শুক্রবার, ৮ জুন, ২০১২

ছিন্নপত্র

মাহমুদুজ্জামান বাবু


পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগের কথা। সামরিক আদালতের কারাদণ্ড মাথায় নিয়ে ঢাকায় এসেছি কেবল। সক্রিয় রাজনীতি করি। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এরশাদ সরকারের দমন-পীড়ন চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সকাল-বিকাল গর্জে ওঠে প্রতিদিন। এমন কোনো সকাল ছিল না তখন, যেদিন মিছিলের বিরতি পড়ত। বিরতিহীন সেই প্রতিবাদ প্রতিরোধের সময়ে এক বিকেলে, চলে গিয়েছিলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। উদ্দেশ্য ছিল অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে দেখা। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গ্রন্থাগারের সুন্দরতম বর্ণনা পেয়েছিলাম অগ্রজ প্রতীমদের কাছে আরও আগে। কীভাবে সদস্যপদ পাওয়া যাবে সে কৌতূহলও ছিল। সেদিন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সঙ্গে দেখা হয়নি। মফস্বলী কুণ্ঠা কাউকে জিজ্ঞাসাও করতে সায় দেয়নি। কিন্তু গ্রন্থাগারটি দেখা হয়েছিল। প্রথম প্রেমে পড়ার মতো শিহরণ ছড়িয়ে পড়েছিল মস্তিষ্কে! এত বিচিত্র বই? ছোট্ট পরিসর কিন্তু গোটা বিশ্ব যেন মমতার হাত বাড়িয়ে রেখেছিল সেখানে। ‘বইপড়া’ যে একটি প্র্যতাহিক কাজ হতে পারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশ-জুড়ে সেই আবেগ কতটা ছড়াতে পেরেছে, সেটা গবেষকেরা বলবেন, কিন্তু আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অসীম। সেই কেন্দ্রের যিনি নেতা, সেই অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আসলে যা বলেননি, সেই জন্য তাঁকে সংসদে এসে ক্ষমা চাইতে হবে—এমন কথা বলার আগে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যদের কয়েকবার ভাবা উচিত ছিল, এটা ধৃষ্টতা কি না।
এ এক অদ্ভুত সমাজ। রাষ্ট্র। দেশ। জনপ্রতিনিধি হিসেবে যাঁরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন, নির্বাচিত হওয়ার পরমুহূর্তেই তাঁরা ভুলে যান যে, প্রতিটা কাজের জন্য তাঁদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করার একটা নৈতিক দায় আছে। নানা রকমের প্রতিশ্রুতি, নিজের নির্বাচনী এলাকার যাবতীয় উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ—সব তখন হয়ে পড়ে কেবল কথার কথা। তাঁরা প্রত্যেকেই তখন গোছাতে থাকেন নিজেদের আখের। জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে যিনি ছিলেন হাজারপতি, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কোটিপতির তালিকায় নাম লেখান। টাকা বাড়ে কীভাবে? টাকা কি ডিম পাড়ে হাঁস-মুরগির মতো? ডিম ফুটে বাচ্চা হয় টাকার? এই যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের রায় নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর জনস্বার্থে কাজ না করা—এই প্রবণতাকে আমরা কী বলব?
রিকশাচালক সমসুদ্দিন এই বিষয়ে একেবারেই ঠোঁটকাটা; মধ্যবয়সী সমসুদ্দিনের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল সদরে। খেত-খোলা নিঃশেষ হয়েছে, তাই এসেছেন ঢাকা শহরে। মাসান্তে বাড়ি যান। কিছু টাকা জমলে। দুই দিন আগে তাঁর রিকশা ভাড়া করেছিলাম কারওয়ান বাজারের পাতালপথের উল্টোমুখ থেকে পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত যাব বলে। সমসুদ্দিনের গালে মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ। জ্যৈষ্ঠের তাপে তাঁর চোখ লালচে ধূসর। একসময়ের সাদা শার্টটি তিলা পড়ে এখন কালো ছোপ ছোপ। প্যাডেলে পা রেখেই সমসুদ্দিন কী যেন বলেন বিড়বিড় করে। আমি উৎকর্ণ হয়েও শুনতে পাই না ভালো। একবার মনে হলো যেন ‘বেইমান’ শব্দটি শুনলাম। আঁতকে উঠি। কী সর্বনাশ! ভাড়া নিয়ে অবশ্য একটু দর-কষাকষি করেছি রিকশায় ওঠার আগে। সে জন্য আমি বেইমান? স্কয়ার হাসপাতালের উল্টো পাশে রিকশা থেকে নেমে নাম ধাম শুনি সমসুদ্দিনের। নরম গলায় ভয়ে ভয়ে জানতে চাই, ‘আপনার এলাকার এমপি কে?’ সমসুদ্দিন গামছা দিয়ে ঘাম মোছেন। উত্তর দেন ম্লানমুখে, ‘রেজা আলী। বাড়ি লাকসাম।’ আমি বলি, ‘লাকসাম তো কুমিল্লায়।’ সমসুদ্দিনের উত্তর, ‘ভোটের সুময় আওয়ামী লীগ তারে ত্রিশালে খাড়া করাইছে। আমরা হ্যারে ভোট দিছি। হ্যায় অহন সংসদে গিয়া লাকসামের কথা কয়। ত্রিশালের কথা কয় না। এইবার আর আওয়ামী লীগের একটা ভোটও দিতাম না, বুঝছুইন!’ আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে যেন। যাক বাবা, আমি সেই বেইমান না।
ঢাকার চারুশিল্পী নাসির আহমদ কদিন আগে তাঁর গ্রামের বাড়ির এলাকার সাম্প্রতিক আতঙ্ক নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছিলেন। নাসিরের বাড়ি কুমিল্লার উত্তর মুরাদনগর। সেখানে বাঙুরা, শ্রীকাইল, আকাপুর ইউনিয়নের জনপদজুড়ে ভয়াবহ ডাকাতি ও নারী অপহরণের আতঙ্ক বিরাজ করছে। এক বাড়িতে ডাকাতি শেষে ডাকাতের হাতে ধর্ষিতা ও ধর্ষণের পর একটি মেয়েকে হত্যার পর ঘরের মেয়ে-বউদের ঢাকা ও অন্যান্য শহরে নিকটাত্মীয়ের বাসায় পাঠানো শুরু করেছেন অভিভাবকেরা। রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন গ্রামের মানুষেরা তাঁদের ঘর-গেরস্থালি। গণমাধ্যমে সংবাদ নেই কেন...আমার প্রশ্নের জবাবে নাসির ইঙ্গিত করেছেন গণমাধ্যমকর্মীদের প্রভাবশালী নেতাদের তুষ্ট রাখার বিষয়ে। সত্য-মিথ্যা জানি না। কিন্তু বিষয়টি অনুসন্ধান প্রয়োজন।
নিরাপত্তাহীনতা সর্বব্যাপী এখন। আদালত চত্বরে নারীর শ্লীলতাহানি, সাংবাদিক প্রহার—সবই ঘটছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে। নারীর প্রতি সহিংসতা, মানুষে-মানুষে সংঘাত, মনুষ্যত্বের পরিবর্তে পাশবিকতার হিংস্র উল্লাস আর রাজনীতির নামে-গণতন্ত্রের নামে পক্ষ-প্রতিপক্ষ নির্মূল-প্রক্রিয়ার অচলায়তনে তৃষা হত্যাকাণ্ডের আসামিরা আপিল বিভাগের রায়ে মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তিত হয়ে সশ্রম কারাদণ্ড পেল। গাইবান্ধা সদর উপজেলার পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী তৃষা সাঁতার জানত না। বখাটেদের ধাওয়ায় সে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ২০০২ সালের ১৭ জুলাই। বাঁচার শেষ চেষ্টা করে তৃষা নিহত হয়েছিল। দমবন্ধ হয়ে।
আজ আমার তৃষার মতো দমবন্ধ লাগছে।
 মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
che21c@yahoo.com

বৃহস্পতিবার, ৭ জুন, ২০১২

হরতাল কেন প্রয়োজন?



হরতাল শব্দটা বর্তমানে আমাদের নিকট খুব পরিচিত। দেশবাসীর কাছে হরতাল সহনীয় হয়ে গেছে। যদিও হরতাল খুবই শক্ত কর্মসূচি। এটা জন-জীবনকে স্তব্ধ করে দেয়। তবুও হরতাল হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভবিষ্যতেও হবে। যদিও আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বর্তমান আছে। তবে আমরা এখনও গণতান্ত্রিক রীতি পদ্ধতি মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারি নাই। আমাদের সরকার বা রিরোধী দল সবাই মুখে গণতান্ত্রিক কথা বললেও কার্যক্ষেত্রে গণতন্ত্রের চর্চা করে না। এটা দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক অস্বস্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। বর্তমান সরকারের বিগত তিন বছরাধিক সময় কাল কোন ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক কোন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যদিও সরকার ও সরকারি দল আওয়ামী লীগ দাবি করছে প্রতিক্ষেত্রে সফলতা। মানুষ অনেক আশা করে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে মানুষ এত হতাশ যে, সরকারের জনপ্রিয়তা খুবই নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের দু্রাপ্যতা, আইন-শৃংখলার অবনতি, জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা, পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যর্থতা, ইসলামের প্রতি বৈরিতা, অত্যধিক ভারতপ্রীতি, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তারসহ সর্বক্ষেত্রে ব্যর্থতা মানুষকে বর্তমান সরকারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছে।
সরকার তাদের জনপ্রিয়তার নিম্নগতি সম্পর্কে সচেতন। তা তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। জলন্ত উদাহরণ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নিয়ে সরকারের তুঘলকীকান্ড। নিজেদের স্বার্থের কথা চিন্তা করে আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকাকে উত্তর ও দক্ষিণ দু'ভাগে ভাগ করে। কিন্তু তারপরও জনগণের উপর আস্থা রাখতে পারছে না।  এজন্য নানা কৌশলে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেও তা স্থগিত করার ব্যবস্থা নেয়।
সর্বশেষ দেশে হত্যা, গুম, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ এত বৃদ্ধি পাচ্ছে যা অতীতে কখনও হয়নি। এমনকি বিভিন্নভাবে জানা যাচ্ছে যে সরকারি বিভিন্ন বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে এসব অপকর্মের সাথে জড়িত। শুধু তাই নয় শোনা যাচ্ছে সরকার তার প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য বা নির্মূল করার জন্য বিভিন্ন বাহিনীকে অবৈধ কর্মে ব্যবহার করছে। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে বেশ আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।
সর্বশেষ বি.এন.পি নেতা ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া নিয়ে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় উঠছে। দেশের মানুষ খুবই বিব্রত এবং হতাশাগ্রস্ত। বি.এন.পি তাদের এমন একজন কেন্দ্রীয় নেতাকে উদ্ধারের জন্য যে কোন কর্মপন্থা নিতে বাধ্য। এক্ষেত্রে তারা জনমত সৃষ্টি করে তা সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাচ্ছে। এটা স্বাভাবিক বটে। ইলিয়াস আলীকে যেভাবে অপহরণ করা হয়েছে তাতে সরকারের সংশ্লিষ্টতা একেবারে অস্বীকার করা কঠিন। অপহরণ পরবর্তী সরকারি মন্ত্রীবর্গ এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তায় জনগণ নাখোশ।
যাক সরকার বলছে তারা ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তায় সে রকম মনে করা কঠিন। বাস্তবেও কাজের অগ্রগতি বলতে কিছু নেই। অবশ্য কর্তৃপক্ষের কথাবার্তায় কিছুটা আশ্বস্ত হওয়ার কারণ রয়েছে যে ইলিয়াস আলী তাদের কাছে রয়েছে।
এমতাবস্থায় বিরোধীদল বিশেষ করে বি.এন.পি'র পক্ষে চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। দল, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে তাকে পদক্ষেপ নিতেই হবে। তবে সেক্ষেত্রেও আমরা বিরোধীদল ও জোটের নিকট হতে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করি। তাই তারা হরতাল আহবান করেছে। ইতিপূর্বে ৩ দিন হরতাল করেছে। পরে আবার ২ দিন হরতাল আহবান করেছে। আপাতত আর হরতাল না দেয়ার চিন্তা করছে। তবে এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারি দলেরও করণীয় আছে।
সন্দেহ নেই হরতাল জনমানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। দরিদ্র মানুষের ভোগান্তি বাড়ায়। দেশের ক্ষতি করে। দেশের অর্থনীতিকে আঘাত করে। বিশেষ করে দিনমজুর ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। এমনকি তাদের উপোস পর্যন্ত থাকতে হয়। জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এমন কোন দিন হরতাল যায় না যে কিছু মানুষের প্রাণ না যায়। কিছু যানবাহন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই প্রশ্ন উঠেছে হরতালের বিকল্প কিছু কর্মসূচি দেয়ার। সরকারপন্থী কিছু বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ হরতাল না দিয়ে অন্য কর্মসূচি দেয়ার আহবান জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হলো অতীতে তারা কোথায় ছিলেন? বিগত বি.এন.পি সরকারের সময় আওয়ামী লীগ কতদিন হরতাল করেছে তা-কি তাদের জানা আছে? সে সময় তারা কেন এরকম বুদ্ধিজীবী-সুলভ কথা বলেন নাই? তখন তাদের দেশপ্রেম কোথায় ছিল?
শুধু হরতাল নয়, এখন বিরোধীদল লাগাতার হরতাল অবরোধ দিয়ে সরকারকে নাজেহাল করেছে। দেশকে করেছে বিধ্বস্ত। তখন তাদের একটাই কথা ছিল বি.এন.পি'কে হঠাও। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে যে কোন ভাবেই ক্ষমতায় যেতে হবে। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে দেশের মানুষ পছন্দ করে কি করে না তার প্রমাণ হবে ভোটে। তাই বলে তারা যা খুশী ইচ্ছা করতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশের স্বাধীনতার পক্ষের দাবিদার শক্তি যা খুশী তাই করতে চায়। করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে খাম-খেয়ালী। তাই বর্তমানে মানুষ এদের নিয়ে হতাশ ও আতংকগ্রস্থ।
দেশের বর্তমান অবস্থায় মানুষ কঠিন কর্মসূচি চায়। শুধু হরতাল নয়, আরও কঠিন কিছু থাকলে তা দিলে দেশ ও জাতির স্বার্থে জনগণ তা মেনে নিতে প্রস্তুত। বি.এন.পিসহ  বিরোধী পার্টিকে জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। সঠিক ও সাহসী নেতৃত্ব নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে হবে। জনগণ কখনো নিজেরা সামনে অগ্রসর হয় না তাদেরকে অগ্রসর করতে হয়। পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। হরতাল ডেকে ঘরে বসে থাকলে চলবে না। মাঠে-ময়দানে নামতে হবে - থাকতে হবে। নির্যাতন করে আন্দোলন বেশিদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। শুধু মুখের কথা আর হাতের জোরে রাজনীতিতে সফল হওয়া যায় না। জনগণের মন জয় করতে হলে দেশপ্রেম থাকতে হয়। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। তা করতে আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হচ্ছে।
সুধীসমাজ অবশ্য উভয় জোটকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পারলে লাভ হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার ও সরকারপন্থীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু তাতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ দেশপ্রেমিক একটা সুশীল সমাজ। সে রকম সমাজ আমাদের দেশে আছে কি? যদি না থাকে তাহলে আন্দোলনের বিকল্প নাই। সেক্ষেত্রে হরতাল চলবেই। দেশবাসী সে জন্য প্রস্তুত।
ডা: সুলতান আহমদ
ধানমন্ডি, ঢাকা

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

মহাবিচ্ছেদের কাহিনী



আল মাহমুদ
অসুখ-বিসুখে জর্জরিত হয়েও দিন তো আমার কেটেই যাচ্ছে। দিনের পেছনে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। এখন মনে প্রশ্ন তো জাগবেই, এই দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে কী কাজ করেছি, কার জন্য করেছি, কোথায় জমা হয়ে আছে আমার এই পরিশ্রমের শস্য। আবার দেখেছি হিসাব মেলাতে মন সায় দেয় না। পড়েছি, উপভোগ করেছি। এর উপাদেয় অংশ শরীরে-মনে মিশে আছে। আমি কবি মানুষ। আমার তো কাজ ছিল স্বপ্ন, ছন্দ, গন্ধ নিংড়িয়ে সৌন্দর্যের রস সৃষ্টি করা। আমি তো বশ মানিনি। কাজ করেছি। তারপর ভাঁজ করে রেখে দিয়েছি। একদিন ভেবেছি কেউ না কেউ এই ভাঁজ খুলে আঁচ করবে আমার কাজের তেজ, তীক্ষষ্টতা, পরাক্রম কী পরিমাণ ছিল। আমি ইতিহাসের পেছনে ছুটতে চেয়েছি। ইতিহাস আমাকে রেখে নানা বাঁক ঘুরে চলে গেছে তার নির্দিষ্ট নিয়মে। আমি সময়ের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছি। কী সাক্ষী দেব আমি ভবিষ্যতের কাছে? একটাই কথা বলতে পারি, আমি ভালোবেসেছিলাম। প্রতিদান পেয়েছি কী পাইনি এটা আর তুলে লাভ কী। আমার কাজ আমি করেছি। পেছন ফিরে তাকাইনি। একটা কথা আছে না, পেছনে যা রেখে এসেছ তা তোমার অতীত নয়, তোমার অভিজ্ঞতা, দুঃখ-কষ্ট ও যন্ত্রণার ইতিহাস মাত্র। জগতে যা কিছু দেখ তার একটা বিবরণ তুমি তোমার পছন্দমত লিখেছ, ভালো কথা। না লিখলেও কারও কিছু কি এসে যেত? তুমি কবিতা লিখেছ কেন? এজন্য যে তুমি সত্যকে স্বপ্নে মিশ্রিত করতে চেয়েছিলে—এ কাজটি তুমি কমবেশি করে গেছ এবং সেখানে তুমি চাও বা না চাও তোমার বিপরীতে দাঁড় করিয়েছ এক সঙ্গিনীকে। এইতো তোমার সৃষ্টি। পরিমাপ করতে গেলে অতি সামান্য ব্যাপার। কিন্তু যেহেতু তুমি কবি, সে কারণে সত্য ও মিথ্যায়, কল্পনায় ও বাস্তবে তুমি যা ধরতে চেয়েছিলে সেটা নিঃসন্দেহে ছন্দ, গন্ধ, মিল এবং শেষ পর্যন্ত এক আকাশের দিকে উত্থিত প্রার্থনা। এগুলো তুমি মোটামুটিভাবে করে গেলেও তোমার মধ্যে আছে এক অতৃপ্তি। এই অতৃপ্তি নিয়ে তোমার সঙ্কোচ করতে হবে না, মানুষমাত্রই অতৃপ্ত। সে বহু বছর ধরে সুখাদ্য, সুপেয় কঠিন ও তারল্য পর্যায়ক্রমে গলাধঃকরণ করে যাচ্ছে। এতে কি তোমার পেট ভরেছে? বলতো কত হাজার বছর ধরে খাচ্ছ? কিন্তু তোমার কি ক্ষিধে মিটেছে? যদি না মিটে থাকে তুমি তো তোমার খাওয়া বন্ধ করবে না। ভোগ-লালসালিপ্ততা কখনও মানুষ বন্ধ করতে পারে না। সে সহস্র বছর খেয়ে ভাড়ার উজাড় করেছে। তবু তার আশ মেটেনি। তবে একটা কাজ সে করেছে। সেটা হলো বারে বারে কবি হয়ে জন্মেছে। শব্দে গন্ধে অনন্তের গান সে রচনা করেছে। সে সুখের মধ্যে বিচ্ছেদের কল্পনাকে অশ্রুজলে সিক্ত করেছে। সে তিক্ততাকে, রিক্ততাকে বুকে জড়িয়ে ধরে অকারণে কেঁদেছে। বারণ মানেনি। সে শুধু একটাই কথা বলতে জগতের কানকে ঝালাপালা করে দিয়েছে। আর সে কথাটির বিষয়বস্তু হলো তার নিজের দেয়া নাম অনুযায়ী প্রেম। আমরা এই প্রেমের ইতিহাসকে বার বার রচনা করি, রটনা করি এবং ঘটনায় পর্যবসিত করি। আমরা ট্র্যাজেডির জন্ম দিই। মানুষ প্রথম যে জায়গা থেকে বিভিন্ন ভাষায় আলাদা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল সেই শহরটির নাম ছিল বাবেল। বাবেল শব্দের অর্থ হলো বিচ্ছেদ। এই বাবেল থেকেই বাইবেল শব্দের উত্পত্তি হয়েছে। বাইবেল হলো মহাবিচ্ছেদের কাহিনী।
লেখক : কবি

যাহা পাই তাহা চাই না

আলী হাবিব
কথায় বলে, 'সে কহে বিস্তর মিছা, যে কহে বিস্তর।' কিন্তু কথা না বলেও তো থাকা যায় না। কথা বলতে না পারলে বাঙালির বদহজম হয়ে যায়। বাঙালির অতীত আছে, বাঙালি অতীত নিয়ে কথা বলে। বাঙালি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। স্বপ্নও দেখে। সেই স্বপ্ন কখনো দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। তাই বলে স্বপ্ন দেখা বন্ধ নেই। বন্ধ নেই স্বপ্ন দেখানো। এটা পেলে ওটা দেব, গাড়ু পেলে লোটা দেব- এমন হাজারো স্বপ্নের ফুলঝুরি। কেউ কাউকে ভালো রাখছে। কেউ কাউকে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। দিন যাচ্ছে এভাবেই।
ভবিষ্যতের কথা বলতে পারা কম যোগ্যতার ব্যাপার নয়। এই যোগ্যতা সবার থাকে না। বাঙালির আছে। বাঙালি আশা ও আশঙ্কার কথা সমানভাবে বলতে পারে। জমানা খুব উর্বর। 'যেখানে দেখিবে ছাই', সেখানেই উড়িয়ে দেখার ব্যাপারে বাঙালির জুড়ি নেই। বাঙালি সব পারে। আজ যাকে উদ্ধার করে ছাড়ছে, কাল আবার গলা ছেড়ে তারই কেত্তন গাইছে। সব কিছু পেছনে ফেলে একই মিছিলে 'মানি না মানব না' আর 'মানতে হবে মেনে নাও' স্লোগান দিচ্ছে। এ বলছে 'মানতে হবে মেনে নাও', ও বলছে 'মানছি না মানব না'। সালিস সবাই মানতে রাজি, তবে তালগাছটা যে যার মতো করে চাইছে। একটুকু জমি ছাড়তে রাজি নয় কেউ। একটু ছাড় না দিলে চলবে কেন? গ্লোবাল মার্কেটিংয়ের যুগে এটা হচ্ছে ছাড়ের দুনিয়া। ছাড় দিয়ে মাল ছাড়াতে হয়। 'দেবে আর নেবে'- এই তত্ত্বে বিশ্বাসী না হয়ে কেবল না-মানার স্লোগানে দিন পার করে দিলে তো চলবে না। 'মানি না মানব না' কিংবা 'মানছি না মানব না'- এই দুই পক্ষের না মানামানিতে পাবলিকের জীবন অনেক সময় অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে ভাবতে হবে। পাবলিকের জীবন নিয়ে কে ভাবছে, ভাই। সেই তো 'থোড় বড়ি কলা, কলা বড়ি থোড়।' পানসে একঘেয়ে জীবন। একদিকে ওপরে ওঠার ব্যাকুলতা। এই সামনে যাই যাই অবস্থা। পেছন থেকে টানছে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ। বাজারে গিয়ে কম দামের জিনিস খুঁজতে খুঁজতে জীবনটাই কমদামি হয়ে গেল। অথচ একটাই মাত্র জীবন। ঘেন্না উগরে দিতে দিতে জীবনের ওপরই ঘেন্না ধরে গেল। ঘেন্না উগরে দেওয়া থামছে না। দেখতে যখন পারি না, তখন দেখে নিতে সমস্যা কোথায়? যে যার মতো করে দেখে নিলেই ল্যাটা চুকে যায় বলে মনে করা হচ্ছে। এই ঘেন্না উগরে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আবার দেশপ্রেমের মিশেল রয়েছে। কে কার চেয়ে বড় দেশপ্রেমিক, সেটা প্রমাণের জন্য সবাই প্রাণান্ত। নিজেকে দেশপ্রেমিক প্রমাণ করতে চাইলে অন্যের দিকে ঘেন্না উগরে দিতে হবে। বিষদাঁত দেখাতে হবে। কামড়ে দেব, কামড়ে দেব- এমন একটা ভাব দেখাতে হবে। ভয় দেখিয়ে জয় করার চেষ্টা। সব বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। আন্দোলন কত প্রকার ও কী কী- উদাহরণসহ বুঝিয়ে দেওয়ার হুমকি তো আছেই। ওদিকে আরেকজন দেখাচ্ছে ইরেজ করে দেওয়ার হুমকি।
যদি প্রশ্ন করা হয়, কী বন্ধ করবেন? উত্তরটা কী হবে? আগে আধপেটা খেতাম, এখন জুটছে কোনো রকমে। বন্ধ করবেন কী? আগে দোকানে গিয়ে নিয়ন আলোয় জামাকাপড় কিনে ঠকে আসতাম। এখন 'রেলিং ব্রাদার্স' কিংবা 'ভ্যান প্লাজাতে'ই স্বস্তি। বন্ধ করবেন কী। আগে মাসে অন্তত একবার বন্ধুদের ডেকে বাড়িতে খাওয়াতাম। সন্তানের জন্মদিনে আনন্দ করতাম। এখন ছোট একটা গিফট কিনে চোরের মতো সেরে ফেলছি। মধ্যবিত্ত বলে কথা! হুট করে একটা কালচার তো বন্ধ করে দিতে পারি না। চালিয়ে যাচ্ছি। আগে বছরে অন্তত একবার বাইরে কোথাও খেতে যাওয়া হতো। বাজে খরচ আর কত করা যায়। পাবলিক হয়ে জন্মেছি শাটল ককের মতো অদ্ভুত এক ভাগ্য নিয়ে। এদিকে গেলে ও মারছে, ওদিকে গেলে এ মারছে। আমার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। সবাই আমার অভিভাবক। শিশুরা যেমন অভিভাবকের এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়, আমাদের মতো পাবলিকের অবস্থা ঠিক সে রকমই। আমরা এই অভিভাবকদের এক্সপেরিমেন্টের শিকার। সবাই আমাদের নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছে। সেটা করতে গিয়ে আমরা যে মার খাচ্ছি, মার খেতে খেতে আমাদের জীবন যে শুকিয়ে গেল, এটা কাউকে বুঝিয়ে ওঠা গেল না। আমরা যেন খেলার সামগ্রী। এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ। জীবন বটে!
দুনিয়া কোথায় গেছে, সে হিসাব নেই। বাঙালি মেয়েরা পর্যন্ত এভারেস্টের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে ফিরে আসছে। আর আমরা এখানে বসে একজন আরেকজনকে বিষদাঁত দেখাচ্ছি। একজন আরেকজনের দিকে ঘেন্না উগরে দিচ্ছে। কে কেমন করে ঘেন্না উগরে দিচ্ছে? ওই যে, 'মানি না মানব না'। কে মানবে আর কে মানবে না, অনেক সময় সেটা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এ মানলে যে ও মানবে না, ও মানলে যে এ মানবে না- এটা এখন স্পষ্ট। 'মানামানিতেই উঠেছে নাভিশ্বাস'। কে দেখছে সেটা? আমরা দেখছি। কী দেখছি? স্বপ্ন দেখছি। কবিরা স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখান। কবি নির্মলেন্দু গুণও স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন। স্বপ্ন দেখতে ও দেখাতে গিয়েই তিনি লিখেছিলেন, '...দিন আসে ঐ মাভৈ মাভৈ'। এই দিন কি আমাদের স্বপ্নের দিন? যেমন স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই স্বপ্ন কি পূরণ হবে আগামী দিনে? তেমন হলে তো বেশ হতো।
আহা, আমাদের স্বপ্নের দিন! সেই সুনীল লিখেছেন, '...আমার পিঠে হাত রেখে বাবা বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও.../আমাদের দেখা হয়নি কিছুই'। কবিতার সঙ্গে আমাদের দেখার মিল হবে না। কবিতার মতো জীবন তো আর আমাদের নয়। নয়, সেটাই বা বলি কেমন করে? এখনো তো আমাদের অনেকের জীবনে ঝলসানো রুটির বাস্তবতা গেল না। তার পরও আমাদের স্বপ্ন দেখা ফুরায় না। আমাদের কল্পনার জগৎজুড়ে এক সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। ভয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এত দিন তো কেবল স্বপ্নভঙ্গই হলো। আমরা এত দিন ধরে যা চেয়েছি, তা কি পেয়েছি? যা পেয়েছি তা কি চেয়েছি? এই পাওয়া না-পাওয়া, চাওয়া না-চাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে সব কেমন গুলিয়ে যায়।
যাকগে, না হয় স্বপ্ন দেখতে দেখতেই জীবন পার করে দেবে বাঙালি। কিন্তু ওদিকে ঝোপের আড়ালে কে যেন উঁকি দিচ্ছে, সেটা কি দেখতে পাচ্ছেন কেউ? আচ্ছা, ওটা কী? ফেউ, নাকি আর কেউ? ওটারও কেমন বিষদাঁত দেখা যাচ্ছে যেন!
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

রবিবার, ৩ জুন, ২০১২

মহাযোগী বাবা লোকনাথ


বিষুষ্ণপদ ভৌমিক
জমিদার ও বিত্তবানরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন মানুষকে আলোকিত করার উদ্দেশ্যে। একইভাবে মহাযোগী বাবা লোকনাথের জীবন ও দর্শনের আলোতে মানবকল্যাণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কর্মযজ্ঞ প্রসারণের প্রয়াস চলছে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, 'মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য ঈশ্বর লাভ।' ঈশ্বর লাভ করতে হলে মানুষকে মনুষ্যত্ব অর্জন করতে হয়। যেমন_ পবিত্রতা, অহিংসা, অচৌর্য, সত্য ও সংযম। পবিত্র না হলে কোনো কিছুই ধারণ করা যায় না। যেমন_ হিংসা মানুষকে ধ্বংসের রাস্তায় নিয়ে যায়। তাই অহিংসুক হওয়া যেমন_ পরদ্রব্যে লোভ না করা। আবার সত্য ও সংযমের অনুশীলন করে নিজের জীবনে প্রয়োগ_ এভাবে মানুষের ভগবৎকৃপাপ্রাপ্ত হয়ে দুর্লভ মনুষ্যজন্ম সার্থক করা। আমরা জানি, সম্পদ সংকট তৈরি করছে। তারপরও সম্পদের পেছনে ছুটছি। ছুটছি অপরাধ জগতে, যে জগৎ থেকে সম্পদ জুগিয়ে সম্পদশালী হবো। তারপর সুখের সাগরে ভাসব_ এ হলো জগৎসংসারে সুখে থাকার মোহনিদ্রা। এ অবস্থায় দেহপাত হলে তাকে আবার জগতের অন্ধকারে চলে আসতে হবে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার।
শ্রীশ্রী গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার সখা অর্জুনকে বলেছিলেন_ তুমি যোগী হও। তাহলেই তুমি আমাকে জানতে পারবে। বলেছিলেন, তুমি বৈরাগ্য অভ্যাস কর। তাহলে অন্তিমকালে আমাকে স্মরণ করতে করতে মুক্ত হয়ে যাবে। মানুষ শান্তি চায়, আনন্দ চায়। চায় সুখে বসবাসের ঠিকানা। কেন আজ আমরা সুখ ও শান্তির ঠিকানা হারিয়ে স্মৃতিভ্রম হয়ে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাচ্ছি?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোমের আলো জ্বালিয়ে অনেক ভাবনার মধ্যে অনেকক্ষণ ডুবে ছিলেন_ কী বিষয়ে লিখবেন? অনেক সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় মোমের আলো নিভে গেল। দেখা গেল, পূর্ণিমার সি্নগ্ধ আলোয় ধরণী অপূর্ব সাজ নিয়েছে। ভাবনার আকাশে অনেক বিষয়ে লেখার উপাদান পাওয়া গেল। মানুষের মধ্যে যে ক্ষুদ্র অহংবোধ তার নাশ হলে দিব্যতার উদয় হয়। ছোট মোম কোনো ভাবের সৃষ্টি করতে পারেনি।
আমরা চাই অপরাধপ্রবণতার সীমানা। রাতারাতি কেউ পবিত্র জীবন লাভ করতে পারে না। তার জন্য চাই সত্য ও সুন্দর জীবনবোধের নিরলস প্রয়াস। সৎ বৃত্তির অনুশীলনে পবিত্র জীবন ধারণ করে মানুষ সুস্থভাবে জীবনযাপন করতে পারে। সৎ বৃত্তির অভাবে জীবনে মরুময় পরিবেশ নেমে আসে।
মানুষ কী পরিমাণ সম্পদ আহরণে সুখ-শান্তির ঠিকানা পাবে জানে না। শুরু হয় নিরলসভাবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের দুর্বার সংগ্রাম। পরিশেষে সম্পদ সংকট তৈরি করে জীবনকে বিষবৃক্ষে রূপান্তরিত করে চলেছে_ এ হলো আধুনিক সভ্যতা অর্জনের অনৈতিক প্রতিযোগিতা। সমষ্টি স্বার্থের প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বার্থকে সংরক্ষণ করতে হবে, তবেই সংসার ও সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। যোগেশ্বর বাবা লোকনাথ বলেছেন, 'সৎ কর্মে যোগ হয়, অসৎ কর্মে বিয়োগ হয়।' এভাবে সৎ বৃত্তির অনুশীলনে মানুষ দেবতায় উন্নীত হতে পারে।
বিশ্বকবি রবিঠাকুরের কথায়_ আমি জেনেশুনে বিষ করেছি পান। আজ যারা দুর্নীতি করছেন তারা জেনে-বুঝেই করছেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? এ পথে যারা সম্পদের পাহাড় গড়ছেন তারা কিন্তু ভোগ করতে পারছেন না। কারণ তারা এতক্ষণে দুরারোগ্য বিচিত্র রোগে আক্রান্ত। এভাবে খালি হাতে আসা মানুষ খালি হাতেই বিদায় নেয়।
সত্যাশ্রয়ী সংসারী ব্যক্তি অনিত্যবস্তু ও নিত্যবস্তু পরখ করে নিত্যবস্তুতে আকর্ষিত হয়ে ঈশ্বরানুভূতি লাভ করে স্বাভাবিক জীবন নির্বাহ করে চলেছে। কৃতকর্মের শুভ ও অশুভ ফলাফল আমাদের অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সর্বময় ব্রহ্মর্ষি বা লোকনাথকে সমাজের দুস্থ, আতুর-অসহায় মানুষের মধ্যে দর্শন ও তাদের শিবজ্ঞানে সেবার জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সেবামূলক ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন, পরিচালনা এবং সেবাধর্মকে সাধনার মূল স্তম্ভরূপে গ্রহণ করা প্রয়োজন। মহাযোগী বাবা লোকনাথের ১২২তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে জানাই শ্রদ্ধার্ঘ্য।

বিষুষ্ণপদ ভৌমিক :সাধারণ সম্পাদক শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী
আশ্রম ও মন্দির

শনিবার, ২ জুন, ২০১২

বড় হয়ে পুলিশ হব!


জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান। এখানে প্রায় সময়ই আসি। কিছু মনোরম ছবি চোখ আর ক্যামেরায় বন্দী করে বাড়ি ফিরি। এখানকার গোলাপ বাগান দুটি অসাধারণ। সবুজ গোলাপ এখানেই প্রথম দেখেছি। এখানে আছে চমৎকার একটি পদ্মপুকুর, আছে শাপলাপুকুর আর উদ্যান আলো করা গাছগাছালি। এখানকার বাঁশবাগানটি অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে। তা ছাড়া এই গ্রীষ্মে আগুনলাল কৃষ্ণচূড়া আর পেল্টোফোরাম কী অসাধারণ করে তুলেছে উদ্যানটিকে, দেখে চোখ ধাঁ ধাঁ খাওয়ার জোগাড়। এখানে অনেক দর্শনার্থী আসে প্রতিদিন, ছুটির দিনে যেখানেই তাকান শুধু মানুষ আর মানুষ। তবে এখানকার গাছপালা নষ্ট করা বা ফুল ছেঁড়ায় তাদের কোনো আগ্রহ নেই। এটা যেকোনো উদ্যানের জন্য খুব সুখকর একটা দিক। উদ্যানের কর্মীরাও বেশ তৎপর। তবে ইজারাদারদের তৎপরতা খুব কম, তাঁরা উদ্যোগী হলে উদ্যানের পরিবেশটা ভালো করা যেত। শুধু পরিবেশগত কারণেই জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের অনেক বদনাম। তবু দর্শনার্থীর কমতি নেই। বিনোদনের খুব অভাব এ দেশে, সে জন্য দেশের অধিকাংশ শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষার যেকোনো দিন, বিশেষত ছুটির দিনে এখানে ছুটে আসে।
উদ্যানের ভেতরে হকারদের ঢোকা নিষেধ। তার পরও একধরনের কর্মজীবী মানুষের একটা বলয় গড়ে উঠেছে এখানে, যারা দর্শনার্থীদের ফুট-ফরমায়েশ শোনে। কেউ বা আবার চা-সিগারেট-চিপস-চানাচুর ইত্যাদি বিক্রি করে থাকে। 
এবার বসন্তে মাধবীলতার ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। খুব যত্ন করে ছবি তুললাম মাধবীলতার, পাশের গ্লিরিসিডিয়া আর টেবেবুইয়াও বাদ গেল না। এরপর ছবি তুলি ক্যাকটাস ছায়াতরুর ভেতরে। আচ্ছামতো ছবি তোলা শেষে বের হয়ে বাইরের উদালের ছবি ক্লিক করতে গিয়ে ভিউ ফাইন্ডারে ১০-১২ বছরের একটি ছেলে ধরা পড়ে। ছেলেটি তখন টাকা গুনতে গুনতে সামনে এগিয়ে চলেছে। ক্যামেরা ছেলেটির ওপর স্থির হয়ে বেশ কবার ক্লিক করে ওঠে। ছেলেটা দৌড়ের ওপর ছিল, তবু আমার ডাক শুনে কাছে আসে। নাম জানতে চাইলে বলে; আল-আমীন। আমি ব্যাগ থেকে কাগজ-কলম বের করে লিখলাম আলামিন। সে আমার লেখা উঁকি মেরে দেখে সংশোধন করার কথা বলে, ‘ভাইজান, বানান ঠিক করেন। আমার নাম আল-আমীন, আলামিন না।’ আমি বিস্ময় নিয়ে তাকাই। এর মধ্যে সে গড়গড় করে বলে চলেছে, ‘আমি নাম লিখতে পারি, কল্পনা বানান করতে পারি। নার্সারিতে পড়ি, আমার স্কুলের নাম সোহাগ, স্বপ্নধারা পাঠশালা।’ তারপর সে নিজেই বলে তার বাসা মিরপুরের ১০ নম্বরের কাছের দুয়ারীপাড়ায়। রাস্তায় চলতে প্রায় সময়ই আপনারা সদরঘাট টু দুয়ারীপাড়া নামের বাস দেখে থাকবেন। সেই দুয়ারীপাড়ায় কখনো যাওয়া হয়নি। আমি দুয়ারীপাড়া নিয়ে ভাবতে ভাবতে শুনতে পাই, ছেলেটি তখনো বলে চলেছে, ‘বাবা অসুস্থ, কাম করতে পারে না। মা বাসাবাড়িতে কাম করে। আমরা এক ভাই এক বইন। বইনের নাম কুলসুম। আর কিছু ভাইজান?’
এবার ছেলেটির দিকে তাকাই, উচ্ছল প্রাণবন্ত একজন। দেখে মনে হলো অফুরান প্রাণশক্তি তার ভেতর। হুম, কী করিস এখানে? ‘স্যার, মাইনসের কাছে ট্যাকা চাই। ট্যাকা চাইলে মাইনসে না করে না। আমি ছোট তো, আদর করে। মাঝে মাঝে ট্যাকার লগে খাইতে দেয়। খাবার না দিলে ট্যাকা দিয়া কিনা খাই। এই ধরেন শিঙারা, চা, বিস্কুট। প্রতিদিন আমি স্কুল ছুটির পর এই হানে আহি। বিকালবেলা যাইগা।’ টাকা চাইতে লজ্জা করে না? ‘লজ্জা কিসের, ট্যাকা তো আর খালি খালি দেয় না, আমি হেগোর অনেক কাম কইরা দেই!’
আজ কত টাকা পেলি?
‘আজ একটু বেশি পাইছি—১২০ ট্যাকা, আরও পামু। তয় পইত্যেক দিন এমুন পাই না। কোনো দিন এক শ ট্যাকা, আবার কোনো দিন নব্বই ট্যাকার মতন হয়।’
টাকা দিয়ে কী করবি?
‘নানির পান শেষ, নানির লাইগা ১০ ট্যাকার পান কিনুম। আমি একটা আইসক্রিম খামু, কুলসুমের শরীরডা ভালা না। আল্লাহ যেন তার শরীর ভালা কইরা দেয়, হের লাইগা ফকিররে পাঁচ ট্যাকা দিমু, বাকি ট্যাকা মায়রে দিমু।’
তুই কি এমন চেয়ে চেয়ে খাবি সব সময়?
‘না, ভাইজান। কইছি না আমার বাপ অসুস্থ। সংসার চলে না, তাই তো পার্কে আহি। আমি তো ছোট, কাজ করতে পারি না। যহন কাজ করতে পারুম করুম। তা ছাড়া আপনেরে তো কইলাম না, মাইনসে আমারে এমনি এমনি ট্যাকা দেয় না, কত কী কাম যে কইরা লয় আপনে বুজবেন না। শোনেন, ভাইজান, এই যে আপনে খারাইতে কইলেন খারাইলাম, এইটাও একটা কাম! পড়তে আমার খুব ভালা লাগে। স্কুলে আমার রোল নম্বর ৮। আমি পড়ালেখা কইরা অনেক বড় হমু। আমি বড় হয়া পুলিশ হমু।’
পুলিশ হবি কেন?
‘হেগো সক্কলে ডরায়।’
এই জন্য তোর পুলিশ হওয়া লাগব?
‘লাগব, ভাইজান। যে বাড়ি মারে, প্রাণডা বাইর অইয়া যায়।’
আল-আমীনের কথা শুনে আমার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কথা মনে পড়ে। একদিন তাঁর স্কুলের শিক্ষিকা ডারমাওয়ান তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, ‘তুমি বড় হয়ে কী হবে।’ ছেলেটির জবাব ছিল, ‘আমি বড় হয়ে প্রেসিডেন্ট হব।’ শেষ পর্যন্ত ওবামা প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আল-আমীন কী হতে পারবে শেষ পর্যন্ত!
ফারুখ আহমেদ

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ


  • আলোকচিত্র: নিজামুদ্দিন
  • প্রাণেশ সমাদ্দার
    প্রাণেশ সমাদ্দার
1 2 3
অদিতি ফাল্গুনী | তারিখ: ০১-০৬-২০১২
বাংলা সাহিত্যের একটু মনোযোগী পাঠক মাত্রই আঠারো শতকের মাঝামাঝি থেকে বিশ শতকের শুরু অবধি বাংলা কথাসাহিত্যে হিন্দু-ব্রাহ্ম মতাদর্শিক সংঘাত, হিন্দুসমাজের নানাবিধ পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে সংস্কারবাদী আন্দোলন হিসেবে ব্রাহ্মধর্মের উত্থান আবার সমাজের বিপুলসংখ্যক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে না পারা কি ব্রাহ্মসমাজের নিজের ভেতরেই মত ও পথের নানা দ্বন্দ্বে কালপ্রবাহে এ ধর্মের বিলুপ্তি প্রভৃতি বিষয়ে অল্প-বিস্তর অবগত। তবে আজও আমাদের দেশের অনেক সাধারণ মানুষই ‘ব্রাহ্মধর্ম’ বিষয়টি সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত নন। অনেকেই ‘ব্রাহ্ম’ ও ‘ব্রাহ্মণ’ গুলিয়ে ফেলেন। অথচ এ দুইয়ের মধ্যে যে প্রবল ঝগড়া! বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধানতম কবি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশ যে ব্রাহ্ম ছিলেন, তা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিষবৃক্ষ উপন্যাসে মদ্যপ দেবেন্দ্রকে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী হিসেবে দেখান এবং সেই সঙ্গে হিন্দু বিধবা নারীর পুনর্বিবাহের প্রবক্তা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও দু কথা বলতে ছাড়েন না। রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসে বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে প্রতিপালিত আইরিশ যুবক ও কট্টর হিন্দু জাত্যভিমানসম্পন্ন গোরার সঙ্গে ব্রাহ্মকন্যা সুচরিতার প্রেম হলেও ধর্মীয় ব্যবধানে ভেঙে যেতে চায় সেই প্রেম। শরৎচন্দ্রের একাধিক উপন্যাসে (পরিণীতা, দত্তা ও গৃহবিবাদ) এই হিন্দু-ব্রাহ্ম মতাদর্শিক সংঘাতের পাশাপাশি আন্তসম্প্রদায় প্রণয়-পরিণয়ও বর্ণিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের বাসমতী উপাখ্যান নামের উপন্যাসে দেশবিভাগের ঠিক আগে আগে ‘বাসমতী’ নামের আড়ালে বরিশাল শহরের একদিকে হিন্দু-মুসলিম আন্তসম্প্র্রদায় চাপা টেনশন, নায়কের নির্জন কারুআকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি সেখানকার ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্মের ক্ষয় পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। 

ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন ও বঙ্গীয় রেনেসাঁর সংক্ষিপ্ত ইতিকথা
১৮২৮ সালের ২০ আগস্ট উত্তর কলকাতায় ফিরিঙ্গি কমল বোসের বাসায় প্রথম ‘ব্রাহ্ম সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। এ দিনটিকে ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীরা ‘ভাদ্রোৎসব’ হিসেবে পালন করে থাকেন। ১৮৩০ সালে বাংলার মোগল নিজামতে চাকরির অপরাধে সামাজিকভাবে একঘরে হওয়া দুই জমিদার ও কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের দুই প্রতিভূ রাজা রামমোহন রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার চিৎপুর সড়কে (বর্তমানে যেখানে রবীন্দ্র সরণি) ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ সালের ২৩ জানুয়ারি অথবা ১১ মাঘ প্রায় ৫০০ ব্রাহ্মণ এবং একজন ইংরেজ ভদ্রলোকের উপস্থিতিতে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজ’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। এ দিনটি ব্রাহ্মসমাজে আজও ‘মাঘোৎসব’ হিসেবে উদ্যাপিত হয়। মূলত রাজা রামমোহন রায় ও দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বেই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন সূচিত হয়েছিল। তৎকালীন হিন্দু বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের কৌলীন্য প্রথা, শিশুবিবাহ, কঠোর পণপ্রথা, শিশুবৈধব্য, নারী অশিক্ষা, জাতিভেদ বা বর্ণাশ্রমসহ অসংখ্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনই সহস্রাব্দের শাস্ত্রীয় নিগড়ে আটকে পড়া বাঙালি হিন্দুসমাজের অতিদ্রুত সামাজিক ও শিক্ষাগত অগ্রগতি অর্জন সম্ভব করে তুলেছিল। বাঙালি হিন্দুসমাজের এই অগ্রগতি প্রভাবিত করে তোলে অবাঙালি হিন্দুসম্প্র্রদায়সমূহ ও বাঙালি মুসলিম মানসকেও। ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য শিক্ষা, নারীশিক্ষা, প্রাপ্তবয়সে বিয়ে, অর্থকরী কাজের প্রয়োজন, নগরায়ণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সক্ষম হয় গোটা ভারত উপমহাদেশ। উইকিপিডিয়ায় তাই আধুনিক ভারত উপমহাদেশকে এই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনেরই ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলনের মূল প্রবক্তা রাজা রামমোহন রায় বেদ ও উপনিষদের সারাৎসার আত্মস্থ করে বাতিল করতে চেয়েছিলেন হিন্দুসমাজে প্রচারিত নানা দেব-দেবীর সাকার উপাসনা, একই সঙ্গে তিনি ইসলাম ধর্মের কোরআন-হাদিসও আয়ত্ত করেছেন। ইসলাম ধর্মের কঠোর একেশ্বরবাদিতা ও খ্রিষ্টধর্মের নানা জনকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। 
১৮৩০-এর নভেম্বরে রাজা রামমোহন রায় ইংল্যান্ডে যান এবং সেখানেই ১৮৩৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। হিন্দুধর্মের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এই ধর্মীয় আন্দোলনের সূচনা হলেও রামমোহনের অবর্তমানে রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ হিন্দুধর্মের একটি মৌলিক পশ্চাৎপদ প্রবণতা অর্থাৎ বর্ণাশ্রমের পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেন। যেমন, ব্রাহ্মসমাজের ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণ সব সদস্যই উপনিষদ পাঠ ও উপাসনাসংগীত শোনার অধিকার পেলেও তেলেগু ব্রাহ্মণদের সংস্কৃত ভাষায় বেদ পাঠ শুনতে পেতেন শুধু ব্রাহ্মণ বর্ণ থেকে ধর্মান্তরিত সদস্যরাই। রামমোহনের মৃত্যু হতে না হতেই ব্রাহ্ম সভার তেলেগু ব্রাহ্মণ সদস্যরা সাকার উপাসনা বা প্রতিমা পূজায় ফিরে যান। দেবেন্দ্রনাথ জমিদারির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সভার সদস্যসংখ্যাও কমে যায়। যাহোক, ১৮৩৯ সালের ৬ অক্টোবর দেবেন্দ্রনাথ ‘তত্ত্বরঞ্জিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে ‘তত্ত্ববোধিনী সভা’ নামে পরিচিত হয়। শুরুতে ঠাকুর পরিবারের ভেতর সীমিত থাকলেও দুই বছরেই ৫০০-এর বেশি সদস্য হয় এই সভার। ১৮৪০ সালে দেবেন্দ্রনাথ কঠোপনিষদ বাংলায় অনুবাদ করেন। বঙ্গীয় রেনেসাঁর অপর দুই পুরোধা ব্যক্তিত্ব অক্ষয় কুমার দত্ত ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও এই সভায় যোগ দেন। ১৮৫৫ সাল থেকেই অবশ্য ব্রাহ্মসমাজের ভেতরে প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল অংশের লড়াই পুনরায় শুরু হয়। 
বলা বাহুল্য যে রক্ষণশীল অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। কলকাতা ব্রাহ্মসমাজের অব্রাহ্মণ সদস্য কেশবচন্দ্র সেনকে দেবেন্দ্রনাথের পুত্র ও রবীন্দ্রনাথের সেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর খুব পছন্দ করলেও দেবেন্দ্রনাথের ক্রমাগত রক্ষণশীল অবস্থানে বিরক্ত হয়ে ১৮৫৯ সালে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তত্ত্ববোধিনী সভার সচিবের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে পদত্যাগ করেন স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথও। দেবেন্দ্রনাথের তৃতীয় পুত্র ও বিদ্যাসাগরের প্রিয় ছাত্র হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুর তত্ত্ববোধিনী সভার দায়িত্ব নেন। পিতার পক্ষে ও প্রগতিশীল কেশবচন্দ্র সেনের প্রতি আপন ভাই সত্যেন্দ্রনাথের সজোর সমর্থনে বিরক্ত হেমেন্দ্রনাথ কলকাতার বাইরেও ব্রাহ্মসমাজ প্রসারে উদ্যোগী হন। 

ঢাকায় ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা 
মুনতাসীর মামুনের ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (পৃষ্ঠা: ১৫৬, প্রথম প্রকাশ: জুন ১৯৯৩, অনন্যা প্রকাশনী) গ্রন্থ থেকে জানা যাচ্ছে যে ১৮৬৯ সালে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে ঢাকার ব্রাহ্মসমাজ মন্দির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। দোতলা এই স্থাপনার প্রধান আকর্ষণ হলো ৫৫ ফুট দীর্ঘ, ২২ ফুট প্রশস্ত ও ২১ ফুট উঁচু একতলার হলঘর। ১৮৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেশবচন্দ্র সেন নিজে উপাসনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এই মন্দির প্রতিষ্ঠায় স্বয়ং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ পাঁচ হাজার ৮৭৫ জন চাঁদা দিলেও বর্তমানে এই মন্দির দেখাশোনা করছে মাত্র তিনটি ব্রাহ্ম পরিবার। ২৫ মে শুক্রবার বিকেলে পুরোনো ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের নিকটবর্তী এই ‘ব্রাহ্মসমাজ মন্দির’-এ গিয়ে দেখি মন্দির তালাবদ্ধ। শুধু রোববার সন্ধ্যায় উপাসনা হয়। সেই উপাসনাতেও মানুষ প্রায় থাকে না বললেই চলে। কথা হলো ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের সাবেক আচার্য ও কমরেড প্রাণেশ সমাদ্দারের সঙ্গে। আশি পার হওয়া প্রাণেশ সমাদ্দার বর্তমানে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। তাঁর কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। প্রাণেশ সমাদ্দারের জীবনসঙ্গিনী মঞ্জু সমাদ্দার তাঁর স্বামীর বক্তব্য আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৩১ সালে। রবীন্দ্রনাথ এই মন্দিরে ১৯২৬ সালে এসে উপাসনা পরিচালনা করেছিলেন। আমিতো দেখি নাই। তবে আমার মা তাঁকে দেখেছেন। বর্ণাশ্রম আর পৌত্তলিকতায় হারিয়ে গেছে ব্রাহ্মধর্ম। মেয়েরা সব হিন্দু ছেলে বিয়ে করেছে। ব্রাহ্মধর্ম কিন্তু প্রগতিশীল। বিশেষ ধর্ম আইন ১৮৭২-এর আওতায় আমি হিন্দু-মুসলিম বা হিন্দু-খ্রিষ্টান কি মুসলিম-খ্রিষ্টান বিয়ে দিয়েছি। তবে খুব বেশি না। এমন দুই শ কি আড়াই শ বিয়ের আচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।’ 

শেষ কথা
ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন আজ প্রায় হারিয়ে গেলেও হারিয়ে যায়নি সমাজদেহের অভ্যন্তরে যে মৃত সঞ্জীবনী এই আন্দোলন ছড়িয়ে দিয়েছিল। এক শ কি দেড় শ বছর আগেও বাঙালি হিন্দু নারীর ব্লাউজ বা জুতা পরা, বাঙালি হিন্দু পুরুষের মুরগি বা পাউরুটি খাওয়া ‘বেহ্ম’, ‘খেরেস্তানি’ বা ‘মেলেচ্ছ’ আচার বলে যে গণ্য হতো তার বিবরণ রয়েছে খোদ শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেই। শিক্ষিত বা বই পড়া মেয়ে মানেই ব্রাহ্ম তরুণী! হিন্দু নারীর বিয়ে হয়ে যেত আট থেকে দশের ভেতরেই। শিক্ষার কোনো বালাই ছিল না তার। আর আজকের ভারত উপমহাদেশে কোটি কোটি হিন্দু-মুসলিম নারী-পুরুষের যে আধুনিক শিক্ষা ও আলোকায়ন সম্ভব হয়েছে, তা এই ব্রাহ্মধর্ম আন্দোলন ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভবপর হতো না।