শুক্রবার, ২২ জুন, ২০১২

হাতি আসুক রোহিঙ্গা খেদাও


হা সা ন হা ফি জ

শহরে বিদ্যুত্ নেই। বর্ষাকালেও ভ্যাপসা গরমে জান কাহিল। অতএব, ঘুরে আসা যাক বনাঞ্চল থেকে। কথাই আছে—জঙ্গল মে মঙ্গল হ্যায়। অরণ্যের নিবিড় নিভৃতি বড়ই নিরিবিলি। মানুষ হচ্ছে জগতের সবচেয়ে খতরনাক প্রাণী। বনের বাঘারা (মাসুম বাচ্চা হওয়া সত্ত্বেও) পর্যন্ত শান্তিতে থাকতে পারছে না এদের জ্বালায়। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসা হচ্ছে শাহরিক পরিবেশে। পাচার করলে উমদা লাভ।
আমাদের এবারের গল্প বনাঞ্চল নিয়ে। তবে বাঘ বর্জিত। পুরানকালে নাটকে নারী চরিত্র বলতে গেলে থাকতই না। দু-চারটি থাকলেও অভিনয় করতেন পুরুষরা। নারী চরিত্র বর্জিত নাটকের চাহিদা ছিল বেশি। আজকের নাট্যাংশে ব্যাঘ্রদের ঠাঁই নেই। নির্জলা গাছগাছড়া নিয়ে কায়-কারবার। কোনো কোনো দুর্মুখের মধ্যে খারাপ কিছু দেখবেন। তা দেখুন। আমরা মচকাব না। লাইক মহাজোট সরকার। আমরা ইতিবাচক অংশেই ঘুরপাক খেতে থাকব। আমরা বনের বারোটা বাজানো প্রকল্পের পক্ষে। জোরালো সব যুক্তি তুলে ধরব। মামলা না জিতার কোনো রাস্তাই নাই।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা। বারবাকিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সেখানে চলছে বনদখলের মহোত্সব। আইনে বসতি গড়ার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে। থাকুক। কে তোয়াক্কা করে। মাস তিনেক সময়েই বনের চিত্র পাল্টে গেছে। দিন বদলের তুফান বইছে না? বনাঞ্চল তো দেশের বাইরে নয়। ঝড়ঝাপটা তার গায়েও লাগবে। তিন মাসে এক হাজার ৩১২টি বাড়িঘর নির্মিত। আরও এক হাজার নির্মাণের প্রক্রিয়াধীন। মাশাআল্লাহ্। চমত্কার প্রবৃদ্ধি। ডাবল ডিজিট। এ প্রকল্প তো অর্থমন্ত্রী আবুল মাল অভিহিত ‘দুষ্টু শেয়ারবাজার’ না। এটা হলো “মিষ্টি দখলের প্রকল্প। ‘ইহা’ অনুসরণীয় মডেল।”
তিন দখলদার জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বন বিটের কর্মকর্তাকে মোটা উেকাচ দিয়ে তারা বনভূমি দখলে নেন। তারপর বাড়ি তৈরি। এই প্যাকেজের অনুঘটক এক মালি। তিনি বন বিটের লোক। এক বিট কর্মকর্তা মওকা দিচ্ছেন বনভূমি দখলের। মাগনা নয়। নীতি হচ্ছে ‘ফ্যালো কড়ি মাখো তেল’। পাঁচ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মালপানি খসালেই ব্যস। কাম সারা। গত ২৩ মে বড়ছড়া এলাকায় সংঘটিত ঘটনা বড়ই লজ্জার, নিন্দনীয়ও বটে। অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের কাছে একজন মাসোয়ারা তুলতে গিয়েছিলেন। রাশি খারাপ ছিল। মাসোয়ারা তো পানইনি, উল্টো গণপিটুনিতে সিধা হতে হয়েছে। কলিকাল আর কাকে বলে! রাবিশ!!
সেই বিট কর্মকর্তাকে ধরেছিলেন সাংবাদিকরা। যথারীতি অস্বীকার করলেন তিনি। নিয়মই তাই। বললেন, সংঘবদ্ধভাবে কিছু লোক বন দখল করেছে। তৈরি করছে বাড়িঘর। লোকবলের সঙ্কট আছে। সে কারণে এদের উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না। বিট কর্মকর্তার এই বক্তব্য/দাবি কতটা ন্যায্য, আমরা জানি না। সময়ে প্রমাণিত হবে। মহাস্বপ্নিল পদ্মা সেতু নিয়ে পানি ঘোলা কম হয়নি। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ দুর্নীতির। বাংলাদেশ সরকার সেই অভিযোগ প্রবলভাবে অস্বীকার করেছে। তারস্বরে প্রতিবাদ। শেষতক কী দাঁড়াল? যাহা রটে তাহা বটে। এক্ষণে ‘থলের বিড়াল’ বের হতে শুরু করেছে। কালা না ধলা বিড়াল, সেইটা অবশ্য বলা মুশকিল। লেটেস্ট খবর : পদ্মা সেতু প্রকল্পে চার কোটি ৭০ লাখ ডলার বরাদ্দ ছিল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য। এ নিয়েই কালো বিড়ালের লাফঝাঁপ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা হয়। এসএনসি—লাভালিন সেই প্রতিষ্ঠানের নাম। ১০ শতাংশ অর্থ কমিশন চাওয়া হয় তাদের কাছে। চাইলেন কারা? যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ তিন কর্মকর্তা। সাবেক মন্ত্রীও আছেন।
পদ্মা সেতু রাজকীয় ব্যাপার। চুনোপুঁটিদের বিষয় না। আপাতত বন-জঙ্গল নিয়েই থাকি। বনখেকোদের সপক্ষে আছেন। যুক্তি খাড়া করণের চেষ্টা করা যাক। সেই যুক্তি খোঁড়া হবে, সন্দেহ নাই। হোক না! নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো। মাজুল কতিপয় যুক্তি এখানে দাঁড় করানোর (বাঁশ দিয়ে ঠেকনা মার্কা) অপচেষ্টা। বন দখলদাররা বেশ করেছে। তাদের ‘অবৈধ’ বলাটা ভালো দেখায় না। শরম লাগে। ছয় ঘোড়াঅলা মইনুদ্দিন, মার্কিন সিটিজেন ফখরুদ্দীনের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি অবৈধ? সেটা তো বর্তমান সরকার বলে না। শরমায়। কানাকে কানা বলতে হয় না। দুঃসাহস করে বলে ফেললে মহাবিপদ। ১১ হাজার ভোল্ট। কান টানলে মাথা চলে আসে যে!
আজাইড়া বনপ্রেমিক হয়ে লাভ কী? ওতে কি দুটো পয়সা আসে পকেটে? জাতীয় আবাসন সঙ্কট প্রকট হয়ে উঠছে দিন দিন। হাজার হাজার বাড়িঘর লাগবে। হলে বহু লোকজনের মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে। তারা বন-জঙ্গল কেটেকুটে সাফ করবে। সবজি আনাজ ফসল লাগাবে। সমৃদ্ধ হবে কৃষি খাত। বনের হিংস্র জীবজন্তু মেরে কেটে জনজীবনের নিরাপত্তা দেবে। বেহুদা জীব-জানোয়ার বাঁচিয়ে লাভ কী? তারা মানুষখেকো। অন্য প্রাণীও উদরস্থ করে। বাঘে মানুষ খায়, জখম করে। বন্য হাতির গোদা পায়ের পাছড়া-পাছড়িতে পাবলিক অতিষ্ঠ। এরাও কিন্তু খুনি। মানুষ মেরে ক্ষান্তি। ফি-বছর ফসল নষ্ট করে এন্তার। এসব দর্পিত ঐরাবত আমদানি হয় আমাদের পিয়ারের দোস্ত ইন্ডিয়ার অভ্যন্তর থেকে। বিনা ভিসায়, বিনা পাসপোর্টে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আমাদের কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে মেরে ফেলে। ঝুলিয়ে রাখে কাঁটাতারে। বিএসএফ কিন্তু মারকুটে হাতি বাহিনীকে আটকায় না। সেই মুরোদও অবশ্য নাই ওদের। বাংলাদেশ আজ বিপন্ন আর্ত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে। পুশ ব্যাক করছে। যারা ঠেকাচ্ছে, তারা কিন্তু দাদা দেশের বন্য হাতি দেখলে লেজ গুটিয়ে পালায়। কী বৈপরীত্য সেলুকাস!
hasanhafiz51@gmail.com

তালা-চাবির কারিগর


সুমন
সুমন
মুক্তাগাছা শহরে এসে যখন পৌঁছালাম, তখন সূর্য ঠিক মাথার ওপর। মাঝদুপুরেও মানুষের আনাগোনায় জমজমাট হয়ে আছে শহরের বাজারটি। খাবারের দোকানগুলোয় দারুণ ভিড়। অনেক খোঁজাখুঁজি শেষে পাওয়া যায় মুক্তাগাছার বিখ্যাত মণ্ডার দোকান। গোপাল পালের বিখ্যাত মণ্ডা দিয়েই হবে দুপুরের পেটপুজো—এমনটা ঠিক করেই মাঝদুপুরে মুক্তাগাছায় আসা। 
কিন্তু তা হয় না। শুধু মণ্ডা খেয়ে দুপুর পার করা মুশকিল। অনেক কিছু খাওয়ার পরও ভাত না খেলে মনে হয়, দিনটা বুঝি উপোসেই গেল। সস্তা, ভাঙাচোরা একটা হোটেলে গিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম গরম ভাত, কুমড়ো ভাজি আর কচি মুরগির রান চিবোতে গিয়েই পরিচয় হয় সুমনের সঙ্গে। ভালো খাবারের দোকানের হদিস দিয়ে তিনি সাহায্য করছিলেন আমাদের। সুমন তালা-চাবির কারিগর। বাজারের ফুটপাত নয়, একদম ঠিক পথের ওপর মাদুর বিছিয়ে বসে তিনি করেন তাঁর ব্যবসা। পথ দিয়ে যানবাহন গেলেও তাঁর দোকানের পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। এ পথের তিনিই রাজা। 
ব্যবসাটা বহু দিনের। এলাকায় ভালো ছেলে বলে পরিচিত, তাই পথের মাঝখানে বসা দোকান নিয়ে নেই কারও কোনো অভিযোগ। ‘গরিব মানু। আমারে সবাই ভালা পায়। ভালা জায়গায় দোহান দেহার ট্যাকা কই পামু। রাশ্তাই ভরসা।’ পথের মাঝখানে কেন দোকান দেওয়া—এ প্রশ্নের জবাব এভাবেই দিলেন সুমন। সংসারে অভাব আছে তাঁর। তবে এ নিয়ে সারাক্ষণ দুঃখ করার মতো মানুষ নন তিনি। বিয়ে করেছেন অল্প বয়সেই। সংসারে আছে মা-বাবা, স্ত্রী আর এক ভাই। সবাইকে দেখে রাখার দায়িত্ব তাঁর। নিজে পড়াশোনা করেননি তেমন একটা। ভাইটা পড়াশোনা করে বড় চাকুরে হবে—এমনটাই স্বপ্ন সুমনের। একটু ভালো থাকার জন্য, একটু বেশি উপার্জনের জন্য রোদের ভেতরেও অনেকক্ষণ বসে থাকেন তিনি খদ্দেরের আশায়। তালা-চাবি নিয়ে কাজ করার নেশাটা হুট করেই পেয়ে বসে তাঁকে। এটাই যে জীবিকার একমাত্র উপায় হয়ে উঠবে, এমনটা ভাবেননি কখনো। অল্প সময়ের ভেতরেই ঝানু হয়ে উঠেছিলেন তালা-চাবির কাজে। প্রথম দিকে দোকান ছিল না। তাঁর কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় বিপদে পড়লেই লোকজন ডাকত তাঁকে। লোকজনের উপকার করে ভালো লাগত খুব। কেউ কেউ তাঁর কাজে খুশি হয়ে বকশিশ দিত। বিয়ের আগ পর্যন্ত সংসারের সবকিছু বাবাই দেখত। চৌপর দিনভর পরিশ্রম করে সংসারটা চালাতেন তিনি। কিন্তু এখন সুমনই দেখছেন সব। বিয়ে করার পর মাথায় চেপে বসেছে অনেক দায়িত্ব। বাবারও বয়স হয়েছে বিশ্রাম করার। তাই নিজে থেকেই সুমন ধরেছেন সংসারের হাল। পথের ওপর দোকান দিয়ে শুরু করেছেন তালা-চাবির কারবার। আয় নেহাত মন্দ নয় সুমনের। তবে এ টাকায় পাঁচজনের সংসার চালানো খুব কঠিন। আগাগোড়া সুখী মানুষ সুমন জানান, বাড়ির সামনে অল্প একটু জায়গায় সবজির বাগান করেছেন তিনি। বউই করেন বাগান পরিচর্যার কাজ। অভাব কেটে যাবে একদিন, অভাবী কিন্তু আশাবাদী সুমনের মুখে এমন কথা শুনে ভালো লেগে যায় খুব। এমন অভাবে থেকেও তাঁর সুখী থাকার দারুণ ক্ষমতা দেখে হিংসাও হয় কিছুটা। আমরা কি ওর মতো অল্পতে তুষ্ট হতে পারি?
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয় একসময়। পড়ে যায় রোদ। বিদায় নেন সুমন। অল্প কিছু টাকা তাঁর হাতে তুলে দিতে চাইতেই প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। শুধু দোয়া করতে বলেন। ভাইটা বড় চাকুরে হবে তার জন্য দোয়া, ঘরে নয়া অতিথি আসবে তার জন্য দোয়া, অসুস্থ মা-বাবার জন্য দোয়া। দোয়া করব এমন নিশ্চয়তা দিয়েই ফেরার পথ ধরি। ফেরার পথে চোখে পড়ে মুক্তাগাছার মস্ত নীল আকাশ। তার বুকে ঠাঁই নিয়েছে কচি-বুড়ো মেঘেদের দল। মুক্তাগাছার গুটিকয়েক ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আকাশে। মেঘ কেটে কেটে উড়ছে ঘুড়িগুলো। নীলের পশ্চাদপটে তাদের দেখতে লাগছে বেশ। আকাশের এ নীল যেমন-তেমন নীল নয়, ময়ূরকণ্ঠী নীল। রাজধানীটা ছেড়ে বেরোলেই বড় বেশি চোখে পড়ে আকাশের এমন রং। পরিচিত হওয়া যায় সুমনের মতো সহজ-সরল কিছু মানুষের সঙ্গে।
কিঙ্কর আহ্সান

বুধবার, ২০ জুন, ২০১২

শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা



শি শি র র ঞ্জ ন দা স বা বু
২১ জুন বাংলা ৭ আষাঢ় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মানুষের মাঝে সম্প্রীতি, শান্তি ও মৈত্রীর পরিবেশ গড়ে তোলার জন্যই শ্রী বিগ্রহ গণউত্সব লগ্নে মন্দির ছেড়ে রাজপথে সবাইকে দর্শন দানের জন্য বেরিয়ে আসেন। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্রী প্রভুপাদ ১৯৬৫ সালে তার গুরুদেবের নির্দেশে পাশ্চাত্যে কৃষ্ণ ভাবনামৃত প্রচারের জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সানফ্রান্সিসকোর হেইট অ্যামবেরিতে ভারতবর্ষের বাইরে প্রথম রথযাত্রা উদযাপন করেছিলেন হিন্দু ধর্মমতে। সব জগতের পরম প্রভু হচ্ছেন শ্রী জগন্নাথদেব। ভক্তদের প্রেমের বশবর্তী হয়ে তিনি নিজেকে রাজপথে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভক্তদের অনুমতি দিয়েছেন। শ্রী জগন্নাথদেব অত্যন্ত কৃপাশীল। যারা মন্দিরে তাকে দর্শন করতে আসে না, তাদের সবাইকে কল্যাণ ঐক্য কৃপা আশীর্বাদ করতে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসেন। একবার শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবী সূর্যগ্রহণের কুরুক্ষেত্রে সামন্ত পঞ্চতক তীর্থে স্নান করতে যান। এখনও কুরুক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণের সময় স্নান করতে বহু পুণ্যার্থী গমন করেন। পাঁচ হাজার বছর আগে শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকা থেকে গিয়েছিলেন কুরুক্ষেত্রে। শুনে সঙ্গে সঙ্গে তারা ছুটলেন কৃষ্ণকে দর্শন করতে। কৃষ্ণ তখন রথে উঠে বলেছেন, তিনি কুরুক্ষেত্র থেকে তার রাজধানী দ্বারকায় ফিরে যাবেন। সঙ্গে রয়েছেন শ্রী বলরাম ও সুভদ্রা। চারপাশে রাজপুরুষ, সৈনিক, কৃষ্ণের বেশও অন্যরকম। গোপবেশের পরিবর্তে রাজবেশ। হাতে বাঁশির পরিবর্তে ধনুর্বাণ। কোমরে তলোয়ার/বর্ম, মাথায় মুকুট। কৃষ্ণকে এভাবে দেখে গোপাদের মন ভরল না। বিশেষ করে রাধারাণী বললেন, এই কৃষ্ণ আমাদের সেই কৃষ্ণ নয়। তাকে আমরা চিনতাম, বৃন্দাবনের বনে বনে আমাদের সঙ্গে সে লীলা খেলা করত। সেই কৃষ্ণের মাথায় ময়ূরের পাখা, তার পরণে পীত বসন, গলায় বনমালা, হাতে বাঁশি আর এই কৃষ্ণের পরণে তো রাজবেশ। রাধারাণীর সেই মনোভাব বুঝতে পেরে বাজবাসীরা কৃষ্ণের রথের দড়ি ধরে। কৃষ্ণের রথের ঘোড়াগুলো ধরে টানতে টানতে নিয়ে চললেন বৃন্দাবনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে বলরাম, তিনিও ব্রজবাসীদের শৈশবের, কৈশোরের সাথী। তাকেও রথে চড়ালেন। সুভদ্রা বোন, তাকেও তারা নিয়ে চললেন। জগন্নাথপুরীর এই রথযাত্রাটি হচ্ছে গোপাদের সেই কুরুক্ষেত্র রথযাত্রার দ্যোতিক। রথের সময় জগন্নাথ বা কৃষ্ণকে নিয়ে যাওয়া হয় নীলাচল থেকে সুন্দরাচলে। যেখানে কৃষ্ণ ব্রজবাসীদের সঙ্গে আট দিন ছিলেন। এই হচ্ছে রথযাত্রার ইতিহাস। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু ভাবতেন—‘কৃষ্ণ, কতদিন ধরে আমি তোমায় দেখতে চেয়েছি। আর এখন আমি তোমাকে দর্শন করছি।’ শ্রী প্রভুপাদ বলেছিলেন, ‘বাঁ পাশে একদল, ডান পাশে একদল, সামনে একদল এবং পেছনের দিকে একদল, আর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু মাঝখানে থাকতেন। তারা সবাই নাচতেন এবং কীর্তন করতেন। রথযাত্রার সময় ভগবান শ্রীজগন্নাথদের স্বয়ং আমাদের সামনে উপস্থিত হন। তাই এটি এমনই সুন্দর সুযোগময় একটি উত্সব, যার মাধ্যমে আমরা ভগবানের প্রতি আমাদের হৃদয়ের ভক্তি ও প্রেম নিবেদন করতে পারি। রথযাত্রার দিন রথরূঢ় পরমেশ্বর ভগবান শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব বলদেব ও সুভদ্রাদেবীকে দর্শন করে আপনার হৃদয়ের ভক্তি নিবেদন করুন, রথের রশি ধরে টানুন। ভগবানের প্রসাদ গ্রহণ করুন এবং আপনার মানব জন্মকে সার্থক করে তুলুন।
বাংলা ১০৭৯ সনে ধামরাইয়ে রথযাত্রা উত্সব হয়। ১১০৪ সন থেকে ১৩৪৪ সন পর্যন্ত মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার বালিয়াটির অমর নারায়ণ রায় চৌধুরী ও ব্রজেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরীর মতো জমিদাররা চারটি রথ তৈরি করে দেন। সর্বশেষ রথটি ছিল ৬৭ ফুট দীর্ঘ ও ৫৪ ফুট প্রস্থ, চার তলাবিশিষ্ট। প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোনায় চারটি করে প্রকোষ্ঠ ছিল। এই প্রকোষ্ঠগুলোকে নবরত্ন বলা হতো। খচিত ছিল দেবদেবীর মূর্তি। সূক্ষ্ম কারুকার্য করা সুউচ্চ এ রথ দেখার জন্য বিভিন্ন দেশের পর্যটক ভিড় জমাতেন। রথ টানার সময় প্রায় ২৭ মণ পাটের কাছি দরকার হতো। রথটি পাক বাহিনী পুড়িয়ে দেয়। এরপর দুই বছর বাঁশের তৈরি রথ দিয়ে রথযাত্রা পালিত হয়। স্বাধীনতার পর টাঙ্গাইলের দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার মেয়ে শ্রীমতি জয়াপতি সাহাসহ দানশীল ব্যক্তিদের সহায়তায় তৈরি করা হয় শ্রী শ্রী যশোমাধবের রথ। ২০০৬ সালে রথযাত্রা উপলক্ষে বিশেষ অতিথি হিসেবে তত্কালীন ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রথটি পুনর্নির্মাণের ঘোষণা দেন। মোট ব্যয় ধরা হয় ৭৮ লাখ টাকা। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে আদি রথটির আদলে পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রথমে লোহার পাত দিয়ে ৩৭ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থ তিন তলাবিশিষ্ট রথের অবকাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর লোহার পাতের ওপর সেগুন কাঠের প্রলেপ দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়া হয়েছে। কাঠের ওপর চলছে বিভিন্ন নকশার সূক্ষ্ম কারুকাজ। রথের প্রতি তলায় খচিত হয়েছে দেবদেবীর মূর্তিচিহ্ন। ১৫ চাকাবিশিষ্ট। ঢাকা মহানগরীতে ইসকনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বার্ষিক রথযাত্রা মহোত্সবটি নিঃসন্দেহে শ্রী জগন্নাথপুরী ধামের পরই বৃহত্তম অনুষ্ঠান। বরাবরই ঢাকা শহরের মানুষ এই রথযাত্রা উত্সবে আন্তরিকভাবে সাড়া দিয়ে থাকেন এবং তার ফলেই এই উত্সবটিকে তাদের নিজেদের শহরের ঐতিহ্যরূপে আপন করে নিতে পেরেছেন। পরম আনন্দের বিষয়। এখন শুধু পুরী ঢাকায় নয়, সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ইসকন রথযাত্রা মহাসাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। জগন্নাথদেবের রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় উত্সব। রথের চাকার পবিত্র ঘূর্ণনে মুছে যাক সব অন্ধকার। দূর হয়ে যাক অন্যায়-অশান্তি। মহালা লোকে পূর্ণ হোক ধরিত্রী। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গড়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণ। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও ধর্মীয় ভক্তিবিশ্বাস আমাদের ঐতিহ্যের সম্প্রীতিকে আরও সমুন্নত করে তুলুক। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুগ যুগ ধরে এ দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নিজ নিজ ধর্ম অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পালন করে আসছে। এই পুণ্যময় রথযাত্রার মধ্য দিয়ে সমাজে সম্প্রীতির বন্ধন আরও মজবুত হবে। সাফল্য বয়ে আনবে আমাদের জাতীয় জীবনে। আমার এদেশ সব মানুষের—হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান। দেশমাতা সবার। এ প্রত্যাশা আজকের এ দিনে।
লেখক : ধর্মীয় সংগঠক, কলামিস্ট

রথযাত্রা : ইতিবৃত্ত ও তাৎপর্য



॥ পলাশ কুমার রায় ॥

প্রতি বছর আষাঢ় মাসে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে অনেক মন্দিরে মেলা বসে। বাংলাদেশের বড় রথযাত্রাটি হয় ঢাকার ধামরাইয়ে শ্রীশ্রী যশোমাধব মন্দির থেকে। প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরে রয়েছে যশোমাধবের বিগ্রহ। ওই সময়কার জমিদার যশোরাজ পাল বিগ্রহটিকে মন্দিরে স্থাপন করেন। তার পর থেকে এই মন্দিরে নিয়মিত শ্রীশ্রী যশোমাধবের পূজার্চনা হয়ে থাকে। ভগবান জগন্নাথদেব হলেন শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং, যিনি জগতের নাথ বা জগদীশ্বর রূপে প্রকাশিত।
বৃন্দাবন ত্যাগ করে মহারাজ নন্দসূত শ্রীকৃষ্ণ তার দ্বারকালীলায় রত হলেন। সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে শ্রীকৃষ্ণ যখন কুরুক্ষেত্রে যান, তখন তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম ও ভগিনী সুভদ্রা এবং দ্বারকা থেকে অনেকেই তার সাথে গিয়েছিলেন। সেই সময় ব্রজবাসীও সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে কুরুক্ষেত্রে গিয়েছিলেন। কুরুক্ষেত্রে বৃন্দাবনের গোপ-গোপীদের সাথে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ হলো। ব্রজবাসী ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে তার বাল্যলীলাস্থল বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তারা তাকে রাজবেশে দেখতে চাইলেন না। তারা শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবনে ফিরিয়ে নিয়ে ব্রজের বেশে দেখতে চাইলেন এবং তার সাহচর্য পেতে উন্মুখ হলেন। তখন ব্রজবাসী কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর রথের ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে নিজেরাই রথ টানতে টানতে বৃন্দাবনে নিয়ে গেলেন। সে ঘটনা স্মরণ করে ভক্তরা আজো পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে রথে টেনে বৃন্দাবনে নিয়ে যান। দ্বারকা রাজ্য যেমন শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বর্যলীলার স্থান, বৃন্দাবন তেমনি মাধুর্যলীলার স্থল। 
রথযাত্রার উৎসবে অংশ নেয়ার মানে হলো আত্মোপলব্ধির পথে এক ধাপ অগ্রসর হওয়া। রথযাত্রা শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম লীলা। হিন্দুধর্মের বিশ্বাসমতে, এই উৎসবে অংশ নেয়ার অর্থ হলো সরাসরি কৃষ্ণের সংস্পর্শে আসা। যারা মন্দিরে এসে ভগবানকে দর্শন করেন না, তাদেরকে দর্শন দেয়ার জন্য ভগবান জগন্নাথদেব ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে নিজেই পথে বের হন। রথোপরি ভগবান জগন্নাথ দেবের একবার দর্শনেই জন্ম-মৃত্যুর পুনরাবর্তন রোধে অগ্রগতি লাভ হয়। কেউ যদি রথের রশি ধরে টানে বা রথ স্পর্শ করে অথবা রথোপবিষ্ট বিগ্রহকে দর্শন করে, তাহলে তার মুক্তি সুনিশ্চিত। এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে অব্যাহতি লাভ করতে হৃদয়ে অবস্থিত সুপ্ত কৃষ্ণভক্তিকে পুনর্জাগ্রত করতে হবে। 
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সঙ্ঘ (ইস্কন)-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণের একজন শুদ্ধ ভক্ত হিসেবে পৃথিবীর প্রায় সব নগর-গ্রামে রথযাত্রা উৎসব পৌঁছে দিয়েছেন। লন্ডন, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, সিডনিসহ বিশ্বের অনেক স্থানে রথযাত্রা উৎসব উদ্যাপিত হচ্ছে।
আজ ঢাকার স্বামীবাগ ইসকন মন্দির থেকে বিকেল ৪টায় রথ শোভাযাত্রা শুরু হয়ে তা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে। সপ্তাহান্তে উল্টো রথযাত্রা ইসকন মন্দিরে গিয়ে শেষ হবে। এবারের রথযাত্রায় লাখো মানুষের সমাগম হবে মর্মে আয়োজকেরা জানান। এই উৎসব ও শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা সাফল্যমণ্ডিত হোক, এই প্রার্থনা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সবার পাপ-পঙ্কিলতা ক্ষমা করুন, দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ দূর করে শাসকগোষ্ঠীর হৃদয় কোমলকরত ন্যায়ানুগ পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনার শক্তি ও ধৈর্য দিন, আমাদের আদর্শ নাগরিক হওয়ার মানসিকতা তৈয়ার করে দিন, আজকের দিনে এই শুভ প্রার্থনা করি মহান স্রষ্টার কাছে। 
লেখক : আইনজীবী, ঢাকা 
palashroy2012@yahoo.com

মঙ্গলবার, ১৯ জুন, ২০১২

কালো হরফে বন্দি একটি কাল, একটি সত্য


মুস্তাফা জামান আব্বাসী
তাহলে সত্যজিৎ রায় কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্য যে, 'পথের পাঁচালী' অর্থাৎ পথের গানেই আছে জীবনের কথা, যার অপর নাম দীন। ওই যে রেলগাড়িটি মাঠের মধ্যে 'ঝিক' 'ঝিক' শব্দ করে বেরিয়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে, চিরায়ত বাংলার পটভূমিতে অপুর জীবনের ট্রিলজি, মুহূর্তে যা চিনিয়ে দিল না বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চিত্র নির্মাতাকে, এর সঙ্গে চিরায়ত মানুষকে।
জানতে হবে মানুষই দীন, দীনই মানুষ

কলকাতায় অক্সফোর্ড বুক স্টোরে মাঝে মধ্যে যাওয়ার সুযোগ পাই। অনেক দিন আগের কথা। একটি বই খুব ভালো লাগছিল পড়তে। সামনেই শালপ্রাংশু সত্যজিৎ। খানিকক্ষণ তাকিয়েই থাকতে হলো। বললাম :আপনিই...? বললেন, হ্যাঁ, আমিই। অটোগ্রাফ আমার জন্য নয়, মেয়ে শারমিনীর। সই হয়ে গেলে পরিচয় দিলাম। বললেন, আমরা উন্মুখ হয়ে থাকি কখন বাংলাদেশ টিভির প্রোগ্রাম হবে! বিশেষ করে নাটক ও লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠান। বললেন, শিগগিরই আসছি। এলে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। এসেছিলেন কয়েকবার, যোগাযোগ হয়নি।
ওই বইয়ের দোকানেই অনেক দিন পরে, বিজয়া রায়ের লেখা 'আমাদের কথা' বইটি সংগ্রহ করে উপহার দিই আসমাকে। আবিষ্কৃৃত সত্যজিৎ-বিজয়া। বইটি না পড়লে সত্যজিৎ রায়কে পুরোপুরি চিনতে পারতাম না। এ কারণেই বলে থাকি যে, কালো হরফের লেখায় বন্দি কথাগুলোই চেনাতে পারে একটি মানুষ, একটি কাল, একটি সত্য। এমন বর্ণময়, আলোকময়, চিত্রময় জীবনযাপনের কথা আর পড়িনি। পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা নিয়ে গড়ে উঠেছিল যে সংসার, তা আজ কিংবদন্তি। সংসার অবশ্যই সুখের হয় রমণীর গুণে; সে রমণী যদি হন বিজয়া।
রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়াকে ভালোবেসেছিলেন কিনা মুখ ফুটে বলেননি; 'বিজয়িনী' কবিতায় সে ভালোবাসা এসে দেখা দিয়েছে। প্রবাদপ্রতিম চলচ্চিত্র স্র্রষ্টার জীবনসঙ্গিনী বিজয়ার কাছে পেয়েছি জানা-অজানা কাহিনী, স্মৃতি-বিস্মৃতির জগৎ থেকে তুলে আনা মানিকের প্রেরণার ইতিবৃত্ত। বাংলার মানিক কী করে হলেন পৃথিবীর সত্যজিৎ_ সেই অকপট স্বনিষ্ঠ বিস্তারিত ৫৭৪ পৃষ্ঠার গল্প যে পড়েনি, বড়ই দুর্ভাগা সে। ৮৪ বছর বয়সে কেউ কলম হাতে নিয়েছেন_ এমন ঘটনা জানা নেই। বিজয়া রায় যখন একবার শুরু করেছেন, শেষ অবধি টেনেছেন তার নিজের ও মানিকের গল্প। তার নিজের গল্প আমার কাছে মনে হয়েছে অবিশ্বাস্য। প্রায়শ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন মানিক। ঘটনাবহুল জীবনের আশাবাদী দিকটি চিরকাল ছিল অক্ষুণ্ন। তাই বাল্য-কৈশোর-যৌবন-প্রৌঢ়ত্ব-বার্ধক্য ও লেখিকা জীবনের অমরত্ব_ সব মিশে আছে এই গ্রন্থে। একেকটি পাতা পড়ছি আর বন্ধ করে অনেকক্ষণ ভেবেছি। এত সুন্দরও জীবন হয়! কাকা-ছোট পিসি-সানিদা-বাবা-কাকামণি-মেজদি-মানুদা-বড়দি-সরস্বতীদি-মেজপিসি-বড়পিসি-মানিক ঠাকুমা (কোলে মন্টু)-খুড়ি মা (কোলে বাচ্চু)-মা-সেজদি-আমি। যেন ছবিতেই নয়, সামনেই দেখতে পাচ্ছি। এমন অনুভব তারই হবে, যে বিজয়া-সত্যজিতের সঙ্গে মিশে যাবে।
'...পাটনার বাড়িটি ছিল ভারি সুন্দর লাল ইটের বাংলোবাড়ি, নাম ছিল লিলি ভিলা, কুয়োর পাশে আমাদের বড় আদরের দুটো গাছ কুল ও পেয়ারা। ওই পেয়ারা গাছে চড়ে কত যে পেয়ারা চিবিয়েছি তার শেষ নেই। কুল গাছটায় হতো মিষ্টি নারকোলি কুল। বারান্দার দু'পাশে দুটো বড় গাছ, একটা আম অন্যটা নিম। নিমগাছে মালি একটা দোলনা টাঙিয়ে দিয়েছিল, কত দোল খেয়েছি ওই দোলনায়, আর আম গাছের কচি আম পেড়ে তেল নুন লঙ্কা দিয়ে মেখে ছুটির দিনে বই পড়তে পড়তে খেয়েছি, সে কথা ভাবলে এখনো জিভে জল এসে যায় ...'।
মানিকের সঙ্গে যখন ঘনিষ্ঠতা শুরু, সে এক মজার কাহিনী। সেই গাল-ফোলা মানিকের গাল ভেঙে এখন মুখটা লম্বা হয়ে গেছে, আর ওর দিকে তাকাতে গেলে মুখটা অনেকখানি তুলতে হয়। বাইশ বছরের মানিকের ছবি সংগ্রহ করেছি, পাঠকদের উপহার দিলাম। রাসবিহারী এভিনিউর বাড়িতে বিজয়াকে আমি যেন কোথায় দেখেছি।
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের শেষে আসমাকেও আমি দেখেছিলাম একই দৃষ্টিতে। মন্টু ভাইকে (মুস্তাফা মনোয়ার) গিয়ে বললাম, এই মেয়েটিকে আমার পছন্দ। মন্টু আমার দিকে তাকালো। বলল, ভারি মিষ্টি। কোথায় পেলে? সে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কাউকে পায়নি। বললাম, এর একটি পেন্সিল স্কেচ এঁকে দাও। পরদিন একসঙ্গে পেন্সিল স্কেচে অনিন্দ্যসুন্দরী আবির্ভূতা। বিজয়ার কাহিনী পড়ছি আর মনে মনে অবাক হয়ে যাচ্ছি। বার্লিন যাওয়ার সময় দমদম এয়ারপোর্টে হাজির সুপ্রিয়া, উত্তম কুমার, মানিক ও বিজয়া। এরা বাঙালির কাছে মহার্ঘ্য শুধু ছবিতেই নয়, কল্পনাতেও।
কোন পাতা ছেড়ে কোন পাতার কথা বলব। সব পাতা লজেন্সের মতো। অল্প করে যেমন লজেন্স ছোটবেলায় খেতাম! খানিকটা লুকিয়ে রাখতাম, পরে ওদেরকে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতাম; এ বইও তেমনি।
একজন মুসলমান হিসেবে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাকে দীনের কাছাকাছি আনবে। যা আনবে না, তার জন্য সময় ব্যয় করব না। তাহলে সত্যজিৎ রায় কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ? এই জন্য যে, 'পথের পাঁচালী' অর্থাৎ পথের গানেই আছে জীবনের কথা, যার অপর নাম দীন। ওই যে রেলগাড়িটি মাঠের মধ্যে 'ঝিক' 'ঝিক' শব্দ করে বেরিয়ে গেল চোখের সামনে দিয়ে, চিরায়ত বাংলার পটভূমিতে অপুর জীবনের ট্রিলজি, মুহূর্তে যা চিনিয়ে দিল না বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ চিত্র নির্মাতাকে, এর সঙ্গে চিরায়ত মানুষকে। জানতে হবে মানুষই দীন, দীনই মানুষ।
'পথের পাঁচালী' (১৯৫৫), 'অপরাজিত' (১৯৫৬) এবং 'অপুর সংসার' (১৯৫৯) শুধু ক্যান ফেস্টিভ্যালে মনুষ্যজীবনের শ্রেষ্ঠ ডকুমেন্টারি হিসেবে ও ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে বিভূষিত হয়নি; জানিয়েছে সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে এক ঐক্যের কথা। উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর পুত্র, সুকুমার রায়ের সুপুত্র তার ব্রাহ্মজীবনের পাঁচালি প্রকাশ করেননি এই ট্রিলজিতে, বরং সারা পৃথিবীকে জানিয়েছেন বাঙালি মানসের পরম সত্য_ 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই'।
সারা পৃথিবী সত্যজিৎকে একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালির মর্যাদা দিয়েছে; সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের পরেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তাকে আনন্দিত করেছিল, কিন্তু তা নিয়ে যায়নি তাকে একটি শিল্পকর্মের দিকে। রিফিউজিদের দুঃখ-কষ্ট তার মনে প্রভাব ফেলেছিল, সোশিয়ালিজমের দিকে তার গন্তব্য ছিল না, বরং রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনি ছিলেন একজন এলিটিস্ট। 'পথের পাঁচালী' ট্রিলজিতে যে দারিদ্র্যের ছবি তিনি এঁকেছেন তা তার নিজের দেখা। চিত্রতারকা নার্গিস তার সমালোচনা করে বলেছেন যে, রায় ভারতের দারিদ্র্য রফতানি করেছেন, আধুনিক ভারত নয়। 'সতরাঞ্জ কি খিলাড়ি'তে অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ তার ওপর ভর করেছেন। এগিয়ে এসেছেন সায়িদ জাফরি, আমজাদ খান, শাবানা আজমি, রিচার্ড অ্যাটেনব্যুরো। রবীন্দ্রনাথকে, তার বাবা সুকুমার রায়কে নিয়ে তার ডকুমেন্টারি, সুনীলের লেখা 'অরণ্যের দিনরাত্রি'_ চার যুবকের অ্যাডভেঞ্চার; এর পরে 'প্রতিদ্বন্দ্বী', 'সীমাবদ্ধ' ও 'জনারণ্য' সেলুলয়েডে এনেছেন নতুন নতুন নিরীক্ষা।
বিজয়ার জীবনে হঠাৎ এলো কালো মেঘের বিষণ্নতা নিয়ে মাধবী। সত্যজিৎ তাকে ভালোবেসেছিলেন কিনা, বইতে লেখেননি বিজয়া। কষ্ট পেয়েছেন; মুখ বুজে সয়ে নিয়েছেন সে কষ্ট। রবীন্দ্রনাথের জীবনে প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী একজনই। তার নাম কাদম্বরী। একজনই ব্যতিক্রম, যিনি সমর্পিত শুধু প্রমীলায়, তার নাম নজরুল। নার্গিস-কানন-ফজিলাতুন্নেছার কাছে ক্ষণিকের অতিথি।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী :সাহিত্য-সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net

চলচ্চিত্রের হালচিত্র



মনিরুজ্জামান মনির
চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী গণবিনোদন মাধ্যম। এই চলচ্চিত্রে আছে সপ্তকলা বা Seven Arts-এর সমাহার। যুগে যুগে চলচ্চিত্র, আমাদের দেশে সাধারণে পরিচিত। ফিল্ম বা সিনেমা দর্শকদের টেনে নিয়ে গেছে সিনেমা হলে। সিনেমার সেলুলয়েডের পর্দায় দৃশ্যমান হয়েছে নৃত্য, সঙ্গীত, কাহিনীসমৃদ্ধ চলমান জীবনচিত্র। মাইক্রো বিজ্ঞানের কল্যাণে মনোরঞ্জনের অনেক মাধ্যম নতুন নতুন সহজলভ্য বলে আবিষ্কৃত হলেও চলচ্চিত্রের চাহিদায় বিঘ্ন ঘটেনি কখনও বরং উত্তরোত্তর এর আকর্ষণশক্তি বাড়ছে বলা যায়। তবে এর নির্মাণশৈলীতে আধুনিকত্ব, কাহিনীতে ব্যতিক্রমতা দর্শকদের সম্মোহিত করে আনন্দিত করে বিশ্বজুড়ে। আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের ধারা কখনও একই গতিতে প্রবাহিত হয়নি। দেশের অর্থনৈতিক-ব্যবসায়িক সচ্ছলতা রাজনৈতিক স্থিতি অবস্থার উপর অনেকটা নির্ভর করে চলচ্চিত্র নির্মাণে আধিক্য। তবে এর পাশাপাশি চলচ্চিত্রের মন্দ-ভালো আকর্ষণীয় কিনা সেদিকটাও বিবেচ্য হয়ে থাকে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন বা এফডিসি থেকে ফিল্ম নির্মাণ হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। যে এফডিসির প্রধান ফটকে ঝুলছে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের পাথরে খুদাই করা ছবি যা মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখানে অন্যান্য দেশের স্টুডিওর মতো সিনেমা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তিত্ব যেমন : আমাদের দেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্রের চিত্র পরিচালক আবদুল জব্বার খান বা কিংবদন্তী চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের স্থাপত্য নিদর্শন থাকলে মানানসই হতো। অতি সম্প্রতি সরকার কর্তৃক এফডিসি স্বীকৃত হয়েছে শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে। অথচ এফডিসি কোনো চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণের বা চলচ্চিত্রের মান নিয়ন্ত্রক সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণের পর সেন্সরবোর্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে চলচ্চিত্র জমা দিতে হয়। সেখানে চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা বা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্য চিত্রায়ন করেছে—এমন কোনো বিষয়ের তারা সেন্সর করে থাকে। কিন্তু মান নির্ণয় করে না। আসলে আমাদের দেশে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রশিক্ষণের কোনো সরকারি ইনস্টিটিউট নেই। আমার এটা বোধগম্য নয়, সরকার এ বিষয়ে উদাসীন কেন? তথ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে এ বিষয়ে কোনো প্রকল্প কি গ্রহণ করা যেত না? এফডিসি শুধু সরকারি নিয়মনীতির ভিত্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণে কাঁচামাল (ফিল্ম) দিয়ে থাকে। শুটিংয়ের জন্য বিশাল আকৃতির ফ্লোর, ক্যামেরা, এডিটিংয়ের যন্ত্র, কক্ষ, ডাবিং থিয়েটার, নেপথ্য সঙ্গীত সংযোজনের জন্য সাউন্ড কমপ্লেক্স, চিত্র পরস্ফুিটন ও মুদ্রণের জন্য কালার ল্যাব ভাড়া দেয়া হয়। বলা যায় সরকার এখানে বেসরকারি ফিল্মের প্রযোজক বা মালিকদের সঙ্গে ব্যবসা করে থাকে। তবে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য এফডিসিতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আছে। সেখানে নির্মিতব্য ছায়াছবির সারাংশ (স্ক্রিপ্ট) জমা দেয়ার বিধান রয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি কোনো ছবি নির্মাণের অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। সেখানে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তা নামক একটি বিরাট বহর আছে। আর আছেন প্রতিষ্ঠানের প্রধান একজন এমডি। আওয়ামী সরকারের বর্তমান শাসনকালে আগের ধারাবাহিকতায় চুক্তিবদ্ধ নিয়োগ দেয়া হয়েছে দলীয় সমর্থিত নাট্য অভিনেতা পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। আগে দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং হালের সাংস্কৃতিক কিছুটা রাজনৈতিক নেতা ম. হামিদকে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি এফডিসি নাটক, বা চলচ্চিত্রের মান নিয়ন্ত্রণ করে না। সে শুধু চলচ্চিত্র নির্মাণে কারিগরি সুবিধা ভাড়ার মাধ্যমে দিয়ে থাকে। এখানে শুধু একজন সরকারি আমলা, সু-প্রশাসকের প্রয়োজন। লোকমুখে শোনা যায় এফডিসিতে নাকি দুর্নীতি নামক ‘কালো বিড়াল’টি ঢুকে পড়েছে। এফডিসির পার্চেজ কমিটি, লাভজনক সব কমিটিতে দলীয় সমর্থিত কর্মকর্তা এবং সিনেমা সংশ্লিষ্ট লোকজনের নাম অন্তর্ভুক্ত আছে বলে শোনা যায়। সেই পার্চেজ কমিটি ডিজিটাল যুগে ৭০ দশকের সাউন্ড, ক্যামেরা, এডিটিং ল্যাবরেটরির এনালগ যন্ত্রপাতি কেনার জন্য সুপারিশ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বর্তমানে এফডিসি থেকে ৪০০ ফিটের একটি নেগেটিভ ক্যানের সরকারি ক্রয়মূল্য ১৬ হাজার ৭শ’ টাকা অথচ বাজারে এর বেসরকারি মূল্য ১৪ হাজার টাকা। এতে কি সরকার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না? এফডিসির ৯টি শুটিং ফ্লোরের মধ্যে ৮টি ফ্লোরই বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলকে, যেখানে তারা নাটকসহ অন্যান্য টিভি অনুষ্ঠান নিয়মিত ধারণ করছে। সিনেমা শুটিং করার লক্ষ্যে নির্মিত স্টুডিওগুলো চিত্র পরিচালকরা বরাদ্দ চেয়ে পাচ্ছেন না। একজন পরিচালক সমিতির প্রধান এবং খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক জানিয়েছেন, তিনি নাকি এমডি সাহেবকে এফডিসির নাম পরিবর্তন করে এমডিসি রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। এমডিসির পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা হলো মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন।
৯০ দশক এবং তার পরবর্তী দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলচ্চিত্রের ব্যবসা ছিল রমরমা। তার পরেই সেই ব্যবসায় নামে অকস্মাত্ ধস। চলচ্চিত্র ব্যবসা যখন মন্দা, দর্শকরা যখন সিনেমা হল থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং অধিক মুনাফা নিশ্চিত লাভের আশায় রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরে সিনেমা হলগুলো ভেঙে মার্কেট শপিংমল করা হচ্ছে, তখন চলচ্চিত্র মহলের দুর্বলতার সুযোগে অবতীর্ণ হলেন ত্রাণকারী হয়ে একটি টিভি চ্যানেলের প্রধান। যে চ্যানেলের জন্ম প্রতিবেশী দেশের আশীর্বাদেপুষ্ট হয়ে এবং এর বেড়ে ওঠাতে বর্তমান সরকারের আনুকূল্য প্রেরণা যুগিয়েছে বহুদিন থেকে। আলোচিত চ্যানেলটি চলচ্চিত্রে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসনে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সেই পথ আবিষ্কার করেছে বহুবার। এদেশে সিনেমা হল সমিতির সঙ্গে সেই চ্যানেলটিও ভারতীয় বাংলা, হিন্দি ছবির উত্সব করেছে সব প্রতিবাদ উপেক্ষা করে। আমাদের দেশের অনেকটা বেকার পরিচালককে নিয়ে সংক্ষিপ্ত বাজেটে তৈরি করল একের পর এক ছবি। সেই ছবিগুলো বাংলাদেশের হলগুলোতে মুক্তি দিল না লাখ লাখ টাকা গচ্চা যাওয়ার ঝুঁকি হতে পারে বলে। তারা নিয়মিত প্রয়োজনীয় অ্যাড সংগ্রহের মাধ্যমে নিজস্ব টিভি চ্যানেলে ওই ছবিগুলো মুক্তি দিল। এতে তাদের ছবি নির্মাণ ব্যয় সংরক্ষিত হলো আবার মুনাফাও হলো। আমি আগেই বলেছি এ করে টিভি দর্শক বৃদ্ধি পাবে। সিনেমা হলে দর্শক বৃদ্ধি করতে হলে শিল্পসম্মত ছবি বা বাণিজ্যিক ছবি অধিকসংখ্যক সিনেমা হলে মুক্তি দিতে হবে। আমি আশা করব চলচ্চিত্র শিল্পকে বর্তমান সঙ্কট থেকে উঠে দাঁড়াতে সরকার ও চলচ্চিত্রপ্রিয় বিত্তবান মানুষেরা আরও এগিয়ে আসবেন, আরও সক্রিয় হবেন।
monirlyric@gmail.com

সোমবার, ১৮ জুন, ২০১২

ঘুরে এলাম ইবনে বতুতার দেশ মরক্কো

মোহাম্মদ কায়কোবাদ


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্বমানের প্রোগ্রামিং-নৈপুণ্যের ওপর ভর করে বিদেশে আর কম বেড়ানো হলো না। এমনকি ৯/১১-পরবর্তী বছরগুলোতেও আমেরিকা ভ্রমণ হয়েছে বহুবার। তারপর ইউরোপের নানা দেশ, জাপান, চীন—প্রতিবছরই একবার করে, গত ১৫ বছর। এবার অবশ্য প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা নিয়ে নয়, সমাজে বিজ্ঞানকে কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সভায় যোগদান করতে।
বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় পরিষদের সচিব ড. মুকাদ্দাস আলী ও শাহানা পারভীনের ত্বরিত পদক্ষেপে ও মরক্কোর দূতাবাসের কর্মকর্তার অদূতাবাসসুলভ আন্তরিকতায় ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুমতি—সবই যথাসময়ে মিলে গেল। বিশ্বখ্যাত ভ্রমণকারী ইবনে বতুতার দেশে ভ্রমণ। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের আগে যত ভ্রমণকারী ছিলেন, ইবনে বতুতা ছিলেন তার মধ্যে সবচেয়ে বড়। ইবনে বতুতা ভ্রমণ করেছিলেন ৭৫ হাজার মাইল, পক্ষান্তরে মার্কো পোলো মাত্রই তাঁর তিন ভাগের এক ভাগ।
এমিরেটসের ফ্লাইটে প্রথম দুবাই। ঘণ্টা ছয়েকের যাত্রাবিরতিতে দুবাই বিমানবন্দরের ঐশ্বর্য যেমনটি ক্লান্তি দূর করে অপেক্ষার একঘেয়েমি লাঘব করল, একই সময়ে কোটির কম মানুষের দেশের বিমান কোম্পানির আকাশসম সুনাম, শত শত আধুনিক বিমানে সমৃদ্ধ এমিরেটসের অগ্রযাত্রার সাপেক্ষে আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশের বাংলাদেশ বিমানের নাজুক অবস্থা যে মন্ত্রী বদলিয়ে কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগে পরিবর্তন হচ্ছে না, তা দেখে মন ভারী হয়ে গেল। জনসংখ্যার বিচারে আমরা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০ গুণ বড় হলেও তাদের বিমান সংস্থা আমাদের নিশ্চয়ই কমপক্ষে ২০ গুণ বড়। এতগুলো বিমানের যাত্রী তাদের সারা পৃথিবী থেকে জোগাড় করতে হয়। তারা যদি মনে করে, তাদের ব্যবসাটা ভালো যাচ্ছে না, তাহলে নানা ধরনের প্রদর্শনী করে বিদেশিদের আকৃষ্ট করে। ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে সাত ঘণ্টার ফ্লাইটের পরও আমাদের উড়োজাহাজটি সরাসরি গেটে যাত্রী নামাতে পারেনি, যেখানে প্রায় ২৫০টি গেট। 
আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে বিমানকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। অন্ততপক্ষে আমাদের যাত্রীদের যাতায়াতের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা তো সাশ্রয় করা যাবে। সরকারের পয়সায় বিমান ভ্রমণ হলেই বাংলাদেশ বিমান ব্যবহার করতে হবে। ভারতে যারা দীর্ঘদিনের ছুটিতে যায়, তাদের ভারতের জাতীয় এয়ারলাইনস ব্যবহার করতে হয়। এ রকম আইন করলে নিশ্চয়ই আমাদের যাত্রী-সমস্যা হতো না। বছর বিশ আগে একটি পরিসংখ্যান পড়েছিলাম, যাতে লেখা ছিল, বাংলাদেশ বিমান পর্যাপ্ত যাত্রী পেলে আয়ের সর্বোত্তম উৎস হতে পারত। এই সর্বোত্তম উৎস নিয়ে আমরা কেন গবেষণা করি না, কেন এর সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান বের করি না। বছর দশেক আগেও মালয়েশিয়ায় ভ্রমণকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিনা পয়সায় হোটেলে থাকা-খাওয়া এবং বিমানবন্দরে যাওয়া-আসা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাতে সম্ভবত তাদের লাভই হয়েছে। 
যা হোক, তারপর ক্যাসাব্লাঙ্কার ফ্লাইট। এই ফ্লাইটে মধ্য সারিতে আমার পার্শ্ববর্তী সিটে যাত্রী রয়েছে পুরো এক বছর বয়সী সময়ে-অসময়ে অকারণে ক্রন্দনরত এক শিশু এবং তাকে ব্যর্থভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নিয়োজিত তার অল্পবয়সী অনভিজ্ঞ অসহায় মা ও তার অনুজা খালা। তার সব স্থাবর সম্পত্তির আধার ব্যাগটি বিমান উড্ডয়নের সময় ওপরে শেলফে বিমানবালা রাখতে গেলেই ঘটল বিপত্তি। ব্যাগটি ধরলেই চিৎকার, আবার তাকে না দিলেও তা-ই। একখানি বই পর্যন্ত নিতে ভুলে গেছি। ফলে লম্বা উড্ডয়নকাল শিশুটির সুবাদে ভালোই কাটল। এর ফাঁকে মরক্কো সম্পর্কেও বেশ কিছু জানা গেল। তাদের ভাষা আরবি মরক্কোর উচ্চারণে। বয়স্ক বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানেরা ওই ভাষায়ই কথা বলে। উপনিবেশ থাকার সুবাদে ফরাসি ভাষা চলছে আবার ইদানীং ছেলেমেয়েরা ইংরেজি ভাষায়ও পারদর্শী হচ্ছে। শিশুর মা-বাবা হংকং থাকেন, ইংরেজি উচ্চারণ অতিশয় চমৎকার। 
মধ্যপথে এক যাত্রী তো তার সিট থেকে দাঁড়িয়ে গেল বিমান তার গন্তব্যে চলে এসেছে মনে করে। স্থিতিজড়তা ও গতিজড়তার ব্যবধান বুঝতে অবস্থান পরিবর্তনের যে মাপকাঠি দরকার, তা শূন্য আকাশে তার হাতে ছিল না। টয়লেটে গিয়ে বুক এক বিঘত বেড়ে গেল। এই প্রথম একটি বিদেশি ফ্লাইট দেখলাম, যার না যাত্রাস্থান, না গন্তব্য—কোনোটিই বাংলাদেশের কোনো শহর নয়, অথচ কিছু কিছু নির্দেশ বাংলায়ও রয়েছে। এই নির্দেশ যে কারণেই হোক, যেহেতু ইংরেজি ও আরবিতেও আছে, আমি তো বেশ খুশি। অবশ্য একটি ক্ষুদ্র কাপড়খণ্ডে ততোধিক ক্ষুদ্র লেবেলে থাইল্যান্ড শব্দটি দেখে বুকটি আবার সমপরিমাণ নেমে গেল। ২০০০ সালের গ্রোগ্রামিংয়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে উপঢৌকন হিসেবে প্রতিটি দলকে যে টুপি দিয়েছিল, তার ভেতরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ দেখে রকেট বানানোর গর্বে মন ভরে গিয়েছিল। কাকতাল কিনা জানি না, আমাদের দলটি সেবারই সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল, সারা বিশ্বে একাদশ স্থান, তাও আবার এমআইটি, হার্ভার্ড, বার্কলে, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে। এক যুগ পরে আমাদের সেই সাফল্যের জন্য তৈরি পোশাকশিল্পের বঞ্চিত শিল্পীদের কৃতজ্ঞতা জানাই।
ক্যাসাব্লাঙ্কা বিমানবন্দর দেখেই বোঝা যায়, মরক্কো এমন কোনো ধনী দেশ নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির জায়গা হিসেবে রাবাত ও এই শহরটিকে সবাই পছন্দ করে আসছে। আমাদের যেতে হবে রাবাত। প্রাইভেট কারে ক্যাসাব্লাঙ্কা থেকে রাবাতের ৯০ কিলোমিটার দূরত্ব কীভাবে যে এক ঘণ্টায় অতিক্রম করা যায়, তা না গেলে বিশ্বাস হবে না। সারা রাস্তার কোথাও কোনো ট্রাফিক লাইট নেই, শুধু দুটি স্থানে টোল প্লাজা। এক ঘণ্টায় চলে এলাম রাবাত। হাইওয়ে বলতে যা বোঝায় এবং বাংলাদেশে যা নেই। গোটা দেশ হলো সমুদ্রের তীরঘেঁষে, আবহাওয়া সব সময়ই ভালো। রাবাত শহরকে মনে হলো একটি বিশাল পার্ক, রাস্তাগুলো সব একমুখী, সড়কদ্বীপগুলো প্রশস্ত। আফ্রিকার একটি দেশে যে এত গাছ আছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। তাও আবার সাহারা মরুভূমির সঙ্গে লাগানো। রাস্তায় যানবাহনগুলো ট্রাফিক আইন মেনে চলে, কোথাও বড় কোনো যানজট দেখতে পেলাম না। রাস্তায় দু-একজন ভিক্ষুক যে দেখা যায়নি তা নয়, তবে স্মার্ট সবল ভিক্ষুকদের ক্ষুদ্রতর দেহধারী পুলিশ যে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে তা দেখেছি ঠিক আমাদের দেশে আন্দোলনরত হরতাল পালনকারী রাজনৈতিক কর্মীদের যেভাবে করা হয়।
আইএসইএসসিওর ৩০ বছর পূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষে দেশের প্রধানমন্ত্রী এসেছিলেন, তার দেহরক্ষীকে দেখার সৌভাগ্য হলো না। যারা ছবি তুলতে চেয়েছিল, তাদের কাউকে বঞ্চিত করেননি। রাবাতে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে রয়েছে রাজা হাসানের কবর। ২০১১ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টকে যদিও অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তবুও রাজাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সম্প্রতি উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য অনুযায়ী, রাজার সম্পদ দুই বিলিয়ন ডলারের বেশি, আর রাজপ্রাসাদে নাকি প্রতিদিন ব্যয় হয় প্রায় এক মিলিয়ন ডলার। তাও আবার মূলতই পোশাক এবং গাড়ি মেরামতের জন্য। মরক্কোর মুদ্রা দিরহাম, এক মার্কিন ডলার আট দিরহামের কিছুটা বেশি। একটি পার্টি হলো। আটজন অতিথির জন্য প্রথম এল বিশাল পাত্রে করে সালাদ, লেটুসপাতা থেকে নানা বর্ণের সবজি, কিছু ফল একটি পাখির মতো করে সাজিয়ে। এর পর এল পাস্তিলা—অত্যন্ত সুস্বাদু করে তৈরি করা রুটির ভেতর ইতালিয়ান কিংবা মেক্সিকান পাস্তা। এর পর এল গোটা চারেক মরক্কোর মুরগির রোস্ট। সঙ্গে ছিল নানা ধরনের ফলমূলের রস এবং ঠান্ডা পানীয়। 
মানুষের সঙ্গে কথা বলে, অনুষ্ঠানগুলোতে যোগদান করে, রাস্তায় হেঁটে, শপিং সেন্টারে গিয়ে দেশটি সম্পর্কে অনুভূতি ভালোই হলো। হংকং তার স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান ব্যবহার করছে, যা করছে সিঙ্গাপুরও। দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানও কী কী ব্যবহার করে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামও এগিয়ে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত তার বিমান বহর দিয়ে সারা বিশ্বে যোগ্য দেশ হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে, মরক্কো মর্যাদা পাচ্ছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দর-কষাকষির স্থান হিসেবে। আমরা বঞ্চিত পোশাকশিল্পের নারীদের এবং মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত খেটে খাওয়া মানুষের অমানুষিক পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্জিত বিদেশি মুদ্রা ছাড়া অন্য কোনো শ্রেয়তর উপায়ের সন্ধান করতে পারি কি না।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।