রগতিশীল কেশবচন্দ্র সেনের প্রতি আপন ভাই সত্যেন্দ্রনাথের সজোর সমর্থনে বিরক্ত হেমেন্দ্রনাথ কলকাতার বাইরেও ব্রাহ্মসমাজ প্রসারে উদ্যোগী হন। 

ঢাকায় ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা 
মুনতাসীর মামুনের ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (পৃষ্ঠা: ১৫৬, প্রথম প্রকাশ: জুন ১৯৯৩, অনন্যা প্রকাশনী) গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে যে ১৮৬৯ সালে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ মন্দির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। দোতলা এই স্থাপনার প্রধান আকর্ষণ হলো ৫৫ ফুট দীর্ঘ, ২২ ফুট প্রশস্ত ও ২১ ফুট উঁচু একতলার হলঘর। ১৮৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেশবচন্দ্র সেন নিজে উপাসনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এই মন্দির প্রতিষ্ঠায় স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পাঁচ হাজার ৮৭৫ জন চাঁদা দিলেও বর্তমানে এই মন্দির দেখাশোনা করছে মাত্র তিনটি ব্রাহ্ম পরিবার। ২৫ মে শুক্রবার বিকেলে পুরোনো ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের নিকটবর্তী এই ‘ব্রাহ্মসমাজ মন্দির’-এ গিয়ে দেখি মন্দির তালাবদ্ধ। শুধু রোববার সন্ধ্যায় উপাসনা হয়। সেই উপাসনাতেও মানুষ প্রায় থাকে না বললেই চলে। কথা হলো ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের সাবেক আচার্য ও কমরেড প্রাণেশ সমাদ্দারের সঙ্গে। আশি পার হওয়া প্রাণেশ সমাদ্দার বর্তমানে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রাণেশ সমাদ্দারের জীবনসঙ্গিনী মঞ্জু সমাদ্দার তাঁর স্বামীর বক্তব্য আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৩১ সালে। রবীন্দ্রনাথ এই মন্দিরে ১৯২৬ সালে এসে উপাসনা পরিচালনা করেছিলেন। আমিতো দেখি নাই। তবে আমার মা তাঁকে দেখেছেন। বর্ণাশ্রম আর পৌত্তলিকতায় হারিয়ে গেছে ব্রাহ্মধর্ম। মেয়েরা সব হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে। ব্রাহ্মধর্ম কিন্তু প্রগতিশীল। বিশেষ ধর্ম আইন ১৮৭২-এর আওতায় আমি হিন্দু-মুসলিম বা হিন্দু-খ্রিষ্টান কি মুসলিম-খ্রিষ্টান বিয়ে দিয়েছি। তবে খুব বেশি না। এমন দুই শ কি আড়াই শ বিয়ের আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।’ 

শেষ কথা
ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন আজ প্রায় হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যায়নি সমাজদেহের অভ্যন্তরে যে মৃত সঞ্জীবনী এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছিল। এক শ কি দেড় শ বছর আগেও বাঙালি হিন্দু নারীর ব্লাউজ বা জুতা পরা, বাঙালি হিন্দু পুরুষের মুরগি বা পাউরুটি খাওয়া ‘বেহ্ম’, ‘খেরেস্তানি’ বা ‘মেলেচ্ছ’ আচার বলে যে গণ্য হতো তার বিবরণ রয়েছে খোদ শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেই। শিক্ষিত বা বই পড়া মেয়ে মানেই ব্রাহ্ম তরুণী! হিন্দু নারীর বিয়ে হয়ে যেত আট থেকে দশের ভেতরেই। শিক্ষার কোনো বালাই ছিল না তার। আর আজকের ভারত উপমহাদেশে কোটি কোটি হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষের যে আধুনিক শিক্ষা ও আলোকায়ন সম্ভব হয়েছে, তা এই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভবপর হতো না।

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১২

এই ধরিত্রী আমাদেরই অংশ


আ লী  ই মা ম
চরম অবিবেচক হিসেবে রোম সম্রাট নিরোর পরিচিতি ছিল। তার খামখেয়ালিপনাজাত স্বভাব এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নিয়ে প্রচুর কাহিনী প্রচলিত আছে। অন্যজনের প্রতি পীড়াদায়ক ব্যবহার করে বিকৃত মানসিকতার তৃপ্তি পেতেন তিনি। মনোবিদদের ধারণা তিনি একজন মর্ষকামী ছিলেন। তার উদ্ভট আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয়েছিল সেই বহুল প্রচারিত উক্তিটি, ‘রোম নগরী যখন পুড়ছে সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিলেন।’
কথাটি নতুন করে মনে এল যখন অসহায়ের মতো আমাদের বসবাসের স্থান বিপন্ন গ্রহটিকে প্রত্যক্ষ করছি। সাম্প্রতিক সময়ের বিবিধ ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করে এই চিন্তার উদ্রেক হয়েছে। পৃথিবী নামের গ্রহটি যখন প্রচণ্ড তাপদাহে রীতিমতো পুড়ছে তখন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কতিপয় নীতিনির্ধারক-দেশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। কূটকৌশলে চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সমাধানের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সমস্যা সৃষ্টিকারী উন্নত দেশগুলো যেন নিরোর মতোই দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিচ্ছে। কার্বন নিঃসরণে ও গ্রিনহাউস গ্যাসের জন্য ওজোন স্তরে গর্ত হওয়াতে যে ভয়াবহ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধানের জন্য কার্বন (সিএফসি) নিঃসরণের মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করার কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে না। গ্রহটিকে বাঁচানোর জন্য ঐকমত্যেও আসা সম্ভবপর হচ্ছে না। সুকৌশলে সমস্যাটিকে অনেকটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমাদের গ্রহের এই মারাত্মক বিপর্যয় যেহেতু তাদের যাপিত জীবনযাত্রাকে ততটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে না তাই তারা নিস্পৃহতার পরিচয় দিচ্ছে। যেন তাপের আঁচ তাদের গায়ে লাগছে না। আবহাওয়া বৈরী আচরণ করছে। অসহনীয় এক পরিবেশে আমরা প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত হচ্ছি। পরিবেশবিদদের মতে, যদি দ্রুত দেশে পরিবেশবান্ধব পরিস্থিতি সৃষ্টি করা না-যায় তা হলে আমাদের দেশ বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়বে। এই গ্রীষ্ম তীব্র তাপদাহে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রতিবছর ০.০০৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় প্রায়ই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠছে। এ প্রবণতা আগামী দিনগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। আমাদের দেশটি পরিচিত ছিল নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ বলে। কিন্তু প্রেক্ষাপট এখন পালটে গেছে। বিশ্বাসের পরিবর্তন হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ সেই পরিচিতিকে ম্লান করে দিয়েছে। ১৯৬০ সালে আমাদের দেশে সর্বোচ্চ ৪২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে ৪৫ দশমিক ১ এবং নব্বইয়ের দশকে নথিভুক্ত হয় ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বর্তমানে সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা অত্যধিক বেশি।
আমরা বর্তমান সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত কারণে যে ভয়াবহ সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছি তাতে আবহাওয়াবিদদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। যে পরিবেশ ব্যবস্থা আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে তার প্রেক্ষাপট আবিষ্কার করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছি আমরা। জানা গেছে, গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার দশমিক ৫ শতাংশ। এমনকি ২০৫০ সালে বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২১০০ সাল নাগাদ এই হিসাবে ২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে এই বাড়তি তাপমাত্রায় পানির বাষ্পীভবন বেড়ে যাবে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে। আর্দ্র বাতাসের প্রভাবে তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের আর্দ্রতার মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ তথ্য-উপাত্তের এই হিসাব-নিকাশ না জানলেও এটুকু বুঝতে সক্ষম যে জীবনপ্রবাহ বিপর্যস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়েছে আমাদের দেশটি।
আমাদের এ পৃথিবীটা হল একটি সবুজ ঘর এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের স্তর ঘরের চারপাশের একটি কাচের দেয়াল। সূর্যের যেসব রশ্মি এ কাচের দেয়াল ভেদ করে পৃথিবীর উপরিভাগকে উত্তপ্ত করে, এ স্তর বা কাচের দেয়াল সেই তাপকে বাইরে বেরিয়ে যেতে বাধা দেয়। এর পরিমাণ বা ঘনত্ব যত বৃদ্ধি পাবে পৃথিবী থেকে তাপ ততই কম নির্গত হবে। যার ফলে পৃথিবী দিন দিন আরও বেশি উত্তপ্ত হবে।
বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়েছে। চরম অবস্থায় এসেছে আর্দ্রতা। পানির স্তর নেমে গেছে নিচে। অঞ্চলভিত্তিক অসম বৃষ্টিপাত হয়েছে। জলবায়ুর বিরূপতার সঙ্গে আমাদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা কম। কিন্তু ভুক্তভোগী আমরা বেশি। আমরা ভুক্তভোগী কারণ পৃথিবীতে সুবিধাভোগী দলটির যথেচ্ছ অনধিকারচর্চায় সম্পদগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পদ ভোগ করছে স্বল্প কয়েকটি দেশ। বেশিরভাগ দেশ বঞ্চিত। পৃথিবীর সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদগুলোও এখন একক কোনো গোষ্ঠী বা দলের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়েছে। সম্পদগুলো হচ্ছে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ ভূমি, নীল আকাশ, পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, জলাশয়। এসব সম্পদের প্রাণশক্তিকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যার খেসারত দিতে হয়েছে পৃথিবীর বহু ভূখণ্ডকে। যেমন আমাদের এখন দিতে হচ্ছে। এই চরম সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর মানসিকতাকে চিহ্নিত করেছিলেন প্রখ্যাত পরিবেশবিদ অধ্যাপক হার্ডিন। ১৯৬৮ সালে একটি বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নালে হার্ডিন তার এই ধারণাটিকে তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, মধ্যযুগে ইউরোপের বহুবিস্তীর্ণ চারণভূমি পড়ে থাকত উন্মুক্ত। স্বার্থান্বেষী মানুষ তাদের সুযোগ-সুবিধার জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত এই ভূমি মাত্রাতিরিক্তভাবে ব্যবহার করত, যতক্ষণ পর্যন্ত চারণভূমিটি তার উর্বরা শক্তি হারিয়ে রুক্ষ না হয়ে যেত। এরপর তারা চলে যেত অন্য কোথায়ও। তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই রুক্ষ ভূমির দায় এসে পড়ত নির্দোষ মানুষ জাতির ঘাড়ে। হার্ডিনের ব্যাখ্যার করুণ সুরটিকে এখন আমরা যেন শুনতে পাচ্ছি। আমাদের প্রতিবেশ এখন সঙ্কটাপন্ন এলাকা বলে চিহ্নিত। কাদের দোষে? উন্নত দেশগুলো তাদের উন্নয়ন ও আকাশছোঁয়া সমৃদ্ধির জন্য কুক্ষিগত করেছে পৃথিবীর সেসব সাধারণ সম্পদগুলোকে, যার প্রতি অধিকার ছিল সব মানুষের। এর ফলে আমাদের মতো দেশগুলো বিপন্ন হয়েছে। দায় নিতে হচ্ছে উন্নয়নকামী দেশগুলোকে, তাদের দরিদ্র মানুষগুলোকে- যারা হয়ত এই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত নয়। কিন্তু তাদের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলতে হচ্ছে এর প্রভাবের সঙ্গে। হতদরিদ্র ও দুস্থ মানুষদের দিতে হচ্ছে মূল্য। তাই কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনে অসংখ্য পরিবেশবাদী এই বলে স্লোগান দিয়েছিল যে, ‘এই পৃথিবী মুনাফার জন্য নয়। বাসযোগ্য আর কোনো পৃথিবীও নেই।’
আমাদের দেশের সেসব পরিবেশবাদী ব্যক্তি, যারা দীর্ঘদিন থেকে আমাদের পরিবেশ বিষয়ে সচেতন করে যাচ্ছেন, তারা তাদের স্বপ্ন, আশা ও আকাঙ্ক্ষার কথাকে সাবলীলভাবে, সুস্পষ্ট প্রত্যয়ে প্রকাশ করে গেছেন। তাদেরই এক অন্যতম প্রবক্তা অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার ৮৪তম জন্মদিবসটি পালিত হল গত ২৯ মে, যখন আমাদের প্রকৃতি রুক্ষ। পরিবেশ সঙ্কটাপন্ন। নিসর্গ বিষণ্ন। দ্বিজেন শর্মা এই বৈরী পরিবেশের মাঝেও নতুন প্রজন্মকে নিয়ে যাচ্ছেন রমনা উদ্যানে তরুপল্লবের অনুষ্ঠানে। আগ্রহ সহকারে তাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন গাছগাছালির সঙ্গে। নিবিড় উদ্ভিদজগতের সঙ্গে। প্রসন্ন প্রকৃতির সঙ্গে। নিসর্গপ্রেমী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী, সৌন্দর্যপিয়াসী এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিপন্ন পরিবেশের কথা বলে উত্কণ্ঠা প্রকাশ করে গেছেন। তিনি ভাটির দেশের নানান গাছপালার সৌন্দর্যকে নিবিড়ভাবে উপভোগ করেছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি চেতনায় গভীরভাবে আস্থাশীল। রবীন্দ্রনাথও বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশকে একদা সুষমামণ্ডিত করার প্রয়াসে ব্রতী হয়েছিলেন। দ্বিজেন শর্মা মুগ্ধতায় সেসব প্রয়াসের কথা জানিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের পরিকল্পিত শান্তিনিকেতন একসময় পরিচিত ছিল ভুবনডাঙ্গার ধূসর মাঠ হিসেবে। স্থানীয় অধিবাসীরা সেই অভিশপ্ত মাঠকে এড়িয়ে চলত। ১২ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ তার ঋষি পিতার সঙ্গে সেখানে প্রথম যান- অনুর্বর, রুক্ষ খোয়াইডাঙ্গার প্রান্তরে। তার ৬০ বছর পরে সেই স্মৃতিচারণা করেছিলেন, ‘আমার জীবন নিতান্তই অসম্পূর্ণ থাকত প্রথম বয়সে এই সুযোগ যদি আমার না ঘটত। সেই বালক বয়সে এখানকার প্রকৃতি থেকে যে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম, এখানকার অনবরুদ্ধ আকাশ ও মাঠ, দূর হতে প্রতিভাত নীলাভ শাল ও তাল-শ্রেণীর সমুচ্চ শাখাপুঞ্জে শ্যামলা শান্তি স্মৃতির সম্পদরূপে চিরকাল আমার স্বভাবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।’
রবীন্দ্রনাথ ভুবনডাঙ্গার নিষ্করুণ মাঠের বৈরী পরিবেশকে নিষ্ঠার সঙ্গে নিসর্গমণ্ডিত করে তোলেন। তিনি সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের বর্ণনা দিয়েছিলেন এভাবে-‘ছায়ার রৌদ্রে বিচিত্র লাল কাঁকরের এই নিভৃত জগত্ না দেয় ফল, না দেয় ফুল, না উত্পন্ন করে ফসল।’ সেরকম রুক্ষ প্রকৃতি ও পরিবেশ সচেতন মানুষের কল্যাণে পরিবর্তিত হয়। তারা এমনভাবে এক প্রসন্ন ভুবনকে সৃষ্টি করেন যে সেখানকার ছাতিমতলায় পাথরে খোদিত হয় ‘এখানে আত্মার আরাম’ বাক্যটি। প্রাণহীন, কঙ্করময় প্রান্তরকে তিনি প্রাণময় শিল্পে পরিণত করে গেছেন। শান্তিনিকেতন হয়ে উঠেছিল এক অনবদ্য নিসর্গ স্থাপত্য, যেন মরু বিজয়ের কেতন উড়েছিল সেখানে।
আজ যখন আমাদের ভূখণ্ডটি মরুকরণের বিস্তারে ক্রমশ ধূসর হয়ে আসছে, তখন দ্বিজেন শর্মার চেতনায় রবীন্দ্র প্রকৃতিচর্চার বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমরা রুক্ষতার অবসান চাই। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের অবসান চাই।
খোয়াইডাঙ্গার প্রান্তরে দেবেন্দ্রনাথ যে বীজ রোপণ করেছিলেন তাকে রবীন্দ্রনাথ পরম যত্নে লালন করেছেন। বর্ধিত করেছেন। শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত করেছেন। ফুলে-ফলে সমৃদ্ধ করেছেন। এই পরিবর্তনটি এতই স্মরণীয় যে অকুণ্ঠচিত্তে বলা চলে, ‘সেখানে মৃত্যুর মুখে ঘোষিত হয় বিজয়ী প্রাণের জয়বার্তা।’
রবীন্দ্রনাথের প্রেরণায় দিনে দিনে ঋতুতে ঋতুতে সেখানে রোমাঞ্চিত স্পন্দনের বিস্তার ঘটেছে। তাই লিখেছিলেন, ‘আমি ভালোবাসি গাছপালা, ওদের মধ্যে এই ভালোবাসার অনুভূতি প্রবেশ করে, ওদের কাছ থেকে সেই ভালোবাসারই পাই প্রতিদান।’
আমি ব্যক্তিগতভাবে অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মার প্রবল অনুরাগী। তাকে অনেকবার বলেছি-আপনি কিন্তু আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের সেই কিশোর বলাই। যে গাছ কাটলে প্রবল যন্ত্রণা অনুভব করে।
আমার এই আবেগমথিত কথা শুনে দ্বিজেন শর্মা মৃদু হাসেন। মনে হয় আমার ধারণাটির তিনি বিরোধিতা করেন না। তিনি সঙ্কটের প্রতিবেশ বিষয়ে উত্কণ্ঠা প্রদর্শন করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ‘প্রকৃতি পত্রে’ থাকে সেই উত্কণ্ঠার কথা। যাতে আমাদের সাম্প্রতিক সময় ক্লিষ্ট।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে পৃথিবীর তাপমাত্রা হচ্ছে ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তার দরুন জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। ধনী দেশগুলোর কারণে কার্বন নিঃসরণ ঘটছে শতকরা ৫১ ভাগ। এই ভয়াবহ সমস্যার সমাধানকল্পে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবারই মানুষ প্রবল আশা নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে সম্মেলনগুলোর দিকে। শুভকর ফললাভের প্রত্যাশা করেছে। কিন্তু আশার বাণী শোনা যায়নি। সমাধানের জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের প্রতি গভীর আশায় তাকিয়ে ছিলেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। প্রত্যাশা ছিল ভালো পরিণতির। কিন্তু সেখানেও কোনো সুরাহা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, পৃথিবী কি তাহলে এরকম স্বেচ্ছাচারিতায় নিয়ন্ত্রিত হতে থাকবে? পৃথিবীর সকল সম্পদের ওপর সবার সমান অধিকার রয়েছে।
আমাদের দেশের প্রধান পরিবেশবাদী লেখক অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা এখনও ৮৪ বছর বয়সে উদ্যানে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গিয়ে গাছ চেনাচ্ছে। উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা জাগাচ্ছেন। এই প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের মাঝে তিনি কি আল মাহমুদের মতো বলবেন, ‘লোক নেই, জন নেই পানির পাশে। গাছগুলো মনে হবে দুঃখমাখা।’

লেখক : শিশুসাহিত্যিক

শবেমেরাজ ও শবেবরাত সামনেই

॥ মুস্তাফা জামান আব্বাসী ॥


রাজনীতি পথপরিক্রমণশীলদের প্রতিদিন কর্মসূচি; আজ জেল দিবস, কাল প্রতিবাদ দিবস, পরশু প্রত্যাবর্তন দিবসÑ দিবসের শেষ নেই। হিন্দুদের বারো মাসের তেরো পার্বন লেগেই আছে। মুসলমানদের কী? দিনের পর দিন কুরআনের পাতা খুলে বসা। যেখানেই আল্লাহর আহ্বান, সেখানেই আসন গেড়ে বসা। কুরআনই পথ, কুরআনই পাথেয়। রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনের খোলা পাতা নতুন দিগন্তের সন্ধান। শবেমেরাজ সামনে এলে মুসলমান নতুন করে তালাশ করেন, খুলে বসেন সাহাবিদের নানা গ্রন্থ, যেগুলো তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না আজ। তাদের মধ্যেÑ হজরত আনাস ইবনে মালেক রা:, উবাই ইবনে কাব রা:, বুরাইদা রা:, জাবেদ ইবনে আবদুল্লাহ রা:, হুজায়ফাহ ইবনে ইয়ামান রা:, সামুরাহ ইবনে জুনদুব, সাহার ইবনে সাদ, সাদ্দাদ ইবনে আউস, শোহায়েব আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, মা আয়েশা, মা আসমা, উম্মে হানি, উম্মে সালমা প্রমুখ। তাদের সবার কথাই পড়া হয়ে থাকে এবং সবার কথার মধ্যে যে সাদৃশ্যটুকু, সেটাকেই মূল বলে ধরা হয়। এটি তিন-চার শ’ পৃষ্ঠা অধিকার করে আছে।
হজরত আনাস ইবনে মালেক রা: বলছেন হুজুরে পাক সা:-এর জবানিতেÑ একটি বোরাক নিয়ে আসা হলো; গাধার তুলনায় একটু বড়, খচ্চরের চেয়ে একটু ছোট, বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে গেলাম; ভেতরে গিয়ে আদায় করলাম দুই রাকাত নামাজ। জিব্রাইল আ: নিয়ে এলেন দু’টি পাত্র, একটিতে শরাব, আরেকটিতে দুধ। আমি নিলাম দুধ। আবার বোরাকে সওয়ার হলাম। আসমানে অনেকক্ষণ চলার পর দরজা খুলে গেল, তাকে কে যেন জিজ্ঞেস করলেন, কে?
জিব্রাইল বললেন, আমি জিব্রাইল।
প্রশ্ন হলো, উনি কে?
উনি মুহাম্মদ সা:।
প্রশ্ন হলো, উনাকে কি ডেকে আনা হয়েছে?
জিব্রাইল বললেন, জি।
এর পরে দেখা হলো আদম আ:-এর সাথে। তিনি ‘মারহাবা’ বলে শুভকামনা জানালেন। দ্বিতীয় আসমানে দরজা খুললে একই প্রশ্ন। এখানে দেখা হজরত ঈসা আ: ও হজরত ইয়াহ্ইিয়া ইবনে জাকারিয়া আ:-এর সাথে। তৃতীয় আসমানে দেখা হজরত ইউসুফ আ:-এর সাথে, যিনি রূপ ও সৌন্দর্যের আকর। এরপর চতুর্থ আসমানে দেখা হজরত ইদ্রিস আ:-এর সাথে, যাকে দেয়া হয়েছে সুউচ্চ আসন। পঞ্চম আসমানে দেখা হজরত হারুন আ:-এর সাথে। ষষ্ঠ আসমানে হজরত মুসা আ:-এর সাথে। সপ্তম আসমানে হজরত ইব্রাহিম আ:-এর সাথে, ‘বায়তুল মামুরে’ তিনি ইবাদতরত; যেখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা ইবাদত করতে প্রবেশ করে।
জিব্রাইল আ: পরে নিয়ে যান সিদরাতুল মুনতাহায়, যার বর্ণনা করতে মর্ত্যবাসী অক্ষম। সে এক অপূর্ব বৃক্ষ, যা ছিল আল্লাহর নির্দেশে অপূর্ব সাজে সজ্জিত। আল্লাহ আমাকে দিলেন এক অপূর্ব নিয়ামত, যা হলো তার প্রতি প্রতি মুহূর্তে ভালোবাসার নির্যাস। পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ, যা ছিল তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট উপহার। এগুলো ফরজ নামাজ, যা পালন করলে মানুষ আর কোনো ভুল করতে পারবে না, আল্লাহর সাথে থাকবে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ। আল্লাহর এই অপূর্ব দান মাথায় করে আনার সময় প্রথম যার সাথে দেখা, তিনি হজরত মুসা আ:।
জিজ্ঞেস করলেন, কী নিয়ে এসেছেন?
বললাম : আমার উম্মতের জন্য বহন করে নিয়ে এসেছি পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ।
মুসা আ: বললেন : আমার মনে হয় আপনি আরেকবার যান সেখানে। এর ভার উম্মত বইতে পারবে না। বনি ইসরাইলের ক্ষেত্রে এটি পরীক্ষিত। আপনার এবং আপনার উম্মতের মধ্যে এ ফরজ পালনের সামর্থ্য নেই; কেননা বনি ইসরাইলের ওপর মাত্র দুই ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছিল, তারা এটি পালন করতে পারেনি। এরপর রাসূলে পাক সা: কয়েকবার আল্লাহর কাছে যাতায়াত করলেন এবং সর্বশেষ আল্লাহর তরফ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ফয়সালা হলো।
বেহেশতের আঙিনায় পৌঁছে জিব্রাইল আ: বললেন, হে মুহাম্মদ সা: আপনি কি রবের কাছে বেহেশতের হুর দেখার আবেদন করেছেন?
তিনি বললেন, হ্যাঁ।
হুজুরে পাক সা: তাদের কাছে গিয়ে সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলেন,
আপনারা কারা?
তারা বললেন, আমরা সৎ কর্মশীল সুশীলা সুন্দরী। যারা পাকপবিত্র লোকদের স্ত্রী, আমাদের মধ্যে কখনো বিচ্ছেদ হবে না। আমরা অনন্তকাল ধরে জীবিত থাকব। মৃত্যু কখনো স্পর্শ করবে না আমাদের। এভাবে প্রতিটি সাহাবার কাছে বৃত্তান্ত পৌঁছেছে; কোনো বৃত্তান্তের সাথে আরো কিছু যোগ হয়েছে বটে, কিন্তু কোনোটির সাথে কোনোটির কোনো বিরোধ ঘটেনি। মেরাজে যা পাওয়া গেছে তার নাম সালাত, যেটি মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতেই অর্থাৎ ১৫ তারিখের পূর্বরাতই শবেবরাত। হাদিসে নববীর মাঝে তাকে লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান অর্থাৎ অর্ধশাবানের রাত বলা হয়েছে। ইসলামি তারিখ মতে, সূর্যাস্তের পর থেকে তারিখ ধরা হয়। শবেবরাতের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে ওলিরা বলছেনÑ
* আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গভীর করার মাধ্যম এ রাত। * আত্মশুদ্ধির মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হওয়ার অছিলা এ রাত। * মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্তি এবং বিশুদ্ধ বাসনা পূর্ণ করার উপায় হলো এ রাত। * সাধারণ ক্ষমার রাত। * সাম্য ভ্রাতৃত্ব ও গরিব-দুঃখীদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশের রাত। * শবেবরাতে খোদ আল্লাহ তায়ালা ডাকতে থাকেন বান্দাদের। * এই রাত জীবিকা বণ্টনের রাত। * এই রাত ভাগ্য নির্ধারণ করার।
যারা বঞ্চিত হবেন এ রাতে, তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাহলে বঞ্চিতরা এই দুই মাস চেষ্টা করুন এই লিস্ট থেকে নাম কাটানোর। তারা হলোÑ
১. যারা শিরক করবে। দেশ ভরে গেছে শিরকের সওদায় ব্যক্তি মুসলমানদের দিয়ে, যারা নামে মুসলমান, কর্মে নয়। আল্লাহকে বিশ্বাস করেন শুধু মুখে, কর্মে নয়। যখন কিছু বলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে বলেন; ইসলামি কওমের বিরুদ্ধে বলেন; সব সময় মুসলমানদের খোঁটা দিয়ে কথা বলেন; অথচ মুসলমানদের ধর্মে স্থিত হওয়ার সব রকমের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন। এদেরকে মুরতাদ বলা হয়নি ভদ্রতা করে, কারণ আল্লাহ চট করে মুরতাদ বলা পছন্দ করেন না। এদের কর্মকাণ্ড প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুরতাদের বর্ণনার সাথেই মিলে যায়। আল্লাহ এদের মাফ করুক। যদি আমি তেমনটি হয়ে থাকি, তাহলে আমাকেই প্রথমে মাফ করে দেয়া হোক। ২. পিতা-মাতার অবাধ্যতা। যারা অবাধ্য, তারা সারা রাত নামাজ পড়লেও কাজ হবে না, বিশেষ করে যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করেন, তারা পিতা-মাতার অবাধ্য, তাদের কোনো ইবাদত গ্রহণ করা হবে না। ৩. আত্মীয়তা ছিন্নকারী, বড়লোক, যারা গরিব আত্মীয়দের বাড়িতে ঢুকতে দেন না, টেলিফোন করলে টেলিফোন কেটে দেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে সালাম দিলে উত্তর দেন না, এমন বড়লোকদের সে দিন দেখা যায় মসজিদে বড় বড় গাড়ি করে প্রবেশ করতে। এদের ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কোনো দান ছুড়ে দেয়া যাবে না, বরং সেই দান গ্রহণ করে আত্মীয় তার উপকার করেছেন, এই মনোভাবই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সমাজে দেখছি বড়মানুষী, এমনকি আমিও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত কি না, আমাকে ভেবে দেখতে হবে। নিজকে নিষ্কলুষ ভাবব তা হবে না, হিসাব খুব সূক্ষ্ম। তবে ন্যায়সঙ্গত কারণে আত্মীয়তা ছিন্ন করেছে, এমন উদাহরণ থাকতে পারে। ৪. অন্যের প্রতি ঈর্ষা পোষণকারী। রাজনীতি, ব্যবসায়, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রভৃতি জগতে আধিপত্য দেখছি ঈর্ষাকারীদের। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না, বিশেষ করে রাজনীতির জগতে তা প্রকট। কেউ কারো লেখা পড়ি না, কেউ কারো কবিতা পড়ি না; গান শুনি না। আমি সবার চেয়ে বড়, এই জ্ঞান ঈর্ষার নামান্তর। এমনকি আপনারা শুনে অবাক হবেন, কিছু আলেম পর্যন্ত সর্বকারী। মনে করছেন, তিনি ছাড়া অন্যরা যাবেন দোজখে, সালামটিও গর্বিতভাবে গ্রহণ করেন। আমি যে একজন সামান্য লেখক হিসেবে এই লেখা লিখছি, এটাও কিছু আলেমের অপছন্দ। ভাবছেন, ইনি মাদরাসায় পড়েননি, লেখাটি আমার আলোচ্য গণ্ডির মধ্যে পড়ে না। টেলিভিশনে আলোচনা করতে গিয়ে দেখেছি, আমার দিকে তাকাচ্ছেন যেন করুণার চোখে। এদের সম্পর্কে সবিস্তারে বর্ণনা আছে। এই অধম লেখক যে নবী করীম সা:-এর ওপর গ্রন্থ রচনা করেছি, সেটা তারা এক দিনও পড়ে দেখেননি। এরই নাম ঈর্ষা। এদের ইবাদত কবুল হবে কি? ৫. তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছেদনকারী। রাগ হলে তা থাকতে হবে সর্বোর্ধ্ব তিন দিন, এর বেশি নয়। তা না হলে ওই দিন রাতে ইবাদতে কাজ হবে না। মেয়েদের সতর্ক থাকতে হবে, তাদের রাগ অনেক সময় হয় চণ্ডালের মতো। মুসলমান রমণীরা যেন তা না হয়। ৬. যারা জাদুকর, তাদের ইবাদত গ্রহণ করা হবে না। সমাজে জাদুবিদ্যা বেশ ভালোভাবেই জমে উঠেছে, এটি ইসলামি মতে গ্রহণযোগ্য নয়। নতুনদের মধ্যে যারা জাদুবিদ্যা শিখতে যান, তাদের বিনম্রভাবে জানাতে হবে যে, এটি আল্লাহ পছন্দ করেন না। এই রাতে জাদুকরদের কোনো ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না, তিনি যত বড়ই হোন, যত নাম করে থাকুন। ৭. জ্যোতিষবিদ্যা গ্রহণযোগ্য কি না জানি না, তবে গণক গ্রহণযোগ্য নয়; যত বড় গণকই হোক, তার এবাদত কবুল হবে না। ৮. গণক না হলেও কেউ কেউ গণকের কাছে যান। কোনো বন্ধু বলেছেন যেতে, ‘গণক পাথর সংগ্রহ করে রাখবেন ও বিরাট সম্মানের অধিকারী হব আমি’। যাইনি, টেলিফোন করেছিলাম। টেলিফোনে কণ্ঠ শুনেই শনাক্ত করতে পেরেছেন যে, বিরাট পদ পেতে চলেছি, মন্ত্রীও হতে পারি। বললেন বেশ কিছু টাকা নিয়ে দেখা করতে এবং ইত্যবসরে উনি সবচেয়ে দামি পাথর সংগ্রহ করে রাখবেন। আল্লাহর শুকুর, ওর কাছে যাইনি, পাথর পরিনি, পদ পাইনি, মন্ত্রী হইনি। সুখে আছি, যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন। গণকের কাছে যারা যাবে, তারা এই রাতের কোনো উপকার পাবে না। ৯. সুদখোর। ব্যাংকের সুদ খাবে যারা, বিপদে তারা। ইসলামি ব্যাংকগুলোতে টাকা রেখেও গভীর চিন্তায় রয়েছি যে ৯ নম্বর সূত্রে বাদ পড়ব কি না। ১০. মদ্যপায়ী। মদ খান যারা, সমাজের উচ্চস্তরে তাদের অবস্থান। ইবাদত করার ফুরসত কোথায়, বরং এ রাতেও মশগুল রঙিন সুরায়। শবেবরাত যেন হাস্যকর প্রক্রিয়া, কারণ ওরা তাকে, এ পৃথিবীতেই বেহেশত হাসিল, অর্থ, প্রতিপত্তি, সুরা, নারী করায়ত্ত। আল্লাহর প্রয়োজন কী? ১১. ব্যভিচারী। যারা আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয় ব্যভিচার জীবনে অভ্যস্ত, তাদের এ রাতে হাত না তুললেও চলবে। ১২. কৃপণ। যাদের অনেক অর্থ আছে, তাদের মধ্যে যেমন কৃপণ বেশি, আবার কিছু লোক যারা স্বভাবকৃপণ। অন্যের প্রশংসা করতে জানে না, অন্যের ভালো হলে মন খারাপ করে, পকেটে পয়সা থাকলেও কোনো দিন দানের কথা মনে করে না, তারা আল্লাহর কাছে সারা রাত ধরে হাত পাতলেও লাভ হবে না। ১৩. সব রকমের নেশা বর্জন করতে হবে, হোক তা ধূমপান, মাদক। তারা আল্লাহর করুণা থেকে হবে বঞ্চিত। ১৪. যে ব্যবসায়ী মিথ্যা শপথ করবে, কোর্টে মিথ্যা সাক্ষ্য দেবে, তার জন্য লানত বা অভিশাপ। সে কিছুই পাবে না। ১৫. যে শাসক অত্যাচার করবে, সে হবে লানতের ভাগী। কোনো দিন তার কোনো ইবাদত কবুল হবে না। ১৬. অন্যের অপ্রশংসা করে চলেছে, একজনের কথা আরেকজনকে বলে চোগলখোরি করেছে, তার কোনো ইবাদত কবুল হবে না।
ষোলটি শর্ত পালন করা যেমন সহজ, তেমনি কঠিন। আসলে খুবই সহজ।
ওই রাতে সূর্যাস্তের পরই আল্লাহ তায়ালা নেমে আসেন সর্বনিম্ন আসমানে। বান্দাদের ডেকে বলেনÑ ওহে, আছো কোনো ক্ষমাপ্রার্থী, ক্ষমা করব; আছো কোনো রিজিকপ্রার্থী, রিজিক দেবো; আছো তওবাকারী, তওবা কবুল করব; সুবহে সাদেক পর্যন্ত আল্লাহ তার রহমতের তিন শ’ দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়ে বলতে থাকেনÑ আজ যে যা চাও, তা-ই পাবে।
ইশার নামাজের পর তেলাওয়াত করতে থাকুন, মৃতদের জন্য মাগফিরাত, গরিব-মিসকিনদের জন্য দান, জিকির ও দরুদ, পরের দিন রোজা। পরের জন্য উৎসর্গীকৃত এমন ধর্ম ও জীবনবোধ, পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে কি? ২৬ মে ২০১২
লেখক : সাহিত্য ও সঙ্গীতব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net